যেভাবে সিংহাসনে বসেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট রাজা
আফ্রিকার এক রাজ্যের নাম টোওরো। সেই দেশের রাজাকে বলা হয় ওমুকামা। ১৯৯৫ সালে দেশটির রাজা, মানে ওমুকামা তৃতীয় ওলিমো হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু রাজাকে আর বাঁচানো গেল না।
রাজার মৃত্যুতে রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এল। এখন কী হবে? সিংহাসনে কে বসবেন? কে হবেন রাজা?
এই নিয়ে অনেক আলোচনা হলো। রাজাকে যেদিন কবরে শোয়ানো হলো, তার এক সপ্তাহ পরে সিদ্ধান্ত হলো, রাজা হবেন রাজার ছেলে। সব ঠিক! কিন্তু যিনি নতুন রাজা হবেন তাঁর যে বয়স বড্ড কম! কিন্তু দেশবাসী আর মৃত রাজার মন্ত্রীরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, বয়স কম হলে হবে কী? রাজার ছেলেকে রাজা বানানো হবে।
আর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত যিনি টোওরো রাজ্যের সিংহাসনে বসলেন, তিনি হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট্ট রাজা। তাঁর নাম রুকিডি। যেহেতু এর আগে রাজ্যটিতে তিনজন রুকিডি নামের রাজা রাজত্ব করে গেছেন, তাই তিনি হলেন রাজা চতুর্থ রুকিডি।
১২ সেপ্টেম্বর বেলা ২টার সময় রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে গিনেস বুক অব রেকর্ডে আরেকটি রেকর্ড যুক্ত হলো। বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সে সিংহাসনে বসা রাজা হলেন রুকিডি। যখন তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র তিন বছর।
যদিও টোওরো রাজ্যটি একসময় স্বাধীন একটি অঞ্চল ছিল। পরে ব্রিটিশরা এই অঞ্চলকে নিজেদের শাসনে নিয়ে আসে। আর এখন এটি আফ্রিকার দেশ উগান্ডার অংশ। সেখানকার পশ্চিমে এই অঞ্চল একসময় বান্টু নামে এক রাজ্যের অংশ ছিল। এই দেশের জনগণকে টোওরো বলে ডাকা হয়, আবার কেউ কেউ তাদের ডাকে বাটোওরো নামে। এই জাতির ভাষার নাম রুটোওরো। ব্রিটিশরা দেশটিকে নিজেদের উপনিবেশ করে নিলেও তারা কিন্তু রাজাকে সিংহাসনে রেখে দিয়েছিল।
এই টোওরো রাজ্যটির প্রথম রাজা ছিলেন প্রথম কাবোয়ো ওলিমি। সেই থেকে তাঁর বংশধরেরা এই অঞ্চলকে শাসন করে আসছেন। এই রাজ্যের এবং পৃথিবীর সবচেয়ে কম বয়স্ক রাজা রুকিডি হচ্ছেন এই বংশের ১৩তম শাসক।
যদিও রাজা হিসেবে তাঁকে চতুর্থ রুকিডি নামে ডাকা হতো। কিন্তু তাঁর পুরো নাম ছিল বেশ বড়। রকিবাবাসাইজা ওমুকামা ওয়ো নিয়াম্বা কাবাম্বা ইগিরু রুকিডি। তবে তিনি রাজা ওয়ো নামে পরিচিত ছিলেন।
রাজ্যটি ছোট, তবু রাজার সিংহাসনে বাসার যে আয়োজন, সেটি ছিল বিশাল। বেশ কিছু নিয়ম আর প্রথা মেনে তাঁকে সিংহাসনে বসতে হয়েছিল। যার মধ্যে প্রথম কাজটি ছিল এক মিছেমিছি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া। এই যুদ্ধে এক বিদ্রোহী রাজপুত্র, রাজার সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করবে আর তিনি ও তাঁর সেনাদল সেই সেনাবাহিনীকে পরাজিত করবেন। যাতে প্রমাণিত হয় তিনি সত্যি তাঁর সেনাদের নিয়ে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
এরপর রাজাকে অনুমতি দেওয়া হয় এই রাজ্যের এক পবিত্র ঢোল বা ড্রাম বাজানোর। ১২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার সময় রাজাকে রাজমুকুট পরানো হয়। সেই সময় তিনি তাঁর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন, যার নাম হা কায়রো নয়ামুনকা। প্রাসাদে প্রবেশ করে তিনি তাঁর জন্য রাখা সিংহাসনে বসেন। আর এ সময় তাঁকে জোয়ারের তৈরি এক খাবার খেতে দেওয়া হয়। রাজার জন্য যেটা বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল। আর এভাবে রাজপ্রাসাদে অভিষেক ঘটেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট রাজা ওয়োর।
ছোট এই রাজাকে কিন্তু সিংহাসনে বসে রাজ্য চালাতে হয়নি। কারণ, এই অঞ্চলটি এখন উগান্ডার অধীন। আর রাজার কাজ শাসন করা নয়, নিজ জাতির নাগরিকদের ভালো–মন্দের খোঁজ নেওয়ার মধ্যে সীমিত হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও তিন বছর থেকে তাঁর অঞ্চল শাসন করা রাজাকে বুদ্ধি দিতেন তাঁর মা ও পরামর্শদাতারা।
রাজা হলেও পরামর্শদাতারা কিন্তু স্কুলে যেতে হয়েছিল। ছোট্ট বেলায় রাজাকে প্রথম লন্ডনে পাঠানো হয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ার জন্য। সে সময় স্কুলে গেলে তাঁকে সব সময় একদল প্রহরী পাহারা দিয়ে রাখত। যদিও শিশুরাজা সেটা পছন্দ করতেন না। তিনি পছন্দ করতেন বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে ও সময় কাটাতে।
সেখানে দুবছর কাটানোর পর রাজা আবার উগান্ডায় ফিরে আসেন। আর সেখানে তিনি আগা খান স্কুলে ভর্তি হন। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা থেকে পড়ালেখা শেষ করে তিনি আবার লন্ডনে গিয়ে হাজির হন, এবার ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৩ সালে তিনি ব্রিটেনের উইনচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজা কিন্তু খেলতে, অঙ্ক করতে, গান গাইতে ও সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন। তিনি শুধু ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন না, সেই সঙ্গে ফুটবল খেলা দেখতেও ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন লন্ডনের বিখ্যাত ক্লাব আর্সেনালের ফ্যান।
খুব অল্প বয়সে রাজা হওয়া রুকিডি কিন্তু বেশি দিন বাঁচেননি। ২৭ আগস্ট ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৪ বছর।
যদিও রুকিডি ক্ষমতাধর কোনো রাজা ছিলেন না, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রাজা হলেও তাঁকে মান্য করতেন তাঁর অঞ্চলের নাগরিকেরা। টোওরো অঞ্চলটি স্বাধীন না হলেও এই অঞ্চলের জনগণের কাছে তিনি ছিলেন সত্যিকারের রাজা।