পশুরা কি মানুষের ভাষা বুঝতে পারে
অনেককেই দেখা যায় পোষা প্রাণীদের সঙ্গে অনর্গল কথা বলছে। আদুরে গলায় কোনো কাজ করতে বলছেন কিংবা কোনো ভুল করলে হালকা ধমকও দিচ্ছে। গ্রামে গেলে আবার এমন দৃশ্যও মেলে, যেখানে গৃহস্থ তাঁর পোষা গরুকে এমনভাবে নির্দেশ দিচ্ছে যেন ও মানুষের সব কথাই বোঝে। কিন্তু সত্যি কি অন্য প্রাণীদের পক্ষে মানুষের ভাষা বোঝা সম্ভব, নাকি পুরোটাই আমাদের ভুল ধারণা?
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মানির ‘ক্লেভার হ্যান্স’ নামের একটি ঘোড়া সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। ঘোড়াটির মালিক দাবি করেছিলেন, হ্যান্স মানুষের কথা বোঝে। ঘড়ির সময় বলতে পারে ও কঠিন অঙ্কের হিসাবও করতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীদের একটি দল পরীক্ষা করে আসল ঘটনা জানতে পারেন। তাঁরা দেখেন, ঘোড়াটি আসলে অঙ্ক বা ভাষা কিছুই বুঝত না। হিসাব করার সময় মালিকের মুখের হাবভাব আর শরীরের নড়াচড়া দেখেই ও বুদ্ধি করে সঠিক উত্তরটি বের করে নিত।
হ্যান্সের এই ঘটনা বুঝিয়ে দেয় যে প্রাণীরা কতটুকু মানুষের ভাষা বোঝে, তা পরীক্ষা করা মোটেও সহজ নয়। তবে গবেষকেরা আজও প্রাণীদের আসল বুদ্ধিমত্তা জানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ডলফিন, পাখি ও বানরদের ভাষা শেখার ওপর প্রচুর পরীক্ষা চালানো হয়। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী তা বিশ্বাস করতে চাননি। তাঁদের ধারণা ছিল, প্রাণীরা মানুষের কথা না বুঝে কেবল ‘ক্লেভার হ্যান্স’ ঘোড়াটির মতো প্রশিক্ষকের অঙ্গভঙ্গি দেখে নকল করছে। এরা গলার স্বর বা ইশারা সহজে বুঝলেও শব্দের গভীর অর্থ বোঝে কি না, তা নিয়ে খটকা রয়ে গিয়েছিল।
তবে এখনকার গবেষকেরা ভিন্ন তথ্য পাচ্ছেন। সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে কিছু প্রাণী সত্যিই মানুষের কিছু নির্দিষ্ট শব্দ ও তার অর্থ বুঝতে পারে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন টাউনসেন্ড বিষয়টা কাজ করেছেন।
প্রাইমেটরা কি সত্যিই মানুষের ভাষা শিখতে পারে
প্রাণীদের ভাষা শেখার সবচেয়ে পরিচিত পরীক্ষাটি করা হয়েছিল ‘কোকো’ নামের একটি গরিলাকে নিয়ে। ও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বা ইশারার ভাষা শিখেছিল। কোকো প্রায় ১ হাজারটি ইশারা করতে পারত এবং ২ হাজারের বেশি ইংরেজি শব্দের জবাব দিতে পারত। তবে গবেষকদের মতে, কিছু ইশারা শেখা আর পুরো ভাষা আয়ত্ত করার মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে। কোকো অনেক সময় অর্থহীন ইশারা করত, আর তার প্রশিক্ষকেরা নিজেদের মতো এর অর্থ ধরে নিতেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ‘কানজি’ নামের একটি বোনোবো বানর। কানজি বিশেষ একটি কিবোর্ড বা ‘লেক্সিগ্রাম বোর্ড’ ব্যবহার করত। যাতে প্রায় ২০০টি প্রতীক আঁকা ছিল। ওরা প্রতীক স্পর্শ করে বস্তুর নাম, জায়গা ও কাজের কথা বোঝাতে পারত। কানজিরা বস্তুর প্রতীক বুঝতে পারত এবং ইশারা ও গলার আওয়াজে হ্যাঁ বা না প্রকাশ করত।
তবে মানুষের ভাষায় শুধু প্রতীক থাকে না, ব্যাকরণ মেনে প্রতীকগুলো সাজিয়ে জটিল বাক্য তৈরি করতে হয়। কানজিরা ভালো প্রতীক সাজাতে পারলেও ওরা সত্যি ব্যাকরণ বুঝত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অবশ্য কানজিরা ইংরেজি শুনে বেশ ভালো বুঝত। একটি পরীক্ষায় একেবারেই নতুন কোনো বাক্য শুনে কাজ করার ক্ষেত্রে কানজিরা একটি আড়াই বছরের শিশুর চেয়েও বেশি সফলতা দেখিয়েছিল।
কুকুর কি সত্যিই মানুষের কথা বুঝতে পারে
অন্যান্য প্রাণীদের মানুষের ভাষা বোঝার প্রয়োজন না থাকলেও কুকুরের গল্পটা আলাদা। প্রায় ১৪ হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে বাস করার ফলে এরা মালিকের কথা ও গলার স্বর বুঝতে গভীরভাবে সংবেদনশীল। মাত্র আট সপ্তাহ বয়স থেকেই কুকুর মানুষের স্বর ও অঙ্গভঙ্গিতে সাড়া দিতে শুরু করে। এমনকি শব্দ বিকৃত হলেও এরা তা বুঝতে পারে।
কিছু কুকুর অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। যেমন ‘চেজার’ নামের একটি বর্ডার কলি জাতের কুকুর ১ হাজারেরও বেশি শব্দ শিখেছিল। সান ডিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেদেরিকো রোসানো বাটন বোর্ড (বোতাম চাপলে নির্দিষ্ট শব্দ বাজায়) ব্যবহার করে কুকুরের ভাষা বোঝার ক্ষমতা পরীক্ষা করছেন। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আশপাশের কোনো ইঙ্গিত ছাড়াও কুকুর কেবল বোতামের শব্দের ধ্বনি শুনেই সঠিক আচরণ করে। বাইরে শব্দটি শুনলে দরজার দিকে দৌড়ে যায়। তবে কুকুরদের এই বোঝার ক্ষমতারও সীমা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন বিষয়টা বুঝতে গবেষণা করছেন।