মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেন প্রতিবছর একটি টার্কিকে ক্ষমা করে দেন
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি দেশ চালানোর হাজারো গুরুতর কাজ ফেলে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি মোটাসোটা টার্কি। প্রেসিডেন্ট খুব গম্ভীর মুখে সেই টার্কিটিকে রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করছেন!
প্রশ্ন হলো, বেচারা টার্কি আবার কী অপরাধ করল যে ওকে ক্ষমা করতে হবে? ওটা কি ব্যাংক ডাকাতি করেছে, নাকি গুপ্তচরবৃত্তি? না, এসবের কিছুই টার্কি করেনি। ওর একমাত্র অপরাধ হলো, ওটা খেতে খুব সুস্বাদু। কিন্তু এই অদ্ভুত প্রথা কোথা থেকে এল? কেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা নিয়ম করে প্রতিবছর একটা টার্কিকে প্রাণদণ্ড থেকে মুক্তি দেন? এর পেছনের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ মজার এবং কিছুটা গোলমেলেও।
প্রচলিত আছে, এই প্রথার শুরু হয়েছিল আব্রাহাম লিংকনের হাত ধরে। লিংকনের ছোট ছেলে ট্যাড একটি টার্কির খুব ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে বাবাকে অনুরোধ করে মোরগটিকে না মারার জন্য। ছেলের আবদার মেটাতে লিংকন টার্কিটিকে ক্ষমা করে দেন।
গল্পটা শুনতে বেশ মিষ্টি, কিন্তু এর ঐতিহাসিক ভিত্তি খুব দুর্বল। এই ঘটনাটি প্রথম জানা যায় ১৮৬৫ সালে, লিংকন মারা যাওয়ার পর। তাও সেটা ছিল বড়দিন বা ক্রিসমাসের টার্কি, থ্যাংকসগিভিংয়ের নয়। তাই লিংকনকে এই প্রথার জনক বলাটা ঠিক হবে না।
তবে আরও একটি ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১৯৪৭ সালে প্রথম এই প্রথা চালু করেন। এমনকি বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো প্রেসিডেন্টরাও বিভিন্ন সময় ট্রুম্যানকে এই প্রথার জনক বলে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু ট্রুম্যান লাইব্রেরির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি আসলে টার্কিকে ক্ষমা করার ধার ধারতেন না। বরং সাংবাদিকেরা যখন তাঁকে উপহার পাওয়া টার্কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন, তিনি হাসিমুখে বলতেন, ‘এগুলো সোজা আমার পেটে যাবে!’ অর্থাৎ তিনি উপহারের টার্কিগুলো পরিবারের সঙ্গেই আরাম করে খেতেন।
তাহলে দয়ার ব্যাপারটা এল কোথা থেকে? আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও মাঝেমধ্যে কয়েকজন প্রেসিডেন্ট টার্কির প্রতি দয়া দেখিয়েছেন। যেমন ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে প্রায় ২৫ কেজি ওজনের বিশাল এক সাদা টার্কি উপহার হিসেবে আসে। কেনেডি ওটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘থাক, একে বড় হতে দাও।’ তিনি মোরগটাকে না খেয়ে ফার্মে পাঠিয়ে দেন।
রিচার্ড নিক্সন, জিমি কার্টার এবং রোনাল্ড রিগ্যানও তাঁদের সময়ে মাঝেমধ্যে উপহার পাওয়া টার্কিগুলোকে চিড়িয়াখানায় বা ফার্মে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু তখনো এটা কোনো নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়নি। নিয়ম হলো ১৯৮৯ সালে। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ।
সে বছর হোয়াইট হাউসের বাইরে প্রাণী অধিকার কর্মীরা টার্কি হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছিলেন। হয়তো সেই চাপের মুখে, অথবা নেহাতই মজার ছলে প্রেসিডেন্ট বুশ এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দেন।
তিনি উপহার পাওয়া টার্কিটির দিকে নির্দেশ করে ঘোষণা দেন, ‘আমি আপনাদের এবং এই সুন্দর টার্কিটিকে নিশ্চিত করছি, সে আজ কারও ডিনার টেবিলে যাবে না। ওটা এইমাত্র রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেল। এখান থেকে টার্কিটা সোজা চলে যাবে কাছের এক চিলড্রেনস ফার্মে। সেখানেই ওটা বাকি জীবন সুখে–শান্তিতে কাটাবে।’
ব্যস! সেই থেকে শুরু। এর পর থেকে প্রতিবছর নভেম্বরে থ্যাংকসগিভিংয়ের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি বা দুটি টার্কিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা করেন। সেই ভাগ্যবান টার্কিগুলো বাকি জীবন কোনো ফার্মে বা ডিজনিল্যান্ডে ভিআইপি মর্যাদায় কাটিয়ে দেয়।
বাইরের মানুষের কাছে এটা পাগলামি মনে হতে পারে। কিন্তু যে দেশে প্রতি ফেব্রুয়ারিতে একটা গ্রাউন্ডহগ (একধরনের কাঠবিড়ালি–জাতীয় প্রাণী) গর্ত থেকে বেরিয়ে আবহাওয়া বা ঋতু পরিবর্তনের ভবিষ্যদ্বাণী করে, সে দেশে প্রেসিডেন্টের টার্কি ক্ষমা করার ঘটনা খুব একটা বেমানান নয়!
দিন শেষে এটি একটি বিনোদন। এই বিনোদন উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স