হোটেলের বিছানার চাদর সাদা এবং শক্ত করে গোঁজা থাকে কেন
দীর্ঘ ভ্রমণের পর ক্লান্ত শরীরে হোটেলে ঢুকেই আমাদের প্রথম যে জিনিসটার দিকে চোখ যায়, তা হলো পরিপাটি একটি বিছানা। মনে হয়, এক লাফে বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিন্তু শুতে গেলেই বাধে বিপত্তি! চাদরগুলো তোশকের নিচে এমন শক্ত করে গোঁজা থাকে যে পা গলানোর মতো একটু জায়গাও সহজে পাওয়া যায় না। টানাটানি করে তবেই সেই চাদরের নিচে ঢুকতে হয়।
অনেকের কাছে এই শক্ত করে পাতা বিছানা বেশ আরামদায়ক মনে হতে পারে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে এই আঁটসাঁট চাদর যেন একধরনের প্রশান্তি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হোটেলের বিছানার চাদর এমন শক্ত করে কেন গুঁজে রাখা হয়? এটি কি শুধুই বিছানাকে সুন্দর দেখানোর জন্য, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হবে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হোটেলে
শুনতে অবাক লাগলেও হোটেলের এই আঁটসাঁট বিছানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্র ও চিকিৎসার ইতিহাস! ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামটা নিশ্চয়ই শুনেছ। আধুনিক নার্সিংয়ের এই অগ্রদূতের কাছেই হোটেলের এই পরিপাটি বিছানার জন্য আমাদের পরোক্ষভাবে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
এরপর চিকিৎসাব্যবস্থায় নার্সিংয়ের ধারণা বদলাতে শুরু করে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮৫০-এর দশকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের সেবায় এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের আঘাতের চেয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জীবাণুর সংক্রমণে বেশি সৈন্য মারা যেত। সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল মুইরের মতে, ১৮৯৮ সালের স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধেও যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাওয়া একজন সৈন্যের বিপরীতে শুধু রোগে ভুগে মারা যেত পাঁচজন সৈন্য!
এরপর চিকিৎসাব্যবস্থায় নার্সিংয়ের ধারণা বদলাতে শুরু করে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮৫০-এর দশকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের সেবায় এক নতুন বিপ্লব নিয়ে আসেন। তিনি পরিষ্কার বাতাস ও পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেন। আর এই পরিচ্ছন্নতার অন্যতম বড় অংশ ছিল নিখুঁতভাবে বিছানা পাতা। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের কোনো এক সময়ে টানটান করে এই চাদর গোঁজার পদ্ধতির জন্ম হয়। এর নাম দেওয়া হয়েছিল হসপিটাল কর্নার।
পরিচ্ছন্নতাই যেখানে জীবন-মরণ
হাসপাতালে রোগীদের দ্রুত সুস্থ করার জন্য পরিচ্ছন্ন বিছানা খুব জরুরি। বিছানা ঠিকমতো পাতা না হলে বা চাদরে ভাঁজ থাকলে রোগীদের গায়ে ক্ষত তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষত থেকেই মারাত্মক ইনফেকশন হওয়ার ভয় থাকে। এ ছাড়া চাদরে ভাঁজ বা কুঁচকানো অংশ থাকলে সেখানে খাবারের গুঁড়ো বা ময়লা আটকে জীবাণু ছড়াতে পারে। তাই চাদরকে একদম টানটান করে বিছানোর এই পদ্ধতি নার্সদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৫০-এর দশকে ফিটেড শিট আবিষ্কৃত হলেও হোটেলগুলো এটি ব্যবহার করে না। এর প্রধান কারণ চাদর ধোয়ার চক্র।
