আমার মেয়ের মতো করে যেন কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়
২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি আমার মেয়ে হিন্দের কণ্ঠ আমি শেষবারের মতো শুনেছিলাম। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই কণ্ঠের অনুপস্থিতিই আজও আমাদের ঘরে সবচেয়ে জোরে বাজতে থাকা শব্দ।
সেদিন হিন্দ একটি ছোট গাড়ির ভেতর আটকা পড়েছিল। চারদিকে ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ট্যাংক। হিন্দের পাশেই পড়ে ছিল ওর কাজিনদের নিথর দেহ। ওদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল হিন্দের জামাকাপড়। সে ছিল মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু। ফোনে ফিসফিস করে আমাকে বলছিল, ওর বাথরুমে যেতে হবে। সে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছিল। অ্যাম্বুলেন্স আসার অপেক্ষায় ছিল উদ্ধারকর্মী। ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে হিন্দের সেই কথোপকথন রেকর্ড হয়েছিল। পরে সারা বিশ্বের মানুষ তা শুনেছে।
আমার মেয়ে হিন্দ রাজাব জন্ম নেয় ২০১৮ সালের ৩ মে। এর আগে বহু বছর বন্ধ্যত্ব, বহু বছর প্রার্থনা, বহু বছর এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিলাম, খোদা হয়তো আমার জন্য মাতৃত্বের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন।
যেদিন আমি গর্ভবতী হলাম, মনে হয়েছিল—আমি যেন নিজেই আশাকে বহন করছি। হিন্দের জন্ম ছিল কঠিন। সে প্রায় মরেই গিয়েছিল। কিন্তু যখন ওর ছোট্ট শরীরটা আমার কোলে তুলে দেওয়া হলো, আমি খোদার কাছে ফিসফিস করে একটি প্রার্থনা করেছিলাম, যা আমাদের দুজনের মধ্যে একটি প্রতিশ্রুতি হয়ে রইল, ‘হে আল্লাহ, ওর গন্ধটা আমার সঙ্গে থাকতে দাও। আর যখন জীবন আমাকে চূর্ণ করবে, তখন হিন্দের গন্ধই যেন আমাকে টিকে থাকার শক্তি দেয়।’
আমি জানতাম না, এক নতুন মায়ের সেই সরল প্রার্থনাই একদিন জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র সুতা হয়ে উঠবে।
গাজায় জীবন পৃথিবীর আর কোনো জায়গার জীবনের মতো নয়। আমার সন্তানেরা আর আমি কখনোই এমন কোনো জীবন পাইনি, যাকে অন্য দেশের মানুষ ‘স্বাভাবিক’ বলে। আমরা সব সময়ই উচ্ছেদ বা মৃত্যুর কিনারায় বেঁচে থেকেছি। আমাদের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তগুলোতে যখন ভয় আমাদের চারদিক থেকে চেপে ধরত, বেঁচে থাকা অসম্ভব মনে হতো, তখন হিন্দের গন্ধ আমাকে শান্ত করত।
আমাদের পরিবার সবকিছু সহ্য করেছে। হঠাৎই মনে হলো, সবকিছু যেন সেই দুই বছর আগের অসহনীয় মুহূর্তটির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। আমরা লাগাতার ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের মধ্যে ছিলাম। অগণিতবার আমরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়েছি। এতবার যে তা আমরা গুনতে পারি না। ২৯ জানুয়ারি আমাদের আবার পালাতে হয়েছিল। হিন্দ ছয়জন পরিবারের সদস্যের সঙ্গে একটি গাড়িতে উঠেছিল। গাড়িটিতে গুলি চালানো হয়। হিন্দ ছাড়া গাড়ির ভেতরের সবাই নিহত হন।
আমার মেয়ে আটকে পড়া অবস্থায় সাহায্যের জন্য আকুতি করছে, এটা শোনার মতো যন্ত্রণা কোনো মায়েরই পাওয়ার কথা নয়।
আমি যখন ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কর্মীরাও তাঁদের কেন্দ্র থেকে ফোনে ওর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তাঁরা জানতেন, ও ঠিক কোথায় আছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে একটি অ্যাম্বুলেন্স ওর কাছে পৌঁছাতে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে ছিল। মাত্র কয়েক মিনিট।
এর আগে উদ্ধার করতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সবুজ সংকেত পেতে প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে যায়। অবশেষে যখন একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয় এবং সেটি হিন্দের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন সেটির ওপর গুলি চালানো হয়। ভেতরে থাকা দুই প্যারামেডিক নিহত হন। প্রায় দুই সপ্তাহ পর হিন্দকে সেই গাড়ির ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, অ্যাম্বুলেন্সটির তাদের অনুমতির প্রয়োজন ছিল না। তারা ওই এলাকায় ছিল না। কিন্তু একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে, তারা সেখানে উপস্থিত ছিল এবং সম্ভবত হিন্দ ও আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যার জন্য তারা দায়ী।
আমি এটুকু জানি, আমার মেয়ে একা একা মারা গেছে। কাউকে এসে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিনতি করতে করতে মরে গেছে। আর আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি।
হিন্দ ওর বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান ছিল। স্কুলে যাওয়ার আগেই আমি ওকে লিখতে শিখিয়েছিলাম। ওর প্রথম স্কুলের খাতা এখনো আমার কাছে আছে। যখন ও স্কুলে ভর্তি হলো, শিক্ষকেরা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আরবি ও ইংরেজি—সব প্রশ্নেরই উত্তর ওর জানা ছিল। ও ওর ছোট ভাই ইয়াদের খুব যত্ন নিত এমন এক মমতায়, যা ভাষায় বোঝানো কঠিন। বয়সের তুলনায় অনেক ওপরে উঠে ও ছিল এক সত্যিকারের বড় বোন, এক রক্ষাকর্তা। আজও ইয়াদ জিজ্ঞেস করে, ‘ওকে ছাড়া আমি কী করব?’
