এক পাতায় জাইনের দুনিয়া
একটিমাত্র পাতায় যদি নিজের ভাবনা, গল্প কিংবা নিজের কথাকে লিখতে পারো, কেমন লাগবে? সেই লেখা যদি কোনো প্রকাশনীর সাহায্য ছাড়াই প্রকাশ করতে পারো, নিশ্চয়ই ভালো লাগবে তোমার। বন্ধুদের মধ্যে সেগুলো ছড়িয়ে দিতে পারবে তুমি। বন্ধুরাও পড়তে পারবে তোমার লেখা। অদ্ভুত শোনালেও আমি কিন্তু মোটেই বাড়িয়ে বলছি না। লেখা প্রকাশের এই মাধ্যমটি জাইন (Zine) নামে পরিচিত। জাইন হচ্ছে এমন এক বই, যার মাধ্যমে তুমি নিজেই হয়ে উঠতে পারো নিজের লেখার প্রকাশক। কিন্তু পুরো লেখাটা হতে হবে একটিমাত্র পাতায়। কীভাবে তৈরি করবে এক পাতার এই জগৎ? জাইন আসলে কী?
জাইন আসলে কী?
জাইন (Zine) একধরনের এসো নিজে করি (Do It Yourself) পদ্ধতির মাধ্যম। মাত্র একটি কাগজের সাহায্যে তৈরি করা হয় জাইন। প্রচলিত কোনো মাধ্যম ছাড়া প্রকাশ করা হয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বিপণনও করা হয় একইভাবে। সাধারণত একজন ব্যক্তি তৈরি করে তার নিজস্ব জাইন। আর পুরো ব্যাপারটাই হতে হবে অবাণিজ্যিক।
জাইন (Zine) শব্দটি আসলে এসেছে Magazine–এর শেষ অংশ থেকে। জাইন প্রথম জনপ্রিয় হয়েছিল ১৯৩০ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে সায়েন্স ফিকশন ফ্যানদের মধ্যে। এরপর এটি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক আন্দোলন, প্রতিবাদ, শিল্প ও সংস্কৃতি, নারীবাদসহ বিভিন্ন আন্দোলনের এক অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে।
জাইন কীভাবে বানাতে হয়?
জাইন বানানো বেশ সহজ। একটি কাগজ ভাঁজ করে বানানো যায়। ইউটিউবে জাইন বানানোর অনেক টিউটরিয়াল আছে। সেই ভিডিওগুলোয় ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি জাইন বানানো যায়।
জাইন বানাতে যে জিনিসগুলো লাগবে:
১. একটি কাগজ (A4 size)
২. একটি কাঁচি
৩. একটি bone folder (কাগজ ভাঁজ করতে সাহায্য করে)
৪. একটি প্রিন্টার (লেখা ও ছবি ছাপানোর জন্য)
৫. আঠা, টেপ অথবা স্ট্যাপলার (বাইন্ডিংয়ের জন্য)
বানানোর পদ্ধতি: প্রথমে একটি A4 আকারের কাগজ নাও। সেটিকে দৈর্ঘ্য বরাবর একবার ভাঁজ করো। এরপর প্রস্থ বরাবর তিনবার ভাঁজ করো। এখন তুমি দৈর্ঘ্য বরাবর দুই পাশে চারটি করে মোট আটটি বক্স পাবে। এই বক্সগুলোয় লেখা অথবা ছবি থাকবে। চাইলে তোমরা আগে লেখা ও ছবি থেকে প্রিন্ট করে নিতে পারো।
এরপর কাগজটিকে প্রস্থ বরাবর আবার ভাঁজ করতে হবে এবং মাঝখান দিয়ে অর্ধেক অংশ কাঁচি দিয়ে কাটতে হবে। এরপর কাগজটিকে দৈর্ঘ্য বরাবর ভাঁজ করতে হবে এবং দুই দিক থেকে টান দিয়ে (+) আকৃতি তৈরি করতে হবে। এভাবে চারটি পাতা তৈরি হবে। এরপর সেগুলোকে বইয়ের মতো ভাঁজ করতে হবে। তৈরি হয়ে গেল তোমার জাইন। তুমি চাইলে পাতাগুলোকে আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে পারো অথবা স্ট্যাপলার দিয়ে স্ট্যাপল করতে পারো।
এরপর শুধু একটি কাজই বাকি। নিজের জাইনের অনেকগুলো কপি তৈরি করা। কপি হয়ে গেলে বন্ধুদের মধ্যে পড়তে দিতে পারো।
দেখলে, কীভাবে একটি কাগজ দিয়ে পুরো একটি বই তৈরি করা যায়? বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায় কারও সাহায্য ছাড়াই? এখন তুমি শুধু লেখকই নও, হয়ে যাবে নিজের প্রকাশকও।
