শতবর্ষে অ্যাটেনবরো: মানুষের ভাষায় পুরো পৃথিবীর কণ্ঠস্বর

অ্যাটেনবরোস্কাই নিউস অস্ট্রেলিয়া

১৯৫৪ সাল। ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো দ্বীপ। চারদিকে প্রখর রোদ। বাতাসে কেমন একটা সোঁদা গন্ধ। ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছেন এক তরুণ অভিযাত্রী। তাঁর হাতে একটা ভারী সিক্সটিন এমএম ক্যামেরা। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। কারণ, মাত্র কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সরীসৃপ কোমোডো ড্রাগন। ১০ ফুটের সেই বিশাল প্রাণীটি লকলকে জিব বের করে শিকারের ঘ্রাণ নিচ্ছে। সামান্য একটা ভুল পদক্ষেপ মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু সেই তরুণের চোখে ভয়ের চেয়ে বিস্ময় বেশি। তিনি জানেন, এই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে পারলে পুরো পৃথিবী বদলে যাবে। মানুষ প্রথমবারের মতো নিজের চোখে দেখবে আদিম এক জগতের ছায়া।

সেই তরুণের নাম ডেভিড অ্যাটেনবরো। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। ১০০ বছর! যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নীল টাই, নীল শার্ট এবং সেই চিরচেনা জাদুকরি কণ্ঠস্বর! ৭০ বছর ধরে আমাদের এই নীল গ্রহের প্রতিটি কোনা তিনি চিনিয়েছেন। এখনো কাজ করে চলছেন। দীর্ঘ জীবন কাটানো এই গুণী মানুষের শততম জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে একটু না জানলে চলে?

দুই

গল্পটা শুরু ১৯২৬ সালে, লন্ডনের উপকণ্ঠে। ডেভিড তখন খুব ছোট। তাঁর বাবা ফ্রেডরিক অ্যাটেনবরো ছিলেন লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। ফলে ডেভিডের শৈশব কাটে বিশাল এক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর। তখন থেকেই ডেভিডের চোখে ছিল এক অন্য রকম কৌতূহল। তাঁর বয়সী অন্য বাচ্চারা যখন ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত, ডেভিড নাকি তখন ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়ে হামাগুড়ি দিয়ে পাথর ও জীবাশ্ম খুঁজে বেড়াতেন। মানুষ অনেক খ্যাতি পেলে তাঁকে নিয়ে অনেক গল্প বানানো হয়। বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, সে শৈশব থেকেই খেলাধুলা না করে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। কিন্তু তার সবটা সত্যি হয় না। তবে অ্যাটেনবরোর এই জীবাশ্ম খুঁজে বেড়ানোর বিষয়টা আসলেই সত্যি। কারণটা একটু পড়েই জানতে পারবে।

আরও পড়ুন

তিন ভাইয়ের মধ্যে ডেভিড ছিলেন মেজ। বড় ভাই রিচার্ড অ্যাটেনবরোর মাথায় সব সময় ঘুরত অভিনয় ও নাটক। তোমরা হয়তো তাঁকে চেনো। ‘জুরাসিক পার্ক’ মুভিটা দেখেছ না? মুভিতে পার্কের মালিক হ্যামন্ডকে মনে আছে? এই হ্যামন্ডই হলেন অ্যাটেনবরোর বড় ভাই রিচার্ড। তিনি পরিচালক হিসেবে অস্কার পেয়েছিলেন। আর তাঁর ছোট ভাই জনের ঝোঁক ছিল গাড়ির দিকে।

ডেভিড অ্যাটেনবরো ছিলেন প্রকৃতির নেশায় চুর। নিজের ঘরের এক কোণে তিনি বানিয়ে ফেলেছিলেন এক প্রাইভেট মিউজিয়াম। সেখানে থরে থরে সাজানো থাকত অদ্ভুত সব পাথর, মরা প্রজাপতি ও প্রাগৈতিহাসিক ফসিল।

ডেভিড অ্যাটেনবরো
বিবিসি ওয়াল্ডলাইফ ম্যাগাজিন

একবার এক বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। ছোট্ট ডেভিডের সংগ্রহ দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো আস্ত একটা আর্কাইভ বানিয়ে ফেলেছ!’ সেই দিনের সেই প্রশংসা হয়তো ডেভিডের মনে বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসার এক শক্ত দেয়াল তুলে দিয়েছিল।

