দিনে কতবার ফোন চার্জে দেওয়া উচিত
প্রতিদিনের মতো একদিন সকালে অ্যালার্মের শব্দে তোমার ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠেই দেখলে, বিছানার পাশে ফোন নেই। ফোন খুঁজতে গিয়ে দেখলে, সেটি চার্জে লাগানো। তখন মনে পড়ল, রাতে ঘুমানোর আগে ফোন চার্জে দিয়েছিলে, কিন্তু খুলতে ভুলে গেছ। মানে সারা রাত ফোনটি চার্জে ছিল।
বিষয়টাকে খুব একটা পাত্তা দিলে না। চার্জার খুলে ফোনটি সঙ্গে নিয়ে চলে গেলে। কিন্তু এমন ঘটনা টানা এক সপ্তাহ ঘটার পর হঠাৎ লক্ষ করলে, ফোনটি একটু ফুলে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, চার্জ দিলেও আগের মতো বেশিক্ষণ চার্জ থাকছে না।
সমস্যার কারণ জানতে গেলে হয়ত জানা যাবে, ব্যাটারির ক্ষতি হয়েছে। পরামর্শ পাবে, ফোন চার্জে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটু সচেতন হতে হবে। কিন্তু তখন তোমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল, দিনে আসলে কয়বার ফোন চার্জে দেওয়া উচিত? আর ফোন কি সারা রাত চার্জে রাখা যায়?
চলো, জেনে নেওয়া যাক ফোনের ব্যাটারি ভালো রাখার কিছু সহজ নিয়ম।
স্মার্টফোন এখন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ফোন যতই স্মার্ট হোক, এর ব্যাটারি সীমাহীন নয়। বেশির ভাগ স্মার্টফোনে ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। এই ব্যাটারির যত্ন ঠিকভাবে নিলে এর কার্যক্ষমতা অনেক দিন ভালো রাখা যায়।
ফোন দিনে কতবার চার্জ দেওয়া নিরাপদ?
ফোন দিনে ঠিক কতবার চার্জে দিচ্ছ, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং কখন এবং কীভাবে চার্জ দিচ্ছ, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ ব্যবহারে দিনে এক বা দুবার ফোন চার্জে দেওয়াই যথেষ্ট হতে পারে। তবে কারও ফোন বেশি ব্যবহার করলে এর চেয়ে বেশিবারও চার্জে দিতে হতে পারে। এতে সমস্যা নেই। বরং ব্যাটারি একেবারে শূন্যে নামিয়ে তারপর একবারে পুরো চার্জ করার চেয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে চার্জ দেওয়া ভালো।
অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যাটারির চার্জ মোটামুটি ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেন। তবে এটাকে কঠোর নিয়ম ভাবার দরকার নেই। কখনো ১০০ শতাংশ চার্জ করতেই হলে ব্যাটারির ক্ষতি হয়ে যাবে এমন নয়।
ব্যাটারির জন্য ২০–৮০ নিয়ম
২০–৮০ নিয়মের কথা হয়তো অনেকবার শুনেছ। এর মানে, ব্যাটারির চার্জ খুব বেশি কমে যাওয়ার আগেই ফোন চার্জে দেওয়া এবং সম্ভব হলে সব সময় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ না করা।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পুরোপুরি খালি বা একেবারে পূর্ণ অবস্থায় দীর্ঘ সময় থাকলে তুলনামূলক বেশি চাপের মধ্যে থাকে। তাই প্রতিদিনের ব্যবহারে ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে চার্জ রাখলে ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা সুবিধা হতে পারে।
তবে তোমাকে সব সময় ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে ৮০ শতাংশ হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে না। ফোনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাটারির আয়ু বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের অপ্টিমাইজড চার্জিং সুবিধা দিয়ে থাকে। তাই ফোনের সেটিংসে এমন কোনো সুবিধা থাকলে সেটি চালু করে রাখতে পারো।
সারা রাত চার্জে রাখা যাবে?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আধুনিক স্মার্টফোন ১০০ শতাংশ চার্জ হয়ে গেলে আগের মতো একটানা বিদ্যুৎ নিতে থাকে না। ফোনের চার্জিং ব্যবস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে।
