বিশ্বের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ ৩০০ বছর ধরে চালু আছে কীভাবে
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো রেস্তোরাঁ কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর স্পেনের মাদ্রিদে থাকা ‘রেস্তোরান্তে সোব্রিনো দে বোতিন’ নামের এক রেস্তোরাঁ। ১৭২৫ সালে যাত্রা শুরু করেছিল রেস্তোরাঁটি। তিন শতাব্দী পার হতে চললেও আজ পর্যন্ত ঠিক একই জায়গায় খাবার পরিবেশন করে চলেছে এটি।
প্রায় ৩০০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে অগণিত ভোজনরসিককে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়ে আসার কারণে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বোতিনকে বিশ্বের প্রাচীনতম চালু রেস্তোরাঁ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
বোতিনের কয়েক শ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী পদের অসাধারণ স্বাদ আর প্রাচীনকালের সেই পরিবেশ মিলিয়ে এটি এখন মাদ্রিদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কত ভয়াবহ যুদ্ধ এল–গেল, মানুষের খাবারের রুচি বদলাল এবং যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে অগণিত রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে হারিয়ে গেল। কিন্তু সব সামলে প্রায় ৩০০ বছর ধরে বোতিন কীভাবে টিকে আছে?
কেন বোতিনকে বিশ্বের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ বলা হয়
১৭২৫ সালে মাদ্রিদে ‘রেস্তোরান্তে সোব্রিনো দে বোতিন’ চালু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ৩০০ বছরে এটি এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। আর এ কারণেই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম চালু রেস্তোরাঁ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
শত শত বছরের এই ইতিহাসজুড়ে নেপোলিয়নের আক্রমণ থেকে শুরু করে ভয়াবহ স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ সব কিছুই সহ্য করেছে বোতিন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও স্থানীয় মানুষ আর পর্যটকদের খাবার পরিবেশন করা থামায়নি। চমৎকার বিষয় হলো, এই তিন শতাব্দীতে রেস্তোরাঁটির মালিকানা বদলেছে মাত্র দুটি পরিবারের হাত ধরে। মালিকানায় স্থায়িত্ব থাকার ফলেই এর পুরোনো ঐতিহ্যে কখনো টিকে আছে।
যে ভবনটিতে বোতিন অবস্থিত, সেটিও কম অদ্ভুত নয়। এর নিচতলার পুরোনো ভূগর্ভস্থ সেল্টিক গুহা এবং পুরোনো আমলের খাবার ঘরগুলো এখনো আঠারো শতকের সেই প্রাচীন রূপ ধরে রেখেছে।
বোতিনের প্রতিষ্ঠার সময় ও ইতিহাস নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। রেস্তোরাঁর দেয়ালে টাঙানো ১৫৯০ সালের একটি পুরোনো দলিল মূলত ভবনটি যে অনেক আগের, কেবল সেটুকুই প্রমাণ করে। তবে রেস্তোরাঁটি কত পুরোনো, তার কোনো প্রমাণ এতে নেই। অন্যদিকে, বাইরের দেয়ালে খোদাই করা ১৭২৫ সালটি ছিল মূলত সেই পাথরের দেয়ালটি বসানোর বছর। পরবর্তী সময়ে এই তারিখকে রেস্তোরাঁর প্রচার বা মার্কেটিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
তবে বিতর্ক থাকলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই প্রতিষ্ঠানের বেশ প্রভাব দেখা যায়। বিখ্যাত লেখক বেনিতো পেরেজ গালদোসের উপন্যাসগুলোয় এই রেস্তোরাঁটির মুখরোচক খাবারের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সাহিত্যিক এই গুরুত্বকে সম্মান জানিয়ে রেস্তোরাঁটির দেয়ালে একটি স্মারক ফলক স্থাপন করে। ১৯৩০ সাল থেকে গঞ্জালেজ পরিবার রেস্তোরাঁটি পরিচালনা করা শুরু করে।
যদিও এই রেস্তোরাঁ আধুনিক সুবিধা ও নতুন রূপ নিয়ে পুরোদমে চালু হয় ১৮৬৫ সালের দিকে। তবু বিশ্বজুড়ে ১৭২৫ সালে এটা শুরু হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া হয়। আর এভাবে সফলতার সঙ্গে ৩০০ বছর পূর্ণ করায় ২০২৫ সালে মাদ্রিদ সরকার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে ‘অর্ডার অব দ্য সেকেন্ড অব মে’-র মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যান্ড ক্রস সম্মানে ভূষিত করে। মূলত মাদ্রিদ সরকার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি বা সংস্থাকে এই সম্মান প্রদান করে থাকে। আর পরে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস স্বীকৃতি দেয়।
বোতিনে কী কী খাবার পাওয়া যায়
ঐতিহাসিক বোতিন রেস্তোরাঁর চমৎকার মেনুতে রকমারি স্বাদের খাবারের আয়োজন রয়েছে। শুরুতেই খাবার খাওয়ার ইচ্ছা বাড়াতে এখানে পাওয়া যায় দারুণ সব স্টার্টার। এর মধ্যে স্পেশাল পনির, চিকেন ও হ্যাম ক্রোকেট, স্মোকড স্যামন এবং বিভিন্ন ধরনের সালাদ বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া সুস্বাদু রসুনের স্যুপ, মুরগি আর স্পেনের বিখ্যাত ঠান্ডা টমেটো স্যুপ ‘গাজপাচো’ রয়েছে অতিথিদের পছন্দের তালিকায়।
এখানকার খাবারের প্রধান আকর্ষণ হলো পুরোনো আমলের কাঠের চুলায় তৈরি আর গ্রিল করা বিভিন্ন পদের মাংস। সবজি দিয়ে রোস্ট করা মুরগি, বিশেষ তিতির পাখির স্ট্যু, রোস্ট করা ভেড়ার মাংস এবং হরেক রকমের বিফ স্টেক তৈরি হয় এই চুলায়। সামুদ্রিক খাবারের ভক্তদের জন্য রয়েছে চিংড়ি, স্কুইড ফ্রাই, ক্ল্যামস, কডফিশসহ বিভিন্ন পদের সুস্বাদু মাছ।
আর মিষ্টির মধ্যে রয়েছে সেরা সব ডেজার্ট। স্পঞ্জ কেক ও ক্রিম দিয়ে বানানো বুটি কেক, ঐতিহ্যবাহী চিজকেক, কাস্টার্ড, তিরামিসু, রাইস পুডিং এবং ঠান্ডা আইসক্রিম। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মানুষ এই পুরোনো রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে আসেন।