সমুদ্রের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী কোনটি
পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে রয়েছে সাগর। এই বিশাল সাগরের গভীরে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত সব প্রাণী। এরা কল্পনা থেকেও অদ্ভুত। চেনা মাছ বা ঝিনুকের বাইরেও গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে এমন কিছু জীব বাস করে, যাদের দেখলে মনে হতে পারে এরা অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। আলো ছাড়া ও পানির প্রচণ্ড চাপের মধ্যে টিকে থাকতে এদের শরীরে তৈরি হয়েছে নানা অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। তাহলে সমুদ্রে খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী আসলে কোনটি? চলো সমুদ্রবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে সেই উত্তর জেনে নেওয়া যাক।
প্রবালপ্রাচীরের অদ্ভুত সব প্রাণী
প্রবালপ্রাচীরে হাজার হাজার প্রজাতি বাস করে, যার মধ্যে কিছু প্রাণী ভীষণ অদ্ভুত। প্রবাল নিজেই এক অবাক করা সৃষ্টি। এরা মূলত ‘কোরাল পলিপ’ নামের ছোট ছোট প্রাণীর তৈরি। এরা সমুদ্রের পানি থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিয়ে নিজেদের থাকার জন্য পাথর, গাছের ডাল কিংবা ব্রেনের মতো শক্ত কাঠামো বানিয়ে ফেলে। তবে ‘জুক্সানথেলা’ নামের এক বিশেষ শৈবালের সাহায্য ছাড়া এরা বেঁচে থাকতে পারে না। এই শৈবাল প্রবালের ভেতর থেকে সূর্যের আলো ব্যবহার করে এদের খাবার জোগায়।
কম আলো পৌঁছায় এমন গভীর প্রবাল প্রাচীরে দেখা মেলে ‘রোজ-ভেইল্ড ফেয়ারি র্যাস’ নামের এক রঙিন মাছের। এদের গায়ে গোলাপি, কমলা, বেগুনি আর নীল রঙের চমৎকার শেড থাকে। প্রবালের শক্ত খাঁজের ভেতরে লুকিয়ে থাকার সুযোগ থাকায় উজ্জ্বল রঙের হলেও শিকারি প্রাণীরা এদের সহজে ধরতে পারে না।
একই জায়গায় বাস করে ‘বুলেটহেড প্যারটফিশ’, যাদের দাঁত পৃথিবীর অন্যতম শক্ত। শক্ত প্রবাল চিবিয়ে ভেতরের সুস্বাদু পলিপ খাওয়ার জন্য এদের এই দাঁত বেশ কাজে দেয়। তবে এদের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো শোয়ার পদ্ধতি। ক্ষতিকর পোকামাকড় বা পরজীবীদের হাত থেকে বাঁচতে এরা রাতে নিজেদের শরীর থেকে একধরনের থকথকে জেলির মতো আস্তরণ তৈরি করে। আর তার ভেতরে ঢুকেই নিশ্চিন্তে ঘুমায়।
অবাক করা আরেকটি প্রাণী হলো ‘স্যাকোগ্লোসান’ সামুদ্রিক স্লাগ। এরা শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে এবং শৈবালের রোদ থেকে শক্তি বানানোর অংশটুকু নিজের শরীরে জমা রাখে। ফলে এরা গাছপালার মতো সরাসরি সূর্যের আলো থেকেই শক্তি তৈরি করতে পারে।
গভীর সাগরের ভুতুড়ে বাসিন্দারা
মহাসাগরের গভীর পানির আলোহীন অন্ধকারে চমৎকার ও অদ্ভুত সব জীবের বাস। আলো না থাকা সেই গভীর পানিতে টিকে থাকতে প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে নানা অবিশ্বাস্য কৌশল তৈরি করে নিয়েছে।
প্রথমেই আসে সাইফোনোফোরের কথা। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী স্টিভেন হ্যাডক জানান, দেখতে এদের একটা মাত্র প্রাণী মনে হলেও এরা আসলে ছোট ছোট জীবের একেকটি দল বা কলোনি। দলের প্রতিটি সদস্য নিজের কাজ ভাগ করে নিয়ে একত্রে বেঁচে থাকে। এরা মাঝেমধ্যে ১৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এদেরই একটি জাত ‘এরেনা সাইরেনা’ শিকার ধরার জন্য নিজের শরীর থেকে লাল আলো জ্বালিয়ে অন্য প্রাণীদের লোভ দেখায়।