আমার কাছে কোনো উত্তর নেই।
হিন্দের মতো করে কোনো শিশুরই মরে যাওয়ার কথা নয়। একইভাবে কোনো শিশুরই লাগাতার বোমাবর্ষণ, অনাহার আর উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে বেঁচে থাকার কথা নয়। আমার মেয়ে ছিল গাজার সেই হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর একজন, যাদের গল্প শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। ২০ হাজার ভবিষ্যৎ—স্রেফ মুছে গেছে।
যখন চলচ্চিত্র নির্মাতা কাওতার বেন হানিয়া আমার মেয়ে হিন্দের শেষ ঘণ্টাগুলো নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানানোর জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমি দ্বিধায় ছিলাম। আমি তখনো শোকে ডুবে ছিলাম। সেই মুহূর্তগুলো আবার বাঁচিয়ে তোলার ভাবনা আমাকে আতঙ্কিত করেছিল। কিন্তু আমি এটাও জানতাম, যদি পৃথিবী হিন্দের কথা না শোনে, ওর হত্যাকাণ্ডও শুধু আরেকটি সংখ্যায় পরিণত হবে। আমি ভেবেছিলাম, যদি পৃথিবী ওর কণ্ঠ শোনে, হয়তো অন্য শিশুদের বাঁচানো যাবে।
গাজায় শিশুদের রক্ষা করার মানে হতে হবে শিশুদের জন্য বাস্তব সুরক্ষা। শুরুতেই দরকার এমন একটি যুদ্ধবিরতি, যা শুধু কাগজে-কলমে নয়, সত্যিই জীবন বাঁচাবে। কারণ, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। এর অর্থ হতে হবে বোমাবর্ষণ বন্ধ করা এবং এমন একটি শাসনব্যবস্থার কাছে দায়িত্ব দেওয়া, যারা আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করবে। কারণ, এই অস্ত্র সরবরাহ স্পষ্টভাবেই আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায়, আমাদের মুছে ফেলতে চায়। বাস্তব সুরক্ষার মানে আরও চিকিৎসা করিডর খুলে দেওয়া, আরও খাদ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া। এর মানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শুধু হিন্দের মৃত্যুর জন্য নয়, বরং সেই হাজার হাজার শিশুর জন্য, যাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
যখন শিশুদের হত্যা, অনাহার ও উচ্ছেদের সময় বিশ্ব নীরব থাকে, সেই নীরবতা অপরাধের সঙ্গী হয়ে ওঠে। বেঁচে থাকার অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি শিশুর মৃত্যু মানবতার ব্যর্থতা।
আমি গাজার একজন মা। একসময় আমার মেয়ের গন্ধকে বর্মের মতো পরে আমি বেঁচে ছিলাম। এখন আমি সেই গন্ধ গায়ে লাগিয়ে বেঁচে আছি। কারণ, ওটাই আমার সব। আমি হিন্দের কণ্ঠ বহন করে বেঁচে থাকি, যেন অন্য শিশুদের বাঁচানো যায়। ওর কণ্ঠই যেন পৃথিবীকে নাড়া দেয়। যেন তারা শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে, গাজার শিশুরাও অন্য সব শিশুর মতোই বেঁচে থাকার, বড় হওয়ার আর স্বপ্ন দেখার অধিকার রাখে।
আমার মেয়ে হিন্দের হত্যা আমাকে ভেঙে দেয়নি, বরং আমাকে একটি মায়ের দায়িত্ব দিয়ে গেছে। দায়িত্বটা হলো, যেন আর কোনো শিশুর কণ্ঠ থেমে না যায়। আমার মেয়ের মতো করে যেন কোনো শিশুর মৃত্যু না হয়।
*ওয়েসাম হামাদা গাজার একজন মা ও অধিকারকর্মী
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ: আহমাদ মুদ্দাসসের