কিছু মানুষ কেন সব সময় রেগে থাকে
মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে হয়তো কেউ একটা সহজ ক্যাচ মিস করেছে। ব্যস, দলের একজন এমনভাবে রেগে গেল, যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে! কিংবা রাস্তায় একটু জ্যামে পড়লেই কেউ একজন হর্ন বাজিয়ে, চিৎকার করে রীতিমতো তুলকালাম বাধিয়ে দিচ্ছে। তোমার চারপাশেই এমন কিছু মানুষ নিশ্চয়ই আছে, যারা পান থেকে চুন খসলেই রেগে আগুন হয়ে যায়।
তাদের দেখলে মনে হয়, তারা যেন একটা প্রেশার কুকার, ভেতরে শুধু ফুটন্ত রাগ টগবগ করছে! কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, কিছু মানুষ কেন সব সময় এত রেগে থাকে? এই রাগের পেছনে কি শুধুই তাদের খারাপ মেজাজ দায়ী, নাকি আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো হিসাব? চলো, আজ এই রাগী মানুষদের মনের মধ্যে একটু ঢুঁ মারা যাক।
মনোবিজ্ঞানীরা রাগকে একটা আইসবার্গের সঙ্গে তুলনা করেন। টাইটানিক জাহাজ যে আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল, তার কথা মনে আছে? আইসবার্গের শুধু চূড়াটাই পানির ওপরে ভাসতে দেখা যায়, কিন্তু এর আসল ও বিশাল অংশটা লুকিয়ে থাকে পানির নিচে।
রাগের ব্যাপারটাও ঠিক একই রকম। একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ যখন অতিরিক্ত রাগ দেখায়, তখন আমরা শুধু তার রাগী চেহারাটাই দেখতে পাই। কিন্তু পানির নিচে, মানে, তার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে অন্য অনেক অনুভূতি। অনেক মানুষ অতিরিক্ত রাগ দেখায় কারণ তারা ভয়, হতাশা, ব্যর্থতা বা লজ্জার মতো অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলোকে ঠিকমতো সামলাতে পারে না। তারা চায় চারপাশের পুরো দুনিয়াটা তাদের কথামতো চলুক। আর যখনই সেটা হয় না, তখন তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সবকিছুর জন্য অন্যকে দোষ দিতে শুরু করে এবং রেগে যায়। তবে সবাই যে শুধু এই কারণেই রেগে যায়, তা কিন্তু নয়। অনেকে আসলেই ভুল করে, এবং তার ভুলের কারণে অন্যরা রেগে যায়। সেই রাগের মধ্যে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ব্যাপার নেই।
এবার একটুখানি বিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া যাক। আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে অ্যামিগডালা নামে ছোট্ট আকৃতির একটা অংশ আছে। একে তুমি মস্তিষ্কের অ্যালার্ম বেল বলতে পারো। যখনই আমাদের কোনো বিপদ বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, অ্যামিগডালা সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়। তখন শরীর থেকে অ্যাড্রেনালিন হরমোন বের হতে থাকে। আমাদের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, পেশি শক্ত হয়ে ওঠে।
মস্তিষ্কের আরেকটি অংশ হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এটি আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু যারা সব সময় রেগে থাকে, তাদের অ্যামিগডালা এত দ্রুত ও জোরালোভাবে কাজ করে যে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স কাজ করার সুযোগই পায় না!
তবে শুধু যে মানসিক কারণেই মানুষ রেগে যায়, তা কিন্তু নয়। অনেক সময় শরীরের কিছু জটিল রোগের কারণেও মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, থাইরয়েড গ্রন্থি যদি অতিরিক্ত কাজ করে, তবে মানুষের মেজাজ খুব খিটখিটে হয়ে যায় এবং দ্রুত রেগে যায়। এই রোগকে বলে হাইপারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড বা হাইপারথাইরয়ডিজম।
এ ছাড়া যাদের দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্রোগ আছে, তাদের ভেতরেও রাগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা যখন হঠাৎ ওঠানামা করে, তখন তাদের মেজাজও খুব দ্রুত বিগড়ে যায়। বয়স্ক মানুষেরা যখন ডিমেনশিয়ায় ভোগেন, তখন তাঁরা অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না। এই বিভ্রান্তি ও অসহায়ত্ব থেকেও তাঁরা অনেক সময় অতিরিক্ত রাগ দেখিয়ে ফেলেন।
আবার রেগে যাওয়ার কারণটা অনেক সময় শৈশবের কারণে হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর একটি বড় কারণ হতে পারে মা–বাবার লালনপালনের ত্রুটি। অনেক পরিবারে শিশুদের শেখানো হয় না কীভাবে নিজের ও অন্যের আবেগের পরিবর্তনগুলো বুঝতে হয়। ফলে সেই শিশুরা যখন বড় হয়, তখন কোনো কঠিন পরিস্থিতি এলেই তারা কোনো উপায় না পেয়ে রেগে যায়।
তা ছাড়া অতীতের কোনো মানসিক আঘাত মানুষকে সারাক্ষণ একধরনের অজানা সতর্কতায় রাখে। তাদের মস্তিষ্ক চারপাশের সবকিছুকেই হুমকি বলে মনে করে। তাই একটু কিছু হলেই তারা আত্মরক্ষার জন্য রাগের আশ্রয় নেয়।
যে মানুষটা সব সময় রেগে থাকে, সে ভাবে রাগ দেখিয়ে সে চারপাশের সবাইকে শাসন করছে বা নিজের শক্তি দেখাচ্ছে। কিন্তু সত্যিটা হলো, এই রাগ আসলে তাকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। অতিরিক্ত রাগের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়, হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। বন্ধু বা প্রিয়জনেরা দূরে সরে যায় তো বটেই!
এখন ভাবতে পারো, রাগ কি তাহলে কমানো সম্ভব? রাগ কমানোর জন্য কোনো জাদুর কাঠি নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের রাগকে চিনতে পারা। ঠিক কোন কথাটা শুনলে বা কী ধরনের ঘটনা ঘটলে তোমার রাগ উঠতে শুরু করে, সেই পয়েন্টগুলো খুঁজে বের করা।
যখনই বুঝবে রাগ উঠতে শুরু করেছে, তখন লম্বা করে শ্বাস নিয়ে মনে মনে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনতে পারো। এই সামান্য কয়েক সেকেন্ড সময় তোমার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটাকে জেগে ওঠার সুযোগ করে দেবে। তখন তুমি বুঝতে পারবে, চিৎকার করা বা জিনিসপত্র ভাঙচুর করা কোনো সমাধান নয়।
তাই তোমার সামনে কেউ অকারণে রেগে গেলে তাকে ভয় না পেয়ে বোঝার চেষ্টা করো। মানুষটার মনের ভেতর হয়তো অনেক না বলা কষ্ট বা শারীরিক কোনো সমস্যা লুকিয়ে আছে!