এরপর আছে ব্লাডি-বেলি কম্ব জেলি। গাঢ় লাল রঙের এই প্রাণীটিকে জেলিফিশ মনে হলেও এরা মূলত ‘সিটেনোফোর’ জাতের জীব। এদের হুল ফোটানোর ক্ষমতা নেই। তবে শিকার আটকে রাখার জন্য শরীরে আঠালো কোষ থাকে। এরা শরীরের গায়ে থাকা ছোট ছোট পশমের মতো অংশের সাহায্যে সাঁতার কাটে, যার ওপর আলো পড়লে আলোটা ঝিকমিক করে ওঠে।
আরেকটি মজার প্রাণী হলো স্ট্রবেরি স্কুইড। লাল রঙের এ স্কুইডটির দুটি চোখ দুই আকারের হয়ে থাকে। বড় ও সবুজ চোখটি দিয়ে এটি ওপর থেকে আসা আলো আর ছায়ার মধ্যে শিকার খোঁজে। আর ছোট চোখটি দিয়ে নিচের দিকে থাকা প্রাণীদের নিজের শরীর থেকে বের হওয়া আলোর সংকেত লক্ষ করে।
সবশেষে বলা যায় বিগফিন স্কুইডের কথা। এদের মূল শরীরটি মাত্র একটি কাগজের নোটের মতো ছোট হলেও শুঁড়গুলো মানুষ সমান লম্বা হয়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এদের শুঁড়গুলো হাতের কনুইয়ের মতো ৯০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যায়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে আবিষ্কৃত হলেও এই দুর্লভ স্কুইডটিকে এ পর্যন্ত মাত্র ২০ বারের মতো দেখা গেছে।
সমুদ্রের তলদেশে টিকে থাকে এরা
গভীর সমুদ্রের অন্ধকার আর পানির প্রচণ্ড চাপের মধ্যে টিকে থাকে এখানকার প্রাণীরা। সেখানে পানির যে চাপ থাকে, তাতে সাধারণ যেকোনো প্রাণী সহজেই পিষে যেতে পারে। কিন্তু এখানকার জীব সেই পরিবেশেই দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে।
প্রথমে আসে ব্লবফিশ। সমুদ্রের হাজার হাজার ফুট গভীরে পানির প্রচণ্ড চাপে এদের শরীর একদম স্বাভাবিক দেখায়। তবে এদের পানি থেকে ডাঙায় তুলে আনলে চাপ হঠাৎ কমে যায়। ফলে এদের পুরো শরীর থকথকে হয়ে চুপসে যায়। তখন এদের দেখতে হয় খুব অদ্ভুত।
এরপর আছে ‘ইউনিস ডিকালারহামি’ নামের এক অদ্ভুত কৃমি। সমুদ্রের ৫৯০ থেকে ১ হাজার ১১৫ ফুট গভীরে বাস এদের। চোখ দুটো বেশ বড় আর ফোলা, চোয়ালটাও খানিকটা উঁচু। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এদের দেখতে সাধারণ কৃমির চেয়ে বরং কোনো কার্টুন চরিত্রের মতো লাগে।
গভীর সমুদ্রের আরেকটি চমক হলো ‘ইবালিয়া স্কাল্পটা’ বা ডেভিলড ক্র্যাব। সমুদ্রের প্রায় ৬৫০ ফুট গভীরে ঘুরে বেড়ানো এই লাল-সাদা কাঁকড়ার মাথার অংশে ভুতুড়ে একটি মুখমণ্ডল দেখা যায়। দেখলে মনে হয় যেন নিজের মুখটি সেখানে খোদাই করে রেখেছে।
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো গভীর সমুদ্রে দেখা মেলে ‘জেনোফাইওফোর’ নামের এককোষী জীবের। এত বড় গভীরতায় বাস করেও এরা পলি বা কাদা একত্র করে প্রবাল কিংবা গাছের মতো সুন্দর ঘর তৈরি করে। এদের তৈরি ঘরে অন্য ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও মাছের ডিম নিরাপদে আশ্রয় পায়।
সবশেষে রয়েছে ‘ওসেড্যাক্স’ বা হাড়খেকো কৃমি। এদের কোনো মুখ বা পেটের পরিপাকতন্ত্র থাকে না। এরা বিশেষ ধরনের অ্যাসিড তৈরি করে সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা তিমি বা অন্য প্রাণীর মৃতদেহের হাড় গলিয়ে ফেলে। এরপর সেই গলানো হাড় থেকেই নিজের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শুষে নেয়।
এরা হলো সাগরের সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণী। তবে এখনো বিভিন্ন সংস্থা সাগরের তলে সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাণীর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে।