মিলেনিয়ালরা কেন শুধু সহজ গেম খেলে

ক্যান্ডি ক্রাশ সাগা

বাসে, মেট্রোতে বা অফিসের বিরতিতে অনেককেই স্মার্টফোনে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে দেখা যায়। বিশেষ করে মিলেনিয়ালদের অর্থাৎ যাদের বর্তমান বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছর এর মধ্যে। তাঁদের অনেকের কাছেই এটি খুব প্রিয় একটি গেম। প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক লেভেল না খেললে অনেকের যেন ঘুমই আসে না। কিন্তু বর্তমানে এত আধুনিক ও চমৎকার সব গেম থাকার পরও তাঁরা কেন এই সাধারণ ধাঁধার গেমটিই এত বেশি পছন্দ করছেন?

মিলেনিয়ালরাই সেই প্রজন্ম, যাঁরা তাঁদের আগের প্রজন্ম থেকে কম্পিউটার বা ল্যাপটপের চেয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে একজন মানুষ গড়ে দিনে প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন মোবাইলে। আর এ সময়ের প্রায় ৯০ শতাংশই কাটে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে। আর চীন, দক্ষিণ এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোয় মোবাইল ব্যবহারের হার প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ করে বাড়ছে।

আরও পড়ুন
ক্যান্ডি ক্রাশ গেমে যখন সুগার ক্রাশ বা ডিভাইন শব্দগুলো শোনা যায়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে আমরা বড় কোনো পুরস্কার পেয়েছি। এই ভালো লাগার টানেই মানুষ বারবার গেমটি খেলতে থাকে।

ক্যান্ডি ক্রাশ সাগা গেমটি প্রথম মুক্তি পায় ২০১২ সালে। এটি তৈরি করেছে কিং (King) নামের একটি গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। শুরুতে এটি শুধু ফেসবুকের একটি গেম হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তবে ওই বছরের শেষ দিকে এটি স্মার্টফোনে অ্যাপ হিসেবে চলে আসে। আর অ্যাপ হিসেবে আসার পরই এটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

ক্যান্ডি ক্রাশ মূলত মিলেনিয়ালদের অ্যাপ ব্যবহারের অভ্যাসকে কাজে লাগিয়েছে। শুরুতে এটি কেবল ফেসবুকে থাকায় গেমটি খুব একটা জনপ্রিয় হতে পারেনি। কারণ ব্রাউজারে গিয়ে গেম খেলা অনেকের কাছেই ঝামেলার ছিল। কিন্তু স্মার্টফোন অ্যাপ হিসেবে আসার পর বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। এখন পকেট থেকে ফোন বের করলেই কোনো ঝামেলা ছাড়া মুহূর্তেই ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা যায়। এই সহজলভ্যতাই গেমটিকে সবার কাছে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

মিলেনিয়ালদের কর্মব্যস্ত জীবনে যখনই কিছুটা বাড়তি সময় মেলে তা বাসে যাতায়াতের সময় হোক কিংবা অফিসের কাজের ফাঁকে তাঁরা চট করে ক্যান্ডি ক্রাশের এক–দুই লেভেল খেলে নেন। মিলেনিয়ালরা সাধারণত খুব জটিল অ্যাডভেঞ্চার বা মারামারির গেম খুব একটা পছন্দ করেন না। বরং সহজ ধাঁধার গেমই তাঁদের কাছে বেশি প্রিয়। সে কারণে এত ক্যান্ডি ক্রাশ খেলেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে আরেকটা কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্কের কাজ করার ধরন। আমরা যখন গেমে ছোট কোনো লক্ষ্য পূরণ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ডোপামিন নামের একধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। এই রাসায়নিকটি আমাদের মনে ভালো লাগা বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। ক্যান্ডি ক্রাশ গেমে যখন সুগার ক্রাশ বা ডিভাইন শব্দগুলো শোনা যায়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে আমরা বড় কোনো পুরস্কার পেয়েছি। এই ভালো লাগার টানেই মানুষ বারবার গেমটি খেলতে থাকে।

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম রিলস এখনকার মতো এত জনপ্রিয় হওয়ার আগেও মানুষ মোবাইলে দিনে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটাত। তখন ফোনে কাটানো এই সময়ের বড় একটা অংশজুড়ে ছিল গেমিং। ২০২০ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে, মোবাইল গেমিং এখন কম্পিউটার বা কনসোল গেমের মতো অন্য সব মাধ্যমকে ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ এখন গেমের পেছনে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। মানুষ যখন গেম ডাউনলোড করে, তখন তাদের মধ্যে ৮২ শতাংশই বেছে নেয় ক্যান্ডি ক্রাশের মতো সাধারণ পাজল গেমগুলো।

আরও পড়ুন
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম রিলস এখনকার মতো এত জনপ্রিয় হওয়ার আগেও মানুষ মোবাইলে দিনে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটাত। তখন ফোনে কাটানো এই সময়ের বড় একটা অংশজুড়ে ছিল গেমিং।

সাধারণত আমরা ভাবি, গেম মানেই হয়তো কেবল তরুণদের বিষয়। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইতালির মতো দেশগুলোয় দেখা গেছে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরাই বেশি মোবাইল গেম খেলে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী নারীরা যখন গেম খেলেন, তখন তাঁরা তরুণদের চেয়েও বেশি সময় সেখানে ব্যয় করেন। অর্থাৎ, মিলেনিয়ালরা ফোনে হয়তো যুদ্ধ বা অ্যাকশন গেম খেলছেন না, কিন্তু ক্যান্ডি ক্রাশের মতো ধাঁধার গেমগুলোয় বেশ আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

হয়তো এখন অনেকেই গেম খেলার সেই সময়টুকু রিলস দেখে কাটান। তবে যাঁরা এখনো সরাসরি গেমিংয়ের আনন্দ নিতে চান, তাঁরাই মূলত ক্যান্ডি ক্রাশের মতো গেমগুলো খেলে যাচ্ছেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইম ম্যাগাজিন

আরও পড়ুন