আজ আমাদের ছুটি...

অলংকরণ: রেহনুমা প্রসূন

গাছের নিচে ক্লাস বসেছে। কী প্রশান্তিময় ছায়া! হাত বাড়ালেই পেঁজা পেঁজা মেঘ। কত রকমের ফুল ফুটেছে! প্রজাপতির ডানায় এত রংও হতে পারে! নাম না-জানা কত পাখির কিচিরমিচির।

ক্লাস নিচ্ছেন মাহেরীন মিস।

একটু দূরেই কলকল শব্দে বয়ে চলেছে ঝরনা। ঝরনায় পা ডুবিয়ে বসে আছে আরিয়ান। শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। আনিকা আর সাদ মিলে ভাসাচ্ছে কাগজের রঙিন নৌকা। নাফির দুরন্তপনা একটুও কমেনি। নাজিয়া খুব সুন্দর ঝুঁটি বেঁধেছে চুলে।

মাসুকা মিস খেয়াল করলেন, বাপ্পির মন খারাপ। ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন। বাপ্পির চুলে মমতার পরশ বুলিয়ে দিলেন। রংপেনসিলে বাপ্পি তার মায়ের ছবি এঁকেছে।

মাসুকা মিস ছবিটা হাতে তুলে নিলেন। বললেন, ‘বাহ, বেশ সুন্দর হইছে তো!’ বাপ্পি একটু তাকাল। নিষ্পাপ চোখে কিসের যেন কাতরতা! মাসুকা মিস বললেন, ‘আম্মুর কথা মনে পড়তেছে?’ বাপ্পি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। মাসুকা মিস বাপ্পিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ধুর বোকা! এখানে কি মন খারাপ করতে আছে? দাঁড়াও…।’

নিজেই রং–পেনসিল টেনে নিলেন। বাপ্পির মায়ের ছবির পাশে একদম বাপ্পির মতো দেখতে একজনকে এঁকে ফেললেন। শক্ত করে বাপ্পির হাত ধরে আছেন তার মা। ছবিটা দেখে বাপ্পির মন খুশিতে ঝলমল করে উঠল...।

খুব ভাবতে ইচ্ছা করছে, আমাদের এই মৃত্যুর ফাঁদ পেতে থাকা ধুলো-কাদার পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, আকাশের অন্য পাশে, অন্য কোনো অপার্থিব জগতে তারা বেশ আনন্দে আছে। যেখানে দুঃখ স্পর্শ করে না। যন্ত্রণার সুচ এসে বেঁধে না গায়ে। আগুন পোড়ায় না পুতুলের মতো শরীরগুলোকে।

সেই জগতে মাহেরীন মিস আর মাসুকা মিস ক্লাস নিচ্ছেন। সেই ক্লাসে কোনো হোমওয়ার্ক নেই। ১৩–এর ঘরের নামতা শেখার জটিলতা নেই। যে কেউ যেকোনো সময় বাজিয়ে দিতে পারে ছুটির ঘণ্টা। সবাই মিলে গায়, আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি...।

আরও পড়ুন
উক্য সাইন মারমা
ছবি: স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া

সেদিন তারাও অপেক্ষা করছিল ছুটির জন্য। স্কুল প্রায় ফাঁকা। অল্প কজন আছে। আকাশে প্লেনের শব্দ তাদের কাছে অচেনা নয়। কিন্তু তারা জানত না, এবার গর্জন তুলে যে বিমান ধেয়ে আসছে, সেই ফাইটার জেট আসলে কালো কাপড়ে মোড়া মৃত্যুদূত।

উত্তরার মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনার খবর প্রথম শুনি সহকর্মী শুভ্রর কাছে। উত্তরা, মাইলস্টোন, প্লেন ক্রাশ...এই শব্দগুলো আমাকে মুহূর্তেই হতবিহ্বল করে দিল। শুভ্র আরও কী জানি বলে চলেছে। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। রোবটের মতো ফোনটা হাতে নিলাম। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। ফোন রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে মানুষের আর্তচিৎকার, কান্না, বাঁচার আকুতি ভেসে আসছে। মুগ্ধর গলার স্বর বেশ উঁচুতে। বলল, ‘মামা, এখন কথা বলতে পারব না। আমরা রেসকিউ করতেছি…।’ ফোন কেটে গেল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।

একটু পরেই অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করল। মুগ্ধ আমার বড় বোনের প্রথম সন্তান। মুগ্ধকে আমরা আদরে, যত্নে আগলে রেখে বড় করেছি। সে মাইলস্টোনেই পড়ে। বিমান যখন আছড়ে পড়ে, পাশের ভবনেই ছিল মুগ্ধ। তার কোনো ক্ষতি হয়নি ভেবে স্বস্তি পাওয়ার পরেই যে ভাবনা আমাকে গ্রাস করল, আচ্ছা বিমান যেখানে বিধ্বস্ত হলো, সেখানে তো আরও অনেক ‘মুগ্ধ’ ছিল। তারাও কারও ভাগনে-ভাস্তে। কারও সন্তান।