তাই এক রাত ফোন চার্জে রেখে দিলে ব্যাটারি সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাবে, এমন নয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ফোনকে ১০০ শতাংশ চার্জে রাখা এবং একই সঙ্গে ফোন গরম হয়ে যাওয়া ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
বিশেষ করে ফোন যদি চার্জ দেওয়ার সময় অতিরিক্ত গরম হয়, তাহলে ব্যাটারির ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ঘুমানোর ঠিক আগে ফোন চার্জে লাগিয়ে সারা রাত রেখে দেওয়ার অভ্যাস না করাই ভালো। ফোনে ‘অপ্টিমাইজড চার্জিং’ বা এ ধরনের সুবিধা থাকলে সেটিও ব্যবহার করা যেতে পারে।
আর ফোনের ব্যাটারি ফুলে উঠলে বিষয়টি একদমই অবহেলা করা যাবে না। এমন ব্যাটারি ব্যবহার বা চার্জ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তখন দ্রুত অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে যোগাযোগ করা উচিত।
ব্যাটারি ভালো রাখবে যেসব অভ্যাস
ফোনের ব্যাটারি ভালো রাখতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা যায়। প্রথমত, ফোনের সঙ্গে দেওয়া বা ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ভালো মানের চার্জার ব্যবহার করো। নিম্নমানের চার্জার বা তার ব্যবহার না করাই ভালো। চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হচ্ছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখো। চার্জ দেওয়ার সময় দীর্ঘক্ষণ গেম খেলা বা অন্য কোনো ভারী কাজ করলে ফোন বেশি গরম হতে পারে। তাই সম্ভব হলে চার্জ দেওয়ার সময় এসব কাজ এড়িয়ে চলা ভালো।
ফোনের কভার যদি খুব মোটা হয় এবং চার্জ দেওয়ার সময় ফোন বেশি গরম হয়ে যায়, তাহলে কভারটি খুলে রাখতে পারো। একই সঙ্গে ফোনকে সরাসরি রোদ বা অতিরিক্ত গরম জায়গা থেকে দূরে রাখো।
যেখানে-সেখানে ফোন চার্জে দেওয়া ঠিক নয়
ফোনের ব্যাটারি নিয়ে সচেতন হলেও আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। ফোন কোথায় চার্জ দিচ্ছি?
বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, হোটেল, ভাড়ার গাড়ি, শপিং মল বা ক্যাফের মতো জায়গায় অনেক সময় পাবলিক ইউএসবি চার্জিং পোর্ট থাকে। জরুরি সময়ে এগুলো বেশ কাজে লাগতে পারে। তবে নিরাপত্তার দিক থেকে এগুলো ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকা ভালো।
কারণ, ইউএসবি সংযোগ শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নয়, তথ্য আদান-প্রদানের কাজেও ব্যবহার করা যায়। তাই অপরিচিত কোনো ইউএসবি পোর্টে ফোন সংযুক্ত করলে তথ্য চুরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের আক্রমণকে ‘জুস জ্যাকিং’ বলা হয়।
তবে পাবলিক ইউএসবি পোর্ট ব্যবহার করলেই যে তোমার ফোনের সব তথ্য চুরি হয়ে যাবে, এমন নয়। ঝুঁকি এড়াতে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো নিজের চার্জার ও অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করা। সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক রাখাও কাজে আসতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে ইউএসবি ডেটা ব্লকার ব্যবহার করাও একটি উপায়।
স্মার্টফোন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। তাই ফোনের ব্যাটারির যত্ন নেওয়ার জন্য খুব কঠিন কোনো নিয়ম মানতে হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী চার্জ দাও, ফোনকে অতিরিক্ত গরম হতে দিয়ো না, ভালো মানের চার্জার ব্যবহার করো এবং ব্যাটারি ফুলে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নাও। এতটুকু সচেতনতাই তোমার ফোনের ব্যাটারিকে দীর্ঘদিন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।