জাইন কী কী বিষয়ে হতে পারে
বিভিন্ন বিষয় নিয়েই একটা জাইন হতে পারে। যেমন সাহিত্য, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, ভ্রমণ, ব্যক্তিগত অনুভূতি, ট্রেন্ড ইত্যাদি। একটি জাইনে সাধারণত একটি বিষয় নিয়েই লেখা হয়। তবে তুমি চাইলে তোমার জাইনে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে লিখতে পারো।
যেমন তুমি বানাতে পারো:
১. তোমার স্কুলজীবনের এক দারুণ অভিজ্ঞতা
২. তোমার প্রিয় বইয়ের তালিকা
৩. তোমার প্রিয় বই নিয়ে একটি রিভিউ
৪. তোমার এক অদ্ভুত বন্ধুকে নিয়ে একটি গল্প
৫. তোমার কোনো প্রিয় গানের লাইন
৬. নিজের হাতে আঁকা ছবিগুলো
৭. তোমার একজন প্রিয় লেখক অথবা কবি
৮. তোমার লেখা নিজের একটি ছোট গল্প
৯. তোমার প্রিয় কার্টুন বা অ্যানিমে
মোটকথা, তোমার যেটা খুশি সেটা নিয়ে বানাতে পারো জাইন। এখানে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।
বাংলাদেশের নতুন সংস্কৃতি
বাংলাদেশে অনেকেই ছোটবেলায় নিজের মতো করে বই বা পত্রিকা তৈরি করে। হয়তো তারা জানেও না যে এগুলো জাইন নামে পরিচিত। যদিও সেগুলো পড়া, আদান–প্রদান বা সংগ্রহ করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি আমাদের দেশে। লেখকেরা লেখা প্রকাশ করার জন্য এখনো প্রচলিত মাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভরশীল। সেটা তো আছেই, এর সঙ্গে জাইন হয়ে উঠতে পারে লেখা প্রকাশ করার ভিন্ন একটা মাধ্যম। তবে এটি শুধুই নিজের লেখা প্রকাশের মাধ্যম নয়, নিজের অনুভূতি অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার উপায়ও। পাশাপাশি অবসরে নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগানোর দুর্দান্ত উপায়ও বটে। জাইন আকারে ছোট, তবে এর সম্ভাবনা বিশাল। জাইন চর্চার মাধ্যমে আমরা লেখালেখি, ছবি আঁকা কিংবা বই পড়ার সংস্কৃতি নতুনভাবে এগিয়ে নিতে পারি।
কে জানে হয়তো আগামী দিনে একটা ছোট্ট জাইন থেকেই গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক। হয়তো একটা স্কুলে শুরু হতে পারে জাইন ফেস্টিভ্যাল, যেখানে সবাই নিজের বানানো জাইন নিয়ে আসবে। হয়তো কিশোর আলো বুক ক্লাবের মতো শুরু হবে জাইন ক্লাব, যেখানে বইয়ের জায়গায় বিনিময় করা হবে নিজের হাতে বানানো জাইন। বইমেলার মতো জাইন মেলাও তো হতে পারে। সুন্দর সুন্দর জাইন অনেকে শখ হিসেবে সংগ্রহ করবে হয়তো।
কিশোরদের ডাক
তোমরা চাইলেই জাইন সংস্কৃতিটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারো। এর জন্য বেশি কিছু লাগবে না। শুধু লাগবে একটি কাগজ, একটি কলম ও নিজের ইচ্ছাশক্তি। তোমরাই হতে পারো বাংলাদেশের জাইন সংস্কৃতির প্রবর্তক। একটা কাগজ, একটা কলম আর তোমার মনের দুনিয়া—বানিয়ে ফেলো একটি চমৎকার জাইন। আর ছড়িয়ে দাও চারদিকে।
আমি তো এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছি জাইন বানানো। তুমি কবে বানানো শুরু করছ নিজের প্রথম জাইন?
লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি, ঢাকা