নৈঋতা তার বোনের একেবারে উল্টো। মাকে যেতেই হবে না, প্রথম দিন সে স্কুলে গেল বাবার সঙ্গে। স্কুলের গেট পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রাখা আমার আঙুলটা ছেড়ে দিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে একটুও পেছন ফিরে না তাকিয়ে নৈঋতা যেই ক্লাসরুমে ঢুকে গেল, আমি অনুভব করলাম, এখান থেকেই অদৃশ্য এক দূরত্বের তৈরি হওয়া শুরু।

একটু পরেই পুরো ফেসবুক ভেসে গেল মন গুঁড়িয়ে দেওয়া আবেগে। আমি খুবই দুর্বলচিত্তের মানুষ। সামান্য রক্তপাত সহ্য করতে পারি না। ফেসবুক বন্ধ করলাম, সারা দিনে আর ঢুকিইনি। তবু বাতাস বয়ে আনতে থাকল একের পর এক খবর। বয়ে আনতে থাকল গুজবও।

সেদিন অফিস শেষে কীভাবে বাসায় গেছি মনে নেই। নৈঋতা দরজা খুলে দিল। প্রতিদিনই দেয়। আমার ফেরার অপেক্ষা করে। আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। নৈঋতা চকলেট আনতে বলেছিল ফোনে। একদমই ভুলে গেছি। অভিমান করে গাল ফুলিয়ে নৈঋতা চলে গেল। বাবার সঙ্গে আর কথাই বলবে না!

আমার খুব কান্না পেয়ে গেল। কেবলই মনে হতে থাকল, আজ রাতে অনেক বাবা বাসায় ফেরার আগে দোকানে ঢুঁ মারবেন না। চকলেট আনার আবদার করত যে, সে চলে গেছে অভিমান-আবদারের ঊর্ধ্বে।

মুগ্ধ যখন খুব ছোট ছিল, আকাশে বিমানের শব্দ শুনতে পেলেই ‘পেলেন পেলেন’ বলে চিৎকার করে ছুটে যেত বারান্দায়। এদিক–ওদিক তাকিয়ে খুঁজত বিমান।

আমার কেবলই মনে হচ্ছে, মুগ্ধদের ক্লাস যখন আবার শুরু হবে, প্রতিবার ক্যাম্পাসের ওপর দিয়ে যখন কোনো বিমান ছুটে যাবে, বিমানের গর্জন কি বারবার তাদের বুক ছিন্নভিন্ন করবে না?

আরও পড়ুন
উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সামিউল করিম
ছবি: সংগৃহীত

আমার দুই মেয়ে। ঋদ্ধি আর নৈঋতা। দুজনই মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে পড়ে। ঋদ্ধি সেভেনে, নৈঋতা মাত্র ভর্তি হলো। ঋদ্ধি যখন আরেকটু ছোট ছিল, ওকে স্কুলে দিয়ে আসতাম। ঋদ্ধির পলকা শরীর। ঘাড়ে স্কুলব্যাগ। স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী। ঋদ্ধি কখনো খেয়াল করেছে কি না জানি না। স্কুলগেট পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার সময় আমি পেছন থেকে এক হাত দিয়ে ব্যাগটা উঁচিয়ে ধরে রাখতাম। যেন তার কষ্ট কম হয়।

মনে আছে, ঋদ্ধি যখন প্রথম দিন স্কুলে গেল, পুরোটা ক্লাস তার মাকে বসে থাকতে হয়েছিল পাশের ছোট্ট চেয়ারে!

নৈঋতা তার বোনের একেবারে উল্টো। মাকে যেতেই হবে না, প্রথম দিন সে স্কুলে গেল বাবার সঙ্গে। স্কুলের গেট পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রাখা আমার আঙুলটা ছেড়ে দিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে একটুও পেছন ফিরে না তাকিয়ে নৈঋতা যেই ক্লাসরুমে ঢুকে গেল, আমি অনুভব করলাম, এখান থেকেই অদৃশ্য এক দূরত্বের তৈরি হওয়া শুরু।

এখন থেকেই তার নিজস্ব জগৎ তৈরি হতে থাকবে একটু একটু করে। তৈরি হবে বন্ধু। তারপর একদিন আসবে, আমার আঙুল ধরার প্রয়োজনই আর পড়বে না। টুথ ফেইরির দিনও পেরিয়ে যাবে। বাবার জন্য গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসার দিন পেরিয়ে আসবে বাবাকে না-বলার সিক্রেট, গোপনে লেখা পিংক ডায়েরি।

কিন্তু ওই যে বলে না, মা–বাবার কাছে সন্তানেরা কখনো বড় হয় না। আমার মা তো মানতেই পারে না আমার চুল পেকে গেছে! আমি বড় হয়েছি অভাবের সংসারে। তবু আমাদের সংসারে আর যা-ই হোক, ভালোবাসার অভাব ছিল না।

এখন বুঝি, ডিম–আলুর ডাল রান্না হলে দুটো ডিম অর্ধেকটা করে আমরা চার ভাইবোন দিব্যি খেয়ে নিতাম। তখন বুঝতাম না। এখন নিজে বাবা হয়ে বুঝি, কেন মা পাখিটা নিজে না খেয়ে পোকা ধরে এনে তার ছোট্ট ছানাদেরই খাওয়ায়।

এই লেখা আমি লিখছিলাম আর বিষাদ আমাকে গ্রাস করছিল। অনেকবারই ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে গেছি। কিন্তু লেখকের জীবন মানে অভিশপ্ত এক জীবন। তাঁকে লিখে যেতেই হয়। শরীর-মন মানে না।

সম্রাট হুমায়ুন যখন ছোট ছিলেন, একবার তাঁর ভীষণ অসুখ হলো। কিছুতেই অসুখ সারে না। জীবন সংকটে। তাঁর বাবা সম্রাট বাবর সারা রাত ইবাদত করে আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে মোনাজাত করলেন, ‘হে খোদা, তুমি আমার বাকি সবটুকু আয়ু আমার সন্তানকে দাও।’

পৃথিবীর অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না। সম্রাট বাবরের সেই প্রার্থনা কবুল হয়েছিল। হুমায়ুন ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন। সম্রাট বাবর রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মাইলস্টোনের ঘটনার পর থেকে আমার কেবলই মনে হচ্ছে, ওই পরিবারের মায়েরা, বাবারা কীভাবে বাকি জীবন পার করবেন? সন্তান খুকখুক করে কাশলেও মা-বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সন্তানের জ্বর হলে জলপট্টির মতো সেই উত্তাপ নিজের শরীরে শুষে নিতে চান মা-বাবারা।

যে মা পরম যত্নে সন্তানকে পোশাক পরিয়ে দিতেন, নিজের চোখের সামনে সেই সন্তানকে সাদা কাফনে মোড়ানো হচ্ছে দেখে কীভাবে সহ্য করবেন! যে বাবা নিজের কাঁধে তুলে নিতেন সন্তানকে, সেই কাঁধে সন্তানের লাশের ভার বইলেন কী করে? বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতেন সে সন্তানকে, সে বাবা কী করে ছোট্ট কবরে নিজ হাতে সন্তানকে শুইয়ে দিয়ে এলেন চিরনিদ্রায়!

যে মরে যায়, সে-ই ‘বেঁচে’ যায়। মরণ তো তাদের, যারা বেঁচে থাকে!

আরও পড়ুন
মাহেরীন চৌধুরী
ছবি: ফেসবুক থেকে

মাহেরীন মিস নিজের জীবন বিপন্ন করে আগুনের ভেতর থেকে অন্তত ২০টি শিশুকে বের করে নিয়ে আসেন। তাঁর শরীরের অবস্থা দেখে উদ্ধারকারী দলের একজন নিষেধ করেছিলেন ভেতরে যেতে। মাহেরীন মিস শোনেননি। আবার ছুটে গেছেন। নিজের মৃত্যুর ঝুঁকি আর নিষ্পাপ শিশুদের জীবনের মধ্যে দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বামীর হাতে হাত রেখে মাহেরীন মিস বলেন, ‘আমাদের আর দেখা হবে না।’ বুকভাঙা কান্নায় ভেসে যেতে যেতে স্বামী বলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে কেন এমন করলা! আমাদেরও তো দুইটা বাচ্চা আছে। তুমি তাদের কথা ভাবলা না? আমার বাচ্চা দুইটাকে এতিম করে দিলা!’ মাহেরীন মিস বলেছিলেন, ‘যারা ভেতরে আটকা পড়েছিল, তারাও তো আমার সন্তান!’

এই লেখা আমি লিখছিলাম আর বিষাদ আমাকে গ্রাস করছিল। অনেকবারই ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে গেছি। কিন্তু লেখকের জীবন মানে অভিশপ্ত এক জীবন। তাঁকে লিখে যেতেই হয়। শরীর-মন মানে না। তবু আবার বসতে হয় ল্যাপটপে। অবাধ্য আঙুলগুলোকে শাসন করে খুটখুট টাইপ করে যেতে হয়।

কিন্তু এই অংশটা লিখতে গিয়ে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। আমি কাঁদছি আর লিখছি। লিখছি আর কাঁদছি।

প্রিয় মাহেরীন মিস, আপনি আমার শিক্ষক ছিলেন না। কিন্তু ভীষণ স্বার্থপর এই পৃথিবীর অনেকের শিক্ষক হয়ে গেলেন। আপনি আমাদের শেখালেন: অন্যের জন্য জীবন দিয়ে যাওয়াই মানে সার্থকভাবে ‘বেঁচে’ থাকা! আপনি যেন আমাদের সবাইকে ভাবসম্প্রসারণ শেখাচ্ছেন:

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

এ জীবন মন সকলি দাও,

তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?

আপনার কথা ভুলিয়া যাও...

আরও পড়ুন