৭০ বছর পর কাজাখস্তানের বনে ফিরল হারিয়ে যাওয়া কাস্পিয়ান বাঘ
গত ৩১ জুলাই ‘উমিত’ নামের একটি বাঘকে কাজাখস্তানের বালখাশ হ্রদের তীরের অভয়ারণ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। কাজাখ ভাষায় ‘উমিত’ শব্দের অর্থ আশা। হারিয়ে যাওয়া কাস্পিয়ান বাঘকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা করা হয়। বাঘটি মুক্ত করার মাধ্যমে কাজাখস্তান বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাঘের পুরোনো বিচরণক্ষেত্র আবার ফিরিয়ে আনল। কারণ, সেখানে ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বাঘ ছিল না।
রাশিয়া থেকে আনা এই বুনো স্ত্রী বাঘটির সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বাঘ সেখানে মুক্ত করা হবে। বিজ্ঞানীদের ইচ্ছা হলো সেখানে অন্তত ৫০টি বাঘের একটি স্থায়ী দল তৈরি করা। রাশিয়া থেকে আনা একটি পুরুষ বাঘকেও গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করছেন। বাঘটা বনে একা বেঁচে থাকার উপযুক্ত হলে ওকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া দুটি ছোট বাঘের বাচ্চাকেও আলাদা ঘরে যত্নে রাখা হচ্ছে। যাতে এরা মানুষের কাছে আসার অভ্যাস না শেখে। আগামী বছর এদেরও বনে ছেড়ে দেওয়া হবে। যাতে এরা বুনো প্রাণী, হরিণ ও বুনো গাধা শিকার করে বাঁচতে পারে।
ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ির দরজা খুলে দেওয়ার পর বাঘটি লাফ দিয়ে এক দৌড়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর হারিয়ে যায়। বাঘটিকে মুক্ত করার পর কাজাখস্তানের পরিবেশমন্ত্রী ইয়েরলান নিসানবায়েভ বলেন, ‘আজ আমরা একটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হলাম। বাঘগুলোর খেয়াল রাখা ও সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সামনে অনেক কাজ বাকি। তবে আজ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপটি শেষ হলো।’
কয়েক দশক ধরে পশমের জন্য শিকার, বন জঙ্গল ধ্বংস ও অতিরিক্ত নিধনের কারণে ১৯৭০-এর দশকে কাস্পিয়ান বাঘকে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া হতো। একসময় পূর্ব তুরস্ক থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম চীন, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকায় এদের দেখা মিলত। এরা মূলত বনভূমি ও নদ-নদীর তীরের তুগাই অরণ্যে বাস করত। তুগাই অরণ্য হলো মধ্য এশিয়ার মরুভূমি ও শুষ্ক অঞ্চলের নদীতীরবর্তী প্লাবণভূমির এক বিশেষ ধরনের সবুজ বনভূমি। তবে কৃষিকাজের জন্য সেই জঙ্গলগুলো কেটে ফেলার কারণে এদের থাকার জায়গা নষ্ট হয়ে যায়।
২০০৩ সালে এই বাঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও এর ঠিক ছয় বছর পর বিজ্ঞানীরা এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারেন। বাঘের ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা যায়, কাস্পিয়ান বাঘ ও রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় বাস করা আমুর বাঘের জিনগত গঠন প্রায় একই রকম। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ১৯০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত এই দুই দলের বাঘ একসঙ্গে চলাফেরা করত। পরে শিকারের কারণে এরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। মূলত সাইবেরিয়া থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়া বাঘগুলোই পরবর্তী সময়ে কাস্পিয়ান বাঘ হিসেবে পরিচিত পায়। আর জিনগত সংকেতে আমুর বাঘের সঙ্গে এদের পার্থক্য ছিল মাত্র একটি অক্ষরের।
সাইবেরিয়ান বাঘ বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির রাশিয়া কর্মসূচির প্রধান ডেল মিকুয়েল। তিনি বলেন, আসলে এটি কাস্পিয়ান বাঘেরই ফিরে আসা। শুধু তফাত হলো এবার এরা হেঁটে আসার বদলে উড়ে এসেছে। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি বাঘের উপপ্রজাতিকে এভাবে ফিরিয়ে আনার ভাবনাটি সত্যিই ব্যতিক্রম। এটি কাস্পিয়ান বাঘকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কাছাকাছি একটি উদ্যোগ।
আজকের দিনে কাস্পিয়ান বাঘের পক্ষে আগের মতো পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব। ২০১৭ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, এই বাঘগুলোর বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আছে এমন দুটি জায়গা খুঁজে পাওয়া যায়। যার দুটোই কাজাখস্তানে। এর মধ্যে সবচেয়ে উপযোগী জায়গাটি ছিল ইলি-বালখাশ, যেখানে উমিতকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কাজাখ সরকার ২০১৮ সালে এই এলাকাকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে।
আন্তর্জাতিক সীমানা পার করে বাঘ অন্য দেশে স্থানান্তরের ঘটনা এটাই প্রথম। তবে এর আগে রাশিয়ার সুদূর পূর্ব অঞ্চলে আমুর বাঘের বিচরণক্ষেত্র বাড়াতে সফলভাবে বেশ কয়েকটি বাঘ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রকল্পে সাইবেরিয়াতে শিকারিদের হাতে মা-বাবা হারানো বাঘের বাচ্চাদের উদ্ধার করা হতো। তারপর সেগুলো একটু বড় ও শক্তপোক্ত হলে বনে ছেড়ে দেওয়া হতো। মিকুয়েলের পরিচালনায় চালানো ওই প্রকল্পটি বেশ সফল হয়েছিল। কারণ, লালন-পালনের সময় বাঘের বাচ্চাগুলোকে মানুষের সংস্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হতো।
ছেড়ে দেওয়ার পর বাঘগুলোর বেঁচে থাকার হার ছিল প্রায় শতভাগ। এরা খুব দ্রুত নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। বনে মুক্ত করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি তরুণ বাঘ হিমালয়ান কালো ভালুক শিকার করেছিল। অন্য বাঘগুলোও খুব তাড়াতাড়ি বুনো পরিবেশে নিজের খাবার নিজে জোগাড় করতে শিখে যায়।
তবে পুরো চিত্রটি কিন্তু এক দিক থেকে ভালো নয়। বিগত ১০০ বছরে বাঘেরা বড় রকমের বিপদের মুখোমুখি হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ, যা কমে এখন মাত্র সাড় পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। এশিয়ার অনেক জায়গায় বাঘের সংখ্যা এখনো কমছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও নানাবিধ রোগের নতুন ঝুঁকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাশিয়ায় আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের কারণে বাঘের প্রিয় খাবার বুনো শুয়োর ব্যাপক হারে মারা গেছে। ফলে খাদ্যের অভাবে অনেক বাঘ লোকালয়ে হানা দিতে বাধ্য হয়েছে। তাই ফিরে আসা কাস্পিয়ান বাঘগুলোর টিকে থাকার উপায় এদের জন্য বনে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এক দশক আগের তুলনায় কাজাখস্তানের ইলি-বালখাশ অভয়ারণ্যটি এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দেশটির আলমাটি ও বালখাশ অঞ্চলজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ১৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে এই জলাভূমি বিস্তৃত। একসময় এখানে বড় কোনো পশুপাখির দেখা মিলত না। আর এখানকার ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল ও জলাভূমিও প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিল।
২০২৪ সালের পর থেকে এখানকার দৃশ্য পুরোপুরি অন্য রকম। ৫০ হেক্টরেরও বেশি নতুন ও পুনরুদ্ধার করা বনভূমিতে বুখারা হরিণ ও একধরনের বুনো গাধা কুলানের মতো বিরল প্রাণীরা ঘুরে বেড়ায় ও ঘাস-গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, বাঘ প্রকল্পের ফলাফল কয়েক বছরের মধ্যে দেখা মিলবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন