আইনের ডিগ্রি ছাড়াই ২৬ মামলায় জয়, গ্রেপ্তার হলেন যেভাবে
বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘সুটস’দেখেছেন? সেখানে মাইক রস নামের এক তুখোড় ছেলে আইন নিয়ে কোনো পড়াশোনা না করেই কীভাবে যেন ঝানু আইনজীবী বনে যায়। পর্দার সেই গল্প দেখে আমরা সবাই বেশ মজা পেয়েছিলাম। কিন্তু এমন ঘটনা যে বাস্তবেই ঘটবে, তা ভাবিনি। আসলেই এমন একজন আইনজীবী আছেন, যিনি ভুয়া আইনজীবী হয়েও দিনের পর দিন খোদ হাইকোর্টের বাঘা বাঘা বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক মামলা জিতে গেছেন!
ঘটনাটি ঘটেছে কেনিয়ায়। ব্রায়ান মোয়েন্ডা নামের এক যুবক এই করেছেন। তিনি শুধু নিজেকে কেনিয়ার হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে পরিচয়ই দেননি, রীতিমতো প্র্যাকটিসও করেছেন। তাঁর সাফল্যের হার শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। একে একে মোট ২৬টি মামলা লড়েছেন তিনি এবং ২৬টিতেই জয়লাভ করেছেন! ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্টের বাঘা বাঘা বিচারকদের সামনে তিনি এমন দাপটের সঙ্গে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন, ঘুণাক্ষরেও কেউ সন্দেহ করতে পারেনি যে এই লোক জীবনেও ল স্কুলের বারান্দাও মাড়াননি! বিচারকেরাও তাঁর আইনি জ্ঞানে রীতিমতো মুগ্ধ ছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো, এত বড় জালিয়াতি তিনি করলেন কীভাবে? এর পেছনে আছে দারুণ এক বুদ্ধির খেলা, যা কোনো থ্রিলার মুভির চেয়ে কম নয়। কেনিয়ার ল সোসাইটির ডেটাবেজে তিনি অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করেন। সেখানে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যান এমন একজনকে, যাঁর নামের সঙ্গে তাঁর নিজের নামের দারুণ মিল। সেই ব্যক্তির নাম ব্রায়ান মোয়েন্ডা এনটুইগা। আসল ব্রায়ান ২০২২ সালের আগস্টে বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কাজ করতেন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে, তাই তাঁর আলাদা করে কোনো প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেটের দরকার পড়েনি। ফলে তাঁর পোর্টাল অ্যাকাউন্টটি একরকম অলস পড়েই ছিল।
আমাদের এই ভুয়া ব্রায়ান ঠিক এই সুযোগই নিলেন। তিনি চুপচাপ আসল ব্রায়ানের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। ই–মেইল অ্যাড্রেস বদলে ফেলেন, নিজের সুন্দর একটা ছবি আপলোড করে প্রোফাইল পিকচারও চেঞ্জ করে দেন। এরপর রীতিমতো ফি জমা দিয়ে প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেটের জন্য আবেদনও করে বসেন! সব কিছুই খুব সুন্দরভাবে এগোচ্ছিল।
কিন্তু কথায় আছে না, চোরের দশ দিন তো সাধুর এক দিন! ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আসল ব্রায়ানের হঠাৎ মনে হলো, তাঁর একটা প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেট দরকার। তিনি পোর্টালে লগ-ইন করতে গেলেন। কিন্তু এ কী! পাসওয়ার্ড ভুল দেখায় কেন? অনেক চেষ্টার পর তিনি যখন ল সোসাইটির আইটি বিভাগে যোগাযোগ করলেন, তখন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে আস্ত এক সাপ বেরিয়ে এল। আইটি বিভাগ চেক করে দেখল, অ্যাকাউন্টের ই–মেইল তো অন্য কারও!
এরপর আর যায় কোথায়! ল সোসাইটি তড়িঘড়ি করে জরুরি মিটিং ডাকল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই ভুয়া ব্রায়ানের বিরুদ্ধে জনসাধারণের কাছ থেকেও বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। অবশেষে কেনিয়ার ল সোসাইটির র্যাপিড অ্যাকশন টিম তাকে জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। তারা এক্স সাইটে রীতিমতো নোটিশ দিয়ে জানায়, ‘সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে ব্রায়ান মোয়েন্ডা নামে এই ব্যক্তি আমাদের রেকর্ডে নেই, সে কোনো আইনজীবীই নয়!’
ভুয়া ব্রায়ান এখন পুলিশি হেফাজতে থেকে জেরার মুখে ঘাম ঝরাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর এই কীর্তি নিয়ে কেনিয়াসহ পুরো বিশ্বে হাসির রোল পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই মজা করে বলছেন, যে লোক ভুয়া ডিগ্রি নিয়ে ২৬টা মামলায় জিতেছে, তাকে তো জেলে না পাঠিয়ে সোজা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বানিয়ে দেওয়া উচিত!
তা বিচারকদের রায় যা-ই হোক না কেন, নিজের মামলায় লড়ার জন্য ব্রায়ানের হয়তো আর অন্য কোনো আইনজীবীর দরকার পড়বে না। কী বলেন?
না, এখানেই শেষ নয় এই কাহিনি। ওপরে যে কথাটা বললাম, অনলাইনে তা ভালোভাবেই ছড়িয়েছে। সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে তো কত খবরই ছড়ায়, তবে সব খবর কি আর পুরোপুরি সত্যি হয়? সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্যিই ছড়িয়ে পড়েছিল যে ব্রায়ান নিজে নিজের মামলা লড়েছেন এবং বিচারককে বোকা বানিয়ে বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন। গল্পটা শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবের ব্রায়ান কিন্তু এতটাও বোকা নন যে নিজের মামলা নিজে লড়তে যাবেন! ধরা পড়ার পর তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন, এবার আর ভুয়া পরিচয়ে কাজ হবে না। তাই নিজেকে বাঁচাতে তিনি কেনিয়ার একেবারে জাঁদরেল দুই সত্যিকারের আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁদের নাম যথাক্রমে জন খামিনওয়া ও ড্যানস্টান ওমারি। এই আসল আইনজীবীদের যুক্তিতেই ব্রায়ান শেষমেশ ২ লাখ কেনিয়ান শিলিংয়ের (প্রায় ১ হাজার ৩০০ ডলার) বিনিময়ে আদালত থেকে জামিন পান। অর্থাৎ তিনি নিজের মামলা নিজে লড়ে জেতেননি, বরং আসল আইনজীবীদের কাঁধে চেপেই জামিনে বের হয়েছেন! আর তাঁর ২৬টি মামলা জেতার দাবি নিয়েও বিতর্ক আছে। কেনিয়ার ল সোসাইটি পরে জানিয়েছে, এ দাবির পক্ষে তাদের কাছে কোনো তথ্যভিত্তিক প্রমাণ নেই।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট