চোরাকারবারিরা কেন এখন আফ্রিকা থেকে পিঁপড়া পাচারের চেষ্টা করছেন
কেনিয়ার একটি আদালত গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) একজন চীনা নাগরিককে ১০ লাখ শিলিং, যা প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার জরিমানা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁকে ১২ মাসের জেল দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কেনিয়া থেকে জ্যান্ত পিঁপড়া বিদেশে পাচার করার চেষ্টা করছিলেন। কেনিয়ার আইন অনুযায়ী, বন্য প্রাণী বা পোকামাকড় অবৈধভাবে দেশের বাইরে নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
কেনিয়ার আদালত এই মামলার রায়ে জানিয়েছেন, দেশটিতে ইদানীং পিঁপড়া পাচারের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। তাই এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। গত মাসে নাইরোবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঝাং কেকুন নামের সেই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর লাগেজে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০টির বেশি জ্যান্ত পিঁপড়া পাওয়া যায়। মূলত চীনের বাজারে এই পিঁপড়াগুলোর অনেক চাহিদা রয়েছে। সেখানে অনেকে শখের বশে পিঁপড়ার কলোনি বানিয়ে লালনপালন করেন। একে বলা হয় ফর্মিকারিয়াম।
সহজ কথায়, ফর্মিকারিয়াম হলো পিঁপড়াদের জন্য বানানো একটি বিশেষ কাচের ঘর। আমরা যেমন মাছ পালার জন্য অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবহার করি, ঠিক তেমনি পিঁপড়া পালার জন্য এই স্বচ্ছ পাত্র ব্যবহার করা হয়। একে অনেকে অ্যান্ট ফার্ম বলেন।
এর সুবিধা হলো বাইরে থেকে পিঁপড়াদের সব কাজকর্ম পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। পিঁপড়ারা কীভাবে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ তৈরি করে, কীভাবে খাবার জমা করে কিংবা রানী পিঁপড়া কীভাবে সবার দেখাশোনা করে, এসব এই কাচের ঘরের ভেতর দিয়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায়। শৌখিন মানুষেরা পিঁপড়াদের বিচিত্র জীবন আর এদের দলগত শৃঙ্খলা দেখার জন্যই এই কৃত্রিম বাসা তৈরি করেন। আর এই শখ মেটাতেই অনেকে প্রচুর টাকা খরচ করে পিঁপড়া কেনেন।
কেনিয়ার বন্য প্রাণী রক্ষাকারী বাহিনীর (কেডব্লিউএস) কাছে চোরাশিকারিদের ধরা একটি নিয়মিত ঘটনা। সাধারণত তারা হাতি বা গন্ডারের মতো বড় প্রাণীদের রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে তারা এক অদ্ভুত অভিযানের মুখোমুখি হয়। পশ্চিম কেনিয়ার একটি গেস্টহাউসে অভিযান চালিয়ে তারা এমন কিছু চোরাচালান করা প্রাণী উদ্ধার করে, যা আকারে কনিষ্ঠ আঙুলের নখের চেয়েও ছোট।
সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি জ্যান্ত পিঁপড়া পাওয়া যায়, যেগুলোকে ছোট ছোট টেস্টটিউব আর সিরিঞ্জের ভেতর তুলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। বেলজিয়াম থেকে আসা ১৯ বছর বয়সী দুই কিশোর লর্নয় ডেভিড ও সেপ্পে লোডেভিকক্স এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাঁরা এই পিঁপড়াগুলো ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে পোষা প্রাণী হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ধরা পড়ার পর তাঁরা অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা ইচ্ছা করে কোনো আইন ভাঙতে চাননি। স্রেফ বোকামি করে এটি করেছেন।
কেনিয়ায় ইদানীং এ ধরনের ছোট ছোট পতঙ্গ পাচারের হার অনেক বেড়ে গেছে। কেডব্লিউএস জানায়, পাচারকারী ব্যক্তিরা এখন বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর বদলে পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ছোট প্রজাতির দিকে নজর দিচ্ছে। আসলে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে পিঁপড়া পালনের শখ অনেক জনপ্রিয় হয়েছে। উদ্ধার করা পিঁপড়াগুলোর মধ্যে ছিল ‘মেসর সেফালোটেস’ পিঁপড়া, যা জায়েন্ট আফ্রিকান হারভেস্টার অ্যান্ট নামে পরিচিত। সংগ্রাহকদের কাছে এগুলো স্বপ্নের প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। একেকটি কলোনি প্রায় ৯৯ পাউন্ড অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
অনেকে মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে কাচের ভেতরে পিঁপড়াদের সুশৃঙ্খল জীবন দেখাটা মনের জন্য খুব স্বস্তিদায়ক। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই পিঁপড়া পাচার নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, কোনো পিঁপড়াকে এর নিজের এলাকা থেকে সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে গেলে সেটি সেখানকার পরিবেশের জন্য আগ্রাসী বা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
কেনিয়ার বিখ্যাত বিজ্ঞানী ডিনো মার্টিনস জানান, এই জায়েন্ট আফ্রিকান হারভেস্টার অ্যান্টরা সাভানা অঞ্চলের পরিবেশের জন্য খুবই দরকারি। এরা ঘাসের বীজ সংগ্রহ করে মাটির নিচে জমা রাখে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক বীজ মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা থেকে নতুন ঘাস জন্মায়। এভাবে এরা তৃণভূমি সবুজ রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া প্যাঙ্গোলিন বা আর্ডভার্কের মতো অনেক প্রাণীর প্রধান খাবার হলো এই পিঁপড়া। তাই পিঁপড়া পাচার করলে কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট হয় না, বরং অন্যান্য প্রাণীরাও খাদ্যাভাবে পড়তে পারে।