হাসপাতাল থেকে হোটেলে যেভাবে এল
১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের সময়কালকে আতিথেয়তা শিল্পের সুবর্ণ যুগ বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের যাতায়াত অনেক বেড়ে যায়। হোটেলের মালিকেরা চাইতেন তাঁদের প্রতিটি হোটেলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার একটি নির্দিষ্ট ও নিখুঁত মান থাকুক, যেখানে অতিথিই হবেন সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। ওই সময়েই উন্নত ডিটারজেন্ট ও বড় বড় লন্ড্রি মেশিনের সাহায্যে চাদর পরিষ্কার করার পাশাপাশি হসপিটাল কর্নার পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়।
বিছানা পাতার ক্ষেত্রে পরের বড় বিপ্লবটি ঘটে ১৯৯৯ সালে। ওয়েস্টিন হোটেল তাদের বিখ্যাত হেভেনলি বেড বা স্বর্গের মতো বিছানা চালু করে, যেখানে সবকিছু ছিল ধবধবে সাদা। এখনকার প্রায় সব বড় হোটেলে যে দৃশ্যত পরিষ্কার সাদা রঙের বিছানা দেখা যায়, তা মূলত এই দ্বিতীয় বিপ্লবেরই ফল।
ইলাস্টিক দেওয়া চাদর কেন ব্যবহার করা হয় না
এত কষ্ট করে চাদর গোঁজার কী দরকার? আজকাল তো চারদিকে ইলাস্টিক দেওয়া ফিটেড শিট পাওয়াই যায়। সেগুলো ব্যবহার করলে তো সহজেই তোশকের চারকোনা আটকে থাকত!
চাইলে তুমি নিজের ঘরের বিছানায় হোটেলের মতো এই টানটান হসপিটাল কর্নার তৈরি করতে পারো। পদ্ধতিটা বেশ সহজ।
১৯৫০-এর দশকে ফিটেড শিট আবিষ্কৃত হলেও হোটেলগুলো এটি ব্যবহার করে না। এর প্রধান কারণ চাদর ধোয়ার চক্র। আমরা বাড়িতে সাধারণত সপ্তাহে একবার চাদর ধুই। কিন্তু হোটেলে প্রতিদিন, কিংবা অন্তত দুই-তিন দিন পরপরই চাদর ধুতে হয়। গরম পানি ও কড়া ডিটারজেন্ট দিয়ে এত ঘন ঘন ধোয়ার ফলে ফিটেড শিটের ইলাস্টিক খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
আরেকটা বড় কারণ হলো ভাঁজ করা। ইলাস্টিক দেওয়া চাদর সুন্দর করে ভাঁজ করা রীতিমতো একটা যুদ্ধ! হোটেলের মতো জায়গায় প্রতিদিন হাজার হাজার চাদর ধুয়ে ইস্ত্রি করে পরিপাটি করে রাখা ফিটেড শিটের ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। সাধারণ সমান চাদর ভাঁজ করা ও সংরক্ষণ করা অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। তাই ফিটেড শিটের ঝামেলায় না গিয়ে হোটেলগুলো সাধারণ চাদর দিয়েই হসপিটাল কর্নার তৈরি করে।
কীভাবে করে এই জাদুকরি ভাঁজ
চাইলে তুমি নিজের ঘরের বিছানায় হোটেলের মতো এই টানটান হসপিটাল কর্নার তৈরি করতে পারো। পদ্ধতিটা বেশ সহজ। প্রথমে বিছানার ওপর চাদরটি সমান করে বিছিয়ে তোশকের পায়ের দিকের অংশটুকু নিচে শক্ত করে গুঁজে দিতে হবে। এবার চাদরের যে অংশগুলো তোশকের দুই পাশে ঝুলে আছে, তার যেকোনো এক পাশ ধরে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ভাঁজ করে বিছানার ওপর তুলে রাখো। এরপর নিচে ঝুলে থাকা বাকি অতিরিক্ত অংশটুকু তোশকের নিচে শক্ত করে গুঁজে দাও। সবশেষে বিছানার ওপর তুলে রাখা ৪৫ ডিগ্রি কোণের ভাঁজটি নিচে নামিয়ে সোজা তোশকের নিচে গুঁজে দিলেই কেচ্ছা খতম।
একটি সাধারণ বিছানার চাদরের ভাঁজের মধ্যে যে যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাস ও পরিচ্ছন্নতার বিজ্ঞান লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কে ভেবেছিল!