স্যুটকেস যেভাবে বাঁচাল শিশুর প্রাণ

উদ্ধারকারী আমেরিকান সেনাদের সঙ্গে জোসেফ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে এক ভয়াবহ ঘটনা। এই যুদ্ধে পৃথিবীর লাখ লাখ লোক নিহত হয়েছিল। জার্মানির নাৎসি দলের শাসক হিটলারের পোল্যান্ড দখলের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের শুরু। দীর্ঘ ছয় বছর চলেছিল এই যুদ্ধ।

হিটলার ইহুদিদের ঘৃণা করতেন। ইহুদিদের হত্যা করার জন্য এক বিশেষ বন্দীশালা তৈরি করেছিলেন তিনি। এগুলোকে বলা হতো কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। সেখানে বিভিন্ন ধরনের নাগরিকদের বন্দী করে রাখা হতো, যাদের মধ্যে ইহুদিরা ছিল সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ ইহুদি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিল, যাদের বেশির ভাগই গ্যাস চেম্বার নামে এক বিশেষ কুঠুরিতে মৃত্যুবরণ করে। এই গ্যাস চেম্বারগুলোতে প্রথমে বন্দীদের ঢোকানো হতো, এরপর বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেওয়া হতো।

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যাদের নিয়ে যাওয়া হতো তাদের বেশির ভাগই আর ফিরে আসেনি। কিন্তু তাদের মধ্যে জীবিত ফিরে আসা জোসেফ সিলফস্টাইনের কাহিনি অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা। কারণ, যখন তার বাবা ও মাকে জার্মানদের হয়ে কাজ করার জন্য ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তার বয়স ছিল প্রায় মাত্র দেড় বছর।

আরও পড়ুন

একদিন পোল্যান্ডে অবস্থিত জার্মান নাৎসি ক্যাম্প বুখেনওয়ার্ল্ডের গার্ডরা দেখল, গেটের কাছে একটা স্যুটকেস পড়ে আছে। স্যুটকেসের ভেতর কী আছে, সেটা কেউ জানে না। তাদের সন্দেহ হলো এর ভেতর এমন কিছু আছে, যা খুব বিপজ্জনক। তখন গার্ডদের অনেকে স্যুটকেসের দিকে বন্দুক তাক করে রইল। এর মধ্যে একজন সাহসী গার্ড খুলে ফেলল স্যুটকেসটা।

দেখা গেল স্যুটকেসের ভেতরে একটি শিশু। যার বয়স হবে হয়তো তিন থেকে চার বছর। এই শিশুর নামই জোসেফ সিলফস্টাইন। ইহুদি পরিচয়ের কারণে তাকে যেন মেরে ফেলা না হয়, সে জন্য তার পিতা তাকে একটা স্যুটকেসে ভরে ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আর জোসেফ এই অবস্থায় বুখেনওয়ার্ল্ডের পাহারাদের কাছে ধরা পড়ে যায়। জোসেফের কপালে ছিল নিশ্চিত মৃত্যু।

কিন্তু ছোট্ট এই শিশুটিকে দেখে গার্ডদের হাতের আঙুল যেন নিশ্চল হয়ে যায়, আর প্রাণে বেঁচে যায় জোসেফ। তারা তাকে ক্যাম্পেই রেখে দেয়। তাকে খেতে দেয়, কাপড় পরতে দেয়।

মাঝেমধ্যে জোসেফকে লুকিয়ে থাকতে হতো। কারণ, ক্যাম্পে আসা বড় কোনো নাৎসি কর্মকর্তার চোখে পড়লে নির্ঘাত মৃত্যু।

আরও পড়ুন
জোসেফ এমন এক শিশুর, যে কিনা ইহুদিদের হত্যার জন্য নির্মিত এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে জীবন নিয়ে ফিরেছে

আর এভাবে জন্ম নেয় এমন এক শিশুর গল্প, যে কিনা ইহুদিদের হত্যার জন্য নির্মিত এক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে জীবন নিয়ে ফিরেছে। এমন এক সময় আসে, যখন তার বয়স ছিল চার বছরের একটু বেশি।

১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড দখলের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু জোসেফ সেটা জানত না। কারণ, তখনো জোসেফের জন্ম হয়নি।

জার্মানির হাতে দখল হয়ে যাওয়া পোল্যান্ডে ৭ মার্চ, ১৯৪১ সালে জন্ম নেয় জোসেফ। সান্ডোমিরেজ নামের শহরে। যুদ্ধের মাঝেও এ শহরে বাস করা জোসেফ ও তার মা–বাবা শান্তিতে বাস করছিলেন।

তবে ১৯৪২ সালে ইহুদি এই পরিবারকে সেখানে শেষবারের মতো দেখা যায়। এরপর চেসটোচয়া নামের এক এলাকার হাসাগ নামের ধাতুর কারখানায় কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় জোসেফের পরিবারকে। সে সময় নাৎসি জার্মানির নেতারা ঠিক করেন, যেসব ইহুদি কাজ করতে পারবে না তাদের অসউইজ নামের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যেখানে তাদের শেষ ঠিকানা গ্যাস চেম্বারে মৃত্যু।

আরও পড়ুন

এ কারণে জোসেফের বাবা ঠিক করেন তিনি তাঁর ছেলের জীবন বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা করবেন। তাঁর ছেলের শেষ ঠিকানা অসউইজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হতে যাচ্ছে ভেবে জোসেফকে তিনি এক স্যুটকেসে ভরে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া চেষ্টা করেন। যে চেষ্টার ফল কী হয়েছিল, সেটা আমরা আগেই জানতে পেরেছি।

নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১১ জানুয়ারি ১৯৪৫ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যখন পোল্যান্ডে প্রবেশ করে তখন বুখেনওয়ার্ল্ড ক্যাম্পের ২১ হাজার বন্দীর প্রায় সবাইকে তাঁরা মুক্ত করে দেয়, শুধু একজনকে ছাড়া। সে হচ্ছে জোসেফ। ছোট্ট শিশুটিকে তাঁরা আদর করে নিজেদের কাছে রেখে দেয়।

জোসেফের ঘটনার সঙ্গে একটা বিখ্যাত চলচ্চিত্রের মিল রয়েছে, যার নাম ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’। ইতালির চলচ্চিত্র পরিচালক রবার্তো বেনিনি যেন ঠিক জোসেফের গল্পের মতো করে গুইদো নামের আরেকজন ইহুদি বালকের গল্প তাঁর চলচ্চিত্রে তুলে ধরেন।

‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ মুভির গুইদো তার মাকে খুঁজে পেলেও বাবাকে আর খুঁজে পায়নি; কারণ, গুইদোর পিতা নিজের জীবন দিয়ে ছেলের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।

তবে জোসেফ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সহায়তায় সুইজারল্যান্ডে গিয়ে তার বাবা ইসরায়েলকে খুঁজে পায়। এরপর পিতা ও পুত্র মিলে তার মাকে খুঁজতে থাকে! জার্মানিতে গিয়ে তারা মা ইসথারকে আবিষ্কার করে।

১৯৪৮ সালে জোসেফের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসে। এখন সে সেখানেই শান্তিতে বসবাস করছে।

যুদ্ধের পর জোসেফকে সেই ক্যাম্পের গার্ডদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বলা হয়েছিল। তখন জোসেফ বলেছিল, ‘আমার কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আজকে আমি যদি তাদের ঘৃণা করি, তাহলে আসলে জিতে যাবে তারাই, যারা মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়।’

আরও পড়ুন