ডেভিডের ছোটবেলার আরেকটি দারুণ গল্প আছে। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের জন্য গবেষণার কাজে নিউট (একধরনের উভচর প্রাণী) লাগত। ডেভিড জানতেন, ক্যাম্পাসের পেছনের একটা পুরোনো পুকুরে প্রচুর নিউট আছে। তিনি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধানের কাছে গিয়ে প্রস্তাব দিলেন, ‘আমি আপনাদের নিউট এনে দেব, তবে প্রতিটি নিউটের জন্য আমাকে তিন পেন্স করে দিতে হবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাজি হয়ে গেল। ডেভিড মনের সুখে পুকুর থেকে নিউট ধরে এনে টাকা জমাতে শুরু করলেন। মজার ব্যাপার হলো, সেই পুকুরটা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছিল, কিন্তু তারা জানত না সেখানে এত নিউট আছে! এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, প্রকৃতির প্রতিটি খুঁটিনাটি দেখার ক্ষমতা তাঁর ছোটবেলা থেকেই ছিল।

তিন

ডেভিডের পড়াশোনা ছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লেয়ার কলেজে। বিষয় ছিল ভূতত্ত্ব ও প্রাণিবিদ্যা। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৪৭ সালে তিনি ব্রিটিশ রয়্যাল নেভিতে যোগ দিলেন। দুই বছর সাগরে সাগরে ঘুরে বেড়ানোর সময় তিনি অনুভব করলেন, সাগরের বিশালতা তাঁকে ডাকছে। কিন্তু যুদ্ধের জাহাজ ও সামরিক অনুশাসনের চেয়ে তাঁর মন বেশি টানত অজানাকে জানার নেশা। ১৯৫০ সালে নেভি ছেড়ে তিনি যখন ঘরে ফিরলেন, তখনো জানতেন না—তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্বজয়ের এক অন্য রকম সুযোগ।

রয়্যাল নেভি থেকে ফেরার পর ডেভিড চাইলেন রেডিওতে কাজ করতে। তিনি বিবিসি রেডিওতে প্রডিউসার পদে আবেদন করলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিবিসি তাঁকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করল! তারা বলল, ‘আপনার কণ্ঠস্বর রেডিওর জন্য উপযুক্ত নয়।’ ভাগ্যের কী পরিহাস! যে মানুষের কণ্ঠস্বর আজ সারা বিশ্বের মানুষের কানে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়, তাঁকেই একদিন রিজেক্ট করেছিল বিবিসি।

আরও পড়ুন

তবে সেই আবেদনপত্র কোনোভাবে গিয়ে পৌঁছাল বিবিসির টেলিভিশন বিভাগের মেরি অ্যাডামসের হাতে। মেরি ডেভিডের ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হলেন। তাঁকে টিভিতে কাজের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু শুরুর দিকে তাঁকে ক্যামেরার সামনে যেতে দেওয়া হতো না। কেন জানো? কারণ, বিবিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মনে হয়েছিল, ডেভিডের দাঁতগুলো নাকি একটু বেশিই বড়! টিভিতে তাঁকে দেখতে নাকি ভালো লাগবে না। তাই তাঁকে ক্যামেরার আড়ালে প্রযোজক বা প্রডিউসার হিসেবে কাজ দেওয়া হলো। কিন্তু প্রতিভা কি আর দাঁতের দোহাই দিয়ে আটকে রাখা যায়?

১৯৫৪ সাল। ডেভিড ভাবলেন, টিভিতে কেন শুধু চিড়িয়াখানার খাঁচায় আটকে থাকা প্রাণী দেখানো হবে? মানুষ কেন তাদের নিজেদের রাজ্যে গিয়ে দেখবে না? শুরু হলো তাঁর যুগান্তকারী সিরিজ ‘জু কোয়েস্ট’। সেই সময়কার ক্যামেরাগুলো তো আর এখনকার মতো ছোট ছিল না! মোবাইলেও ছবি তোলা যেত না। বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল না আধুনিক জিপগাড়ি। কিন্তু ডেভিডের ছিল অদম্য সাহস।

সিয়েরা লিওন, গায়ানা ও ইন্দোনেশিয়ার গভীর জঙ্গলে পাড়ি দিলেন তিনি। কোমোডো ড্রাগন থেকে শুরু করে আফ্রিকার বিরল প্রজাতির পশুপাখি—সবকিছু তিনি প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমের টিভির পর্দায় নিয়ে এলেন। মানুষ অবাক হয়ে দেখল, পৃথিবীটা কতই না বৈচিত্র্যময়! এই সিরিজের মাধ্যমেই ডেভিড প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং সারা বিশ্বের মানুষের প্রিয় মুখ হয়ে উঠলেন।

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো
ছবি: রয়টার্স

১৯৬৫ সালে ডেভিডকে বিবিসি টু চ্যানেলের প্রধান করা হয়। এই পদ ছিল রাজকীয়। ইউরোপে প্রথম রঙিন টেলিভিশন চালুর কৃতিত্ব কিন্তু এই ডেভিডেরই। রঙিন টিভিতে রংগুলো কত নিখুঁত দেখায়, তা বোঝানোর জন্য তিনি রঙিন টেনিস বল ও স্নুকার খেলা সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই টিভিতে এসেছিল কালজয়ী সব কমেডি ও আর্ট প্রোগ্রাম।

কিন্তু আট বছর অফিসে বসে ফাইলে সই করার পর তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তিনি বুঝলেন, এসি রুমে বসে থাকার জন্য তাঁর জন্ম হয়নি। ১৯৭৩ সালে তিনি বিবিসির সেই বিশাল ক্ষমতার পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। সবাই অবাক হয়ে বলেছিল, ‘আপনি পাগল নাকি? এত বড় পদ কেউ ছাড়ে?’ ডেভিড হাসিমুখে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি বনের পাখি, আমাকে বনেই মানায়।’

চার

পদত্যাগ করার পর ডেভিড হাত দিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজেক্টে। ১৯৭৯ সালে মুক্তি পেল ১৩ পর্বের ডকুমেন্টারি সিরিজ ‘লাইফ অন আর্থ’। এটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক মহাকাব্য। পৃথিবীর জন্ম থেকে শুরু করে প্রাণের বিবর্তন পর্যন্ত সবকিছু তিনি এত সুন্দরভাবে বর্ণনা করলেন, সাধারণ মানুষও বিজ্ঞানের প্রেমে পড়ে গেল।

এই সিরিজের একটি দৃশ্য সারা বিশ্বের মানুষের মনে গেঁথে আছে। রুয়ান্ডার জঙ্গলে পাহাড়ি গরিলাদের সঙ্গে কাটানো সেই মুহূর্ত। ডেভিড যখন শান্ত হয়ে শুয়ে ছিলেন, তখন বিশাল এক গরিলা এসে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। গরিলা ছানাগুলো তাঁর গায়ের ওপর দিয়ে লাফালাফি করতে থাকে। ডেভিড ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘এদের চোখের দিকে তাকালে আপনি নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাবেন। আমরা আলাদা কেউ নই, আমরা সবাই এই পৃথিবীর সন্তান।’ এটি শুধু টেলিভিশন প্রোগ্রাম ছিল না, এটি ছিল মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক আত্মিক মিলনের দলিল।

আরও পড়ুন

এরপর একে একে এসেছে ‘দ্য লিভিং প্ল্যানেট’, ‘দ্য ট্রায়ালস অব লাইফ’, ‘প্ল্যানেট আর্থ’, ‘ব্লু প্ল্যানেট’, ‘আওয়ার প্ল্যানেট’-এর মতো মাস্টারপিস সব কাজ। তাঁর প্রতিটি সিরিজে তিনি নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। সমুদ্রের ৩ হাজার ফুট নিচে গিয়ে শুটিং করা থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চলের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় কয়েক মাস কাটিয়ে দেওয়ার মতো অসম্ভব ধৈর্য তিনি দেখিয়েছেন। কোনো কাজের প্রতি অটুট ভালোবাসা না থাকলে এমনটা করা সম্ভব হয় না।

অ্যাটেনবরোর পারিবারিক জীবন ছিল খুব ছিমছাম। ১৯৫০ সালে তিনি জেন এলিজাবেথ এবসওয়ার্থ ওরিয়েলকে বিয়ে করেন। ডেভিড যখন মাসের পর মাস শুটিংয়ের জন্য পৃথিবীর এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াতেন, তখন জেনই আগলে রাখতেন তাঁদের দুই সন্তান সুসান ও রবার্টকে। জেন ছিলেন ডেভিডের সবচেয়ে বড় শক্তি।

কিন্তু ১৯৯৭ সালে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি নেমে আসে। জেন ব্রেন হ্যামারেজে আক্রান্ত হন। ডেভিড তখন নিউজিল্যান্ডে ‘দ্য লাইফ অব বার্ডস’ সিরিজের শুটিং করছিলেন। খবর পেয়েই তিনি পাগলের মতো ছুটে আসেন লন্ডনে। জেন যখন শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন ডেভিড তাঁর পাশে বসে হাতটি ধরে ছিলেন। জেনের মৃত্যুর পর ডেভিড পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন সব ছেড়ে দিতে। কিন্তু কাজই তাঁকে আবার নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেভিড বুঝতে পারলেন, পৃথিবীটা আগের মতো নেই। তিনি দেখলেন সমুদ্রের স্বচ্ছ পানি প্লাস্টিকে ভরে যাচ্ছে, ডলফিন ও তিমির পেটে প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ব্লু প্ল্যানেট টু’ সিরিজে তিনি প্লাস্টিক–দূষণের ভয়াবহতা যেভাবে তুলে ধরলেন, তা পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একটি মা তিমি তার মৃত ছানাকে মুখে নিয়ে সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে—এই দৃশ্য দেখে মানুষের খারাপ লেগেছে।

এই একটি ডকুমেন্টারির প্রভাবে ইংল্যান্ডসহ অনেক দেশে প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে আইন করা হয়। মানুষ একে বলে ‘অ্যাটেনবরো এফেক্ট’। তিনি শুধু প্রকৃতিকে দেখাননি, তিনি প্রকৃতিকে বাঁচাতে যুদ্ধে নেমেছেন। ২০২৪ সালে তিনি ইনস্টাগ্রামে যোগ দিলেন তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলতে। মাত্র ৪ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে তাঁর ফলোয়ার ১০ লাখ ছাড়িয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছিল! তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তরুণদের ওপর তাঁর কতটা ভরসা।

পাঁচ

আচ্ছা, তুমি কি জানো, স্যার ডেভিডের বয়স যখন ৯৩, তখনো তিনি নিয়মিত শুটিংয়ের জন্য পাহাড়-পর্বতে ঘুরতেন? ১০০ বছর বয়সেও তাঁর মস্তিষ্ক কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত কাজ করে। এর রহস্য কী? বিজ্ঞানীরা বলেন, তাঁর সুস্থতার মূলে রয়েছে তাঁর অফুরন্ত কৌতূহল। তিনি সব সময় শিখতে ভালোবাসেন। তিনি কখনো নিজেকে বৃদ্ধ ভাবেননি।

তবে শুধু ভাবনা দিয়ে তো আর বয়স আটকে রাখা যায় না। তিনি তাঁর খাদ্যাভ্যাসেও খুব সচেতন। বয়স বাড়ার পর তিনি মাংস খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি খান। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তাঁর মানসিক প্রশান্তি। তিনি যখন প্রকৃতির কাছে থাকেন, তখন তাঁর শরীর ও মনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। প্রকৃতিই যেন তাঁকে সঞ্জীবনী সুধা জুগিয়ে আসছে শত বছর ধরে।

আজ এই শততম জন্মদিনে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর কাছে আমাদের ঋণ শোধ করার উপায় নেই। তিনি নাইটহুড পেয়েছেন, কয়েক ডজন পুরস্কার পেয়েছেন, এমনকি কতগুলো প্রাণীর নাম তাঁর নামে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো আমাদের সচেতনতা।

ডেভিড অ্যাটেনবরো বারবার বলেছেন, ‘আমাদের এই গ্রহ কোনো সম্পদ নয় যে একে শুধু ব্যবহার করব। এটি আমাদের ঘর, একে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ তিনি গত ৭০ বছরে নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে বরফ গলে যাচ্ছে, কীভাবে বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তাই তাঁর ১০০তম জন্মদিনে আমাদের প্রতি তাঁর একটিই বার্তা, ‘পৃথিবীটাকে ভালোবাসো, একে বাঁচিয়ে রাখো।’

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো আমাদের শিখিয়েছেন—কীভাবে একটি পিঁপড়ার চলাফেরা থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমির গানের মায়া অনুভব করতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, আমরা প্রকৃতির প্রভু নই, আমরা প্রকৃতির অংশ।

আজকের এই দিনে আমরা যখন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই, তখন আসলে আমরা আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকেও শ্রদ্ধা জানাই। জানো তো, পৃথিবীর একটা নিজস্ব কণ্ঠস্বর আছে। সেই কণ্ঠস্বর কখনো শোনা যায় গভীর আমাজনের জঙ্গলে পাতার মর্মর শব্দে, কখনোবা বিশাল মহাসাগরে গা–ছমছমে অন্ধকারে নীল তিমির গানে। আবার কখনো সেই কণ্ঠস্বর শোনা যায় মেরু অঞ্চলের বরফভাঙা হিমশীতল বাতাসে। কিন্তু তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, মানুষের ভাষায় এই পুরো পৃথিবীর কণ্ঠস্বর আসলে কোনটা? আমি নির্দ্বিধায় একটি নাম বলব—স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো!

সূত্র: বিবিসি ন্যাচারাল হিস্ট্রি, দ্য গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন