ওরা ভাসছিল কাগজের প্লেনের স্বপ্নে
‘ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে
কলকলাইয়া ছলছলাইয়া
কোন সাগরে
যাস যেথা নে না তুই আমারে...’
বাংলাদেশি ব্যান্ড রেনেসাঁর এই গান গেয়ে সুর, হাসি আর আনন্দে কাটছিল রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছোট শিক্ষার্থীদের। সুখদেব সূত্রধর নামের একজন ফেসবুকে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের গান গাওয়ার এমন কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ক্লাসরুমে সুখদেব গান শেখাচ্ছেন তাদের। সুখদেবের পরিচয়ে লেখা—সংগীত শিক্ষক, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
এর পরের ঘটনা হৃদয়বিদারক। নিশ্চয়ই সবার জানা। ২১ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এরপরই আগুন ধরে যায় স্কুল ভবনে। এ ঘটনায় বুধবার পর্যন্ত ৩২ জনের নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। এর মধ্যে অধিকাংশই খুদে শিক্ষার্থী।
নদী যেখানেই যাক, গানে গানে শিশুরা তার সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। নরম মনের মানুষ কি এই হিংস্রতা আর জঞ্জালে ভরা শহরে থাকতে পারে! তাই হয়তো নদীর লোভে সারা দিন জলের মতো হয়ে থাকে নরম মনের শিশু। ড্রয়িং খাতায় এঁকে রাখে একটি ঘর, যে ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর কাছে যাবে। আর আঁকে মাছের শরীর। আর খাতার অর্ধেকজুড়ে আঁকা থাকে ঢেউ আর জল। তবু তারা নদীর কাছে যেতে পারেনি। গেছে অন্য কোনো দূরে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সামিউল করিম। সামিউল সোমবার স্কুলে যেতে চায়নি। মায়ের কাছে আবদার করেছিল সে বাসায় থাকবে। সকালে উঠে ছোটবেলার খেলনা উড়োজাহাজ শোকেস থেকে নামিয়ে মুছে পরিষ্কার করে খেলছিল সামিউল। কিন্তু তার মা বুঝিয়ে-শুনিয়ে স্কুলে যেতে রাজি করান। বাবা রেজাউল সোমবার সকালে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে গেটের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছেলে যখন দোতলার সিঁড়ি বেয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে, তা দেখে বাসায় ফিরে অফিসে যান। বেলা একটার দিকে তিনি আবার স্কুলের গেটে ছেলেকে বাসায় নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। স্কুল ছুটি হয়েছে তখন, সামিউল কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হেলেদুলে বাবার দিকে আসছিল। বাবা তাঁর ৫ ফুট দূরত্বে। ঠিক ওই সময় বিধ্বস্ত বিমানের একটি জ্বলন্ত অংশ সামিউলের পেছনে আঘাত করে। রেজাউল হতবিহ্বল হয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমার ছেলেকে বাঁচান।’ কিন্তু বাঁচতে পারেনি সামিউল। এ রকম বাঁচতে পারেনি আরও অনেক ফুলের মতো শিশু, আমাদের হীরামণি ফুল।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন লাগার পর একটি ছবিতে দেখা গেছে, স্কুলের ইউনিফর্ম পরা একটি শিশু আহত হয়ে পড়ে আছে। আর তাকে ধরে একই পোশাক পরা আরেকটি শিশু আর্তচিৎকার করছে। হয়তো তারা সহপাঠী, হয়তো তারা বন্ধু। ঘাসের ওপর বন্ধুর পোড়া ক্ষতের ব্যথার পাশে উপশম হয়ে বসে আছে আরেক বন্ধু। বন্ধুকে বাঁচানোর কী প্রাণান্ত চেষ্টা তার! এই দৃশ্য আমাদের আরেকবার বুঝিয়ে দিল, বন্ধুর জন্য বন্ধুর ভালোবাসা কত! বুঝিয়ে দিল, প্রতিটি শিশুই একেকটি ফুলগাছ। যার সৌন্দর্য, সারল্য, ক্ষমা ও ভালোবাসার কাছে আমরা বারবার হেরে যাই।
বাড়ি ফিরে এসব শিশুর মাকে জাপটে জড়িয়ে থাকার বয়স। ঘুড়ির লেজে ঘাস বেঁধে নিজেকে ওড়ানোর বয়স। প্রজাপতির পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়ানোর বয়স। অথচ জীবন বড় আশ্চর্য জায়গায় এসে থেমে গেল তাদের। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর লাগা আগুনে নিভে গেছে তাদের জীবন। সেদিন সকালে শেষবারের মতো মাকে জাপটে জড়িয়ে ধরে তাঁর বুক থেকে ছুটি নিয়ে সমস্ত মানুষ ও মোহ পেরিয়ে বহুদূরে চলে গেছে তারা। যেখানে কোনো দিন কোনো ঘুড়ি কাটা পড়েনি, যেখানে নিজেদের ওড়ানো কাগজের প্লেন আছড়ে পড়লে, বিধ্বস্ত হলেও ছিঁড়বে না কোনো ফুলের পাপড়ি।
এই জগৎ ছোট শিশুদের ধরে রাখতে পারল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কবে বলেছেন, ‘কোটি কোটি ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে/ বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে,/ হাসে খেলে মৃত্যু চারিপাশে।/ এ ধরণী মরণের পথ,/ এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ।’ মরণের পথ এ ধরণীতেই এত দিন হেসে খেলে, গান গেয়ে বড় হচ্ছিল মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছোট শিক্ষার্থীরা। স্কুলে তাদের কারও সেকশনের নাম ছিল ‘ক্লাউড’, কারও সেকশনের নাম ছিল ‘স্কাই’। কী আশ্চর্য, সত্যিই তারা চারদিকে মেঘ ছড়িয়ে বিশাল আকাশের অংশ হয়ে গেল। প্রজাপতির সঙ্গে নিশ্চয়ই তাদের হৃদয়ের সম্পর্ক। খুব কাছের সম্পর্ক। নইলে এত দ্রুত ডানা পেয়ে তারা উড়ে গেল কীভাবে!
ফেসবুকে পোস্ট করা সুখদেব সূত্রধরের আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ক্লাসে সহপাঠী শিশুরা একে অপরের হাত ধরে গাইছে—
‘একদিন ছুটি হবে অনেক দূরে যাব
নীল আকাশে সবুজ ঘাসে খুশিতে হারাব।
যেখানে থাকবে না কোনো বাঁধন
থাকবে না নিয়মের কোনো শাসন।
পাখি হয়ে উড়ব ফুল হয়ে ফুটব।
পাতায় পাতায় শিশির হয়ে হাসি ছড়াব।’
যদিও গান গাওয়া সেই শিশুরা সুস্থ আছে, কিন্তু গানটি শুনলেই মনে পড়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো শিশুদের কথা। অকালে তারা চলে গেল অনেক দূরে। সেখানে কি থাকবে আমাদের এসব কোমল মনের শিশুর গানের ইশকুল? তারা হয়তো একে অপরের হাত ধরে গোল হয়ে দুলে দুলে গান গাইবে। সেখান থেকে নিশ্চয়ই তারা ফুল হয়ে ফুটবে, পাতায় পাতায় শিশির হয়ে হাসি ছড়াবে।