ঝোড়ো বাতাস কি মানুষকে উড়িয়ে নিতে পারে
সামনে বৈশাখ মাস। বিকেলের আকাশ কালো করে যখন কালবৈশাখী আসে, তখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শুনে অনেকেই ভয় পান। ঝড়ের পর প্রায়ই খবরে দেখা যায়, কারও ঘরের চাল উড়ে গেছে কিংবা বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিলসে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপের দেশগুলোতে এত জোরে বাতাস বইছে যে মানুষের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বাতাসের ধাক্কায় মানুষ রাস্তায় আছাড় খাচ্ছে।
কিন্তু বাতাসের কি আসলেই এত ক্ষমতা আছে যে আস্ত একজন মানুষকে মাটি থেকে উড়িয়ে নেবে? আর কেন বাতাস মাঝেমধ্যে এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে? আর এমন ঝড়ের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
ঝোড়ো বাতাস মানুষকে উড়িয়ে নিতে পারে কি না, তা জানার আগে বুঝতে হবে—বাতাস আসলে কীভাবে কাজ করে। আমরা জানি, বাতাস সব সময়ই বইছে। কিন্তু বাতাস কখনো হালকা, আবার কখনো প্রচণ্ড শক্তিশালী। কিন্তু বাতাসের এই রূপ বদলের আসল কারণটা কী?
৪৫ কেজি ওজনের একজন মানুষকে তার জায়গা থেকে নাড়িয়ে দিতে বা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে ঘণ্টায় ৬৫ থেকে ৭২ কিলোমিটার বেগের বাতাসই যথেষ্ট। একে বলা হয় ‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়’।
এর মূল কারণটা আমাদের সূর্য ও বায়ুমণ্ডলের চাপের তারতম্য। সূর্যের আলো যখন পৃথিবীর ওপর পড়ে, তখন সব জায়গা সমানভাবে উত্তপ্ত হয় না। কোথাও মাটি দ্রুত গরম হয়, আবার কোথাও পানি বা বাতাস থাকে তুলনামূলক শীতল। এই তাপমাত্রার কম-বেশির কারণেই শুরু হয় বায়ুমণ্ডলের খেলা।
তাপমাত্রার এই পার্থক্যের কারণেই বায়ুমণ্ডলের গ্যাসগুলো যেন নাচতে শুরু করে। যেখানে তাপমাত্রা বেশি, সেখানকার বাতাসের অণুগুলো হালকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ওপরের দিকে উঠে যায়। ফলে সেখানে বাতাসের চাপ কমে গিয়ে হয় নিম্নচাপ। অন্যদিকে ঠান্ডা জায়গার বাতাস থাকে ভারী, তাই সেখানকার অণুগুলো কাছাকাছি থাকে এবং নিচের দিকে নেমে আসে। তখন তাকে বলে উচ্চচাপ। ঠিক তখনই শুরু হয় বাতাসের আসল খেলা। উচ্চচাপের অঞ্চল থেকে বাতাসের অণুগুলো প্রচণ্ড গতিতে নিম্নচাপের দিকে ছুটতে শুরু করে। অণুগুলোর এই ছোটাছুটিই হলো বাতাস। যখনই এই চাপের পার্থক্য অনেক বেশি হয়, তখনই বাতাস ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যেন সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
আবহাওয়াবিদেরা বাতাসের জোর মাপার জন্য একটি বিশেষ স্কেল ব্যবহার করেন। এর নাম ‘বিউফোর্ট উইন্ড স্কেল’। এই স্কেলে ০ থেকে ১২ পর্যন্ত নম্বর থাকে। ০ মানে হলো একদম শান্ত বাতাস, যেখানে গাছের পাতাও নড়ে না। আর ১২ নম্বর মানে হলো প্রচণ্ড শক্তিশালী হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়। তখন বাতাসের গতি থাকে ঘণ্টায় ১০৩ কিলোমিটারের বেশি। অর্থাৎ চোখের পলকেই সব তছনছ করে দেওয়ার মতো শক্তি।
বড়সড় দরজাটি তখন অনেকটা পালের মতো কাজ করে আর ওই বাতাসের ধাক্কায় ছোট্ট ম্যাডিসন দরজার হাতল ধরেই শূন্যে ঝুলে পড়ে।
ঝোড়ো বাতাস তোমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারবে কি না, তা শুধু বাতাসের গতির ওপর ছাড়াও আরও কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, বৃষ্টির আগের জলীয় বাষ্পভরা ভেজা বাতাস বেশ ভারী হয়, যা শুকনা বাতাসের চেয়ে অনেক বেশি জোরে ধাক্কা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, তুমি মাটির সঙ্গে কতটা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছ, সেটিও জরুরি। কারণ, তোমার ওজন আর জুতার ঘর্ষণই তোমাকে মাটিতে আটকে রাখে। যদি বাতাসের ধাক্কা এই আটকে থাকার শক্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তবেই তুমি ভারসাম্য হারাবে। তাই শরীরের ওজন যত কম হয়, বাতাসের জন্য তোমাকে উড়িয়ে নেওয়া তত সহজ হয়ে পড়ে। ঠিক এ কারণেই প্রচণ্ড ঝড়ে বড়দের তুলনায় ছোটরা বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে।
আবহাওয়াবিদ জানান, ৪৫ কেজি ওজনের একজন মানুষকে তার জায়গা থেকে নাড়িয়ে দিতে বা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে ঘণ্টায় ৬৫ থেকে ৭২ কিলোমিটার বেগের বাতাসই যথেষ্ট। একে বলা হয় ‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়’। তোমার শরীরের ওজন যত বেশি হবে, তোমাকে সরাতে বাতাসের গতিও তত বেশি হওয়া লাগবে। ঠিক এ কারণেই ঝোড়ো বাতাসের সময় ছোট শিশু কিংবা যাদের শরীরের ওজন অনেক কম, তাদের উড়িয়ে নেওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
এমন এক ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের মার্চ মাসে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ৪ বছর বয়সী এক শিশু—ম্যাডিসন গার্ডনার। তার মা ব্রিটানির সঙ্গে কেনাকাটা শেষে মাত্রই বাড়ি ফিরেছিল সে। মা যখন গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাচ্ছিলেন, ম্যাডিসন তখন দৌড়ে গিয়ে বাড়ির সামনের দরজা খোলার চেষ্টা করে। সে দরজার হাতল ধরে নকটি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা।
হঠাৎ এক প্রচণ্ড দমকা হাওয়া ম্যাডিসনের সামনের দরজাটি সজোরে খুলে দেয়। বড়সড় দরজাটি তখন অনেকটা পালের মতো কাজ করে আর ওই বাতাসের ধাক্কায় ছোট্ট ম্যাডিসন দরজার হাতল ধরেই শূন্যে ঝুলে পড়ে। ঠিক যেমনটা আমরা দ্য উইজার্ড অব ওজ মুভিতে ডরোথিকে ঝড়ের কবলে পড়তে দেখি। ভাগ্যবশত ম্যাডিসনের কোনো চোট লাগেনি। কিন্তু এ ঘটনা পরিষ্কার যে বাতাস চাইলেই একজন মানুষকে মাটি থেকে শূন্যে ভাসিয়ে নিতে কিংবা আছাড় দিয়ে ফেলে দিতে পারে।