তানজিনা হোসেনের সায়েন্স ফিকশন—গাছের গান

‘তুমি বলতে চাও বাচ্চা দুটোকে কেউ ধরে নিয়ে চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে?’

ছেলেটা গম্ভীর স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ।’

গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার জাহিদ হাসানের ভ্রু কুঁচকে গেল, ‘তুমি নিজের চোখে দেখেছ?’

দুদিকে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল ছেলেটা। বয়স বছর বারো হবে, গ্রামের স্কুলের পাট চুকিয়ে থানা সদরের হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে এবার। ক্লাস সিক্সে পড়ে। বড় বড় চোখ। মিষ্টি চেহারা। পথের পাঁচালীর অপুর মতো। মনে মনে ভাবলেন জাহিদ হাসান।

একটা নিশ্বাস ফেলে জাহিদ বললেন, ‘তোমার নাম কী?’

‘রুপারু।’

‘আচ্ছা বলো তো, তুমি বাচ্চাদেরকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছ?’

‘না।’ আবারও মাথা নাড়ল ছেলেটা দুদিকে। এমন কিছু দেখেনি সে। এবার বিরক্ত লাগতে শুরু করল জাহিদের। পরপর দুজন শিশু হারিয়ে গেছে এই গ্রাম থেকে। প্রথমজন খেলতে গিয়েছিল খালের পাশের মাঠে, তার বড় বোন তখন একটা গাছের নিচে বসে বান্ধবীর সঙ্গে লুডু খেলছিল। সন্ধ্যা নামার একটু আগে হঠাৎ তাকিয়ে দেখে ভাই নেই। ছোট ভাইকে এদিক-ওদিক খুঁজে না পেয়ে বোন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলে গ্রামের সবাই ছুটে গেছিল মাঠের দিকে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল বাচ্চাটা বুঝি খালে পড়ে গেছে। গ্রামের দুজন দক্ষ সাঁতারু লুঙ্গি কাছা দিয়ে দ্রুত নেমে পড়েছিল খালে। এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত খুঁজেছে। কিন্তু বাচ্চাটাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর ১৩ দিন পেরিয়ে গেছে। খালে ডুবে গেলে এত দিনে তো ভেসে উঠত। কিন্তু তার আর কোনো হদিস মেলেনি। দুদিন পর গাঁয়ে পুলিশ এসেছিল, সাক্ষ্য সাবুদ নিয়ে গেছে, অনেককে জেরা করেছে। কিন্তু ঘটনার সুরাহা হয়নি। এ মর্মান্তিক ঘটনার রেশ না কাটতেই দুদিন আগে গ্রামের আরেকটা বাচ্চা হারিয়ে গেছে। এবার হারিয়েছে আমবাগানের ভেতর থেকে। আগের রাতে ঝড় হয়েছিল খুব, আম ঝরে পড়েছিল অনেক। তাই সকাল হতেই আমবাগানের আশপাশের বাড়িগুলো থেকে ছেলেমেয়েরা ছুটে গেছিল আম কুড়াতে। মোট ছয়–সাতজন হবে। এর মধ্যে হঠাৎ খেয়াল হলো একজন নেই। মানে সূত্রধরদের বাড়ির ছোট ছেলেটা। গোটা আমবাগান তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো। ছেলেটাকে পাওয়া গেল না। এবার অবশ্য পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে। নেত্রকোনার পাহাড়ি এই গ্রামের ওপাশেই বর্ডার। এখান থেকে দুষ্টু লোকেরা শিশু পাচার করছে না তো? গ্রামের লোকেরা গতকাল থানা ঘেরাও করে বিস্তর চেঁচামেচি করে এসেছে। ওসি সাহেব সান্ত্বনা দিয়েছেন, যেভাবেই হোক শিশু পাচারকারীদের খুঁজে বের করা হবে। কোনো ক্ষমা নেই পাচারকারীদের। ময়মনসিংহের গোয়েন্দা দপ্তর থেকে বড় অফিসার আসছেন। তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। তো সেই পরিদর্শন উপলক্ষে জাহিদ হাসানের এই গ্রামে আসা।

এখানে এসে এর–ওর সাক্ষ্য শুনে মনে হচ্ছে স্রেফ দিনদুপুরে হাওয়া হয়ে গেছে দুটি শিশু। কোনো পারিবারিক দ্বন্দ্ব–কলহ, প্রতিবেশীর সঙ্গে শত্রুতা বা শিশুদের মধ্যে মন–কষাকষির প্রমাণ মেলেনি। এ এলাকার মানুষ বেশ সরল–সহজ, পাহাড়ের ধারে থাকে, কৃষিকাজ আর পশু পালন করে রোজগার করে। বড় কোনো ঝক্কিঝামেলায় এরা সচরাচর জড়ায় না। খানিকটা দুর্গম এলাকা বলে বাইরের লোকের আনাগোনাও কম।

গাঁয়ের শেষ মাথায় আমবাগান। ওটা পেরোলে জঙ্গল ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠেছে। আর মাটিও এখানে অন্য রকম, একটু সাদাটে। এখান থেকেই চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের শুরু।

জাহিদ হাসান বসে আছেন গ্রামের গোত্রপ্রধানের বাড়ির উঠানে। ঝকঝকে–তকতকে উঠান। বাড়ির খুঁটিঁগুলোতে রঙিন নকশা। চারপাশে গোল হয়ে বসেছে গাঁয়ের লোক। এই উঠান থেকে দূরে চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় আর তার পাদদেশে ঘন সবুজ জঙ্গল খানিকটা চোখে পড়ে। এখানে আকাশটা ঘন নীল। কিন্তু কেবল প্রকৃতি দেখে মুগ্ধ হলে চলবে না, তদন্ত করতে হবে। একজন একজন করে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহিদ। কেউ কোনো ক্লু দিতে পারেনি। বরং নানা আজগুবি কথাবার্তা বলে তাকে বিভ্রান্ত করছে। এ গাঁয়ের মানুষ অনেক কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। কারও কারও ধারণা গ্রামে অশুভ আত্মা এসেছে। দেবতা তাদের ওপর ক্ষুণ্ন হয়েছেন কোনো কারণে। কেউ বলছে, শিশুদের বলি দিতে নিয়ে যাচ্ছে দুষ্ট আত্মা। কেবল এই ছেলেটা, রুপারু যার নাম, বলছে যে সে জানে বাচ্চা দুটোকে কেউ ধরে নিয়ে গেছে। আর গেছে ওই চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের দিকে।

‘তুমি তো দেখোনি, তাহলে কীভাবে জানলে?’ জাহিদ হাসান জিজ্ঞেস করলেন।

‘শুনেছি।’ মাথা নিচু করে বলল রুপারু।

‘কে বলেছে?’

‘গাছ!’

‘কী?’

রুপারু চুপ করে রইল। জাহিদ হাসান হতাশ বোধ করলেন। ছেলেটা হয় মশকরা করছে, অথবা সে কল্পনাপ্রিয়। তবু একটু কেশে নিয়ে বললেন,

‘কোন গাছ?’

‘গাছের নাম জানি না। অনেক উঁচু। দৈত্যের মতো। এত উঁচু যে সে সব দেখতে পায়।’

‘আমাকে দেখাতে পারবে গাছটা?’

‘পারব।’

আরও পড়ুন

দুপুরে গোত্রপ্রধানের বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ছিল। জাহিদ হাসান অল্পই খেলেন। রুপারুকেও ডেকে নিয়েছিলেন খাবার সময়। ছেলেটা কুঁকড়ে গিয়ে পাটিতে বসে পাবদা মাছ বেছে বেছে খেল। পাহাড়ি গোল আলু চটকানো ভর্তা। আর শুঁটকি মাছ। ছেলেটা বয়সের তুলনায় খুবই চুপচাপ। নিজে থেকে কোনো কথা প্রায় বলেই না। আর প্রশ্নের উত্তরে কেবল মাথা নাড়ে। খাওয়া হলে পান চিবুতে চিবুতে একজন সেপাই আর রুপারুকে নিয়ে জাহিদ হাসান বেরোলেন।

গাঁয়ের শেষ মাথায় আমবাগান। ওটা পেরোলে জঙ্গল ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠেছে। আর মাটিও এখানে অন্য রকম, একটু সাদাটে। এখান থেকেই চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের শুরু। হেঁটে হেঁটে ক্রমাগত ওপর দিকে উঠতে হয়। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বড় বড় গাছ। ঘন গাছের জড়াজড়িতে একটু পর আর আকাশ দেখা যায় না। পায়ের নিচে ঝরাপাতা মচমচ করছে। ফুড়ুৎ করে ছুটে গেল একটা কাঠবিড়ালি। পাখিরা ওড়াউড়ি করছে মাথার ওপর। গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকরে প্রবেশ করছে জঙ্গলে। বেশ সুন্দর মায়াবী জায়গাটা।

জাহিদ অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি এই জঙ্গলে প্রায়ই আসো?’

ছেলেটা ওপরে–নিচে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

‘তোমার ভয় করে না?’

এবার পাশাপাশি মাথা নাড়া, মানে ‘না’।

‘কেন আসো এখানে একা একা?’

এবার মুখ খুলল রুপারু। আস্তে আস্তে বলল, ‘কথা বলতে।’

‘গাছদের সাথে?’

আবার ওপরে–নিচে মাথা নাড়া।

‘মানে তুমি বলতে চাইছ গাছেরা তোমার সাথে কথা বলে?’

‘সবাই বলে না।’

‘কারা বলে?’

‘দৈত্য গাছটাই বেশি বলে। সে-ই এখানে সবচেয়ে পুরোনো গাছ। মানে সবার মুরব্বি। কখনো কখনো ওপাশের রাবারগাছেরা খুব চেঁচামেচি করে। আর হিজলগাছটা আমার সঙ্গে কথা বলে না, কিন্তু সবার সঙ্গে ঝগড়া করে। ও খুব রাগী।’

জাহিদ হাসান মুখ টিপে হাসলেন। বেশ মজা লাগছে এখন। তিনি জানেন এখানে শুধু শুধুই এসেছেন। একটা বাচ্চা ছেলের আজগুবি কথায় পুলিশি তদন্ত হয় না। কিন্তু এখানে আসতে পেরে ভালো লাগছে তার। এত সুন্দর এই পাহাড় আর জঙ্গলটা। রুপারু নিয়ে এল বলে এত সুন্দর একটা জায়গা দেখা হলো।

জঙ্গলের বেশ ভেতর দিকে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল উঁচু গাছটা দেখে চমকে গেলেন জাহিদ হাসান। এত বড় গাছ জীবনে কখনো দেখেননি। শুনেছেন আফ্রিকায় এ রকম বিশাল বিশাল বাওবাবগাছ দেখা যায়। বড় একটা পরিসরজুড়ে বিরাট এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে আছে গাছটা। বিস্তৃত ডালপালায় সবুজ ঘন পাতা। তিনি ফোন বের করে চারদিক থেকে গাছটার কিছু ছবি তুললেন। তার এক বন্ধু আছে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাকে ছবিগুলো পাঠাবেন।

ছবি তোলা শেষ হলে তিনি বললেন, ‘রুপারু, তুমি গাছটাকে জিজ্ঞেস করো বাচ্চা দুটোকে কোন দিকে নিয়ে গেছে।’

রুপারু দুহাত দিয়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরল। তার ছোট্ট দুহাত দিয়ে অবশ্য পুরোটা বেড় পেল না। চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ। জাহিদও কান পেতে রইলেন। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর ঝিঁঝি পোকার শব্দ আর পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। একটু পর গাছ ছেড়ে নেমে এল রুপারু। মাথা দুদিকে নেড়ে বলল, ‘এখন কিছু বলবে না।’

‘ও কীভাবে তোমার সঙ্গে কথা বলে?’

রুপারু চুপ করে রইল। জাহিদ হাসান আরও কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরলেন। কোনো নিশানা বা ক্লু পাওয়া যায় কি না খুঁজলেন। সেপাইকে বললেন আশপাশের ঝোপঝাড় নেড়েচেড়ে দেখতে। দেখতে গিয়ে একটা শজারু ঝোপ থেকে বেরিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল। একটা প্যাঁচা কোত্থেকে যেন গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠল। ঘণ্টাখানেক পর তাঁরা জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।

‘এ তো বৈলামগাছ।’ ছবি দেখে বলে উঠলেন তার বন্ধু, রকিব, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। ‘একসময় আমাদের চট্টগ্রাম, কক্সবাজারে অনেক ছিল। এখন প্রায় বিলুপ্ত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর উঁচু গাছ হলো বৈলাম। একেকটা বৈলাম ২০০ ফুটের চেয়ে লম্বা হতে পারে। মানে ২০-৩০ তলা ভবনের সমান।’

‘বাপ রে। অত বড়? তাই অমন অবাক হয়েছিলাম।’ জাহিদ বললেন, ‘এত্ত বড় গাছটা। জঙ্গলের মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে আছে যেন।’

আরও পড়ুন

‘অ্যানিমোপটেরা স্ক্যাপুলা। এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম। অনেক বছর বাঁচে। এই গাছটার বয়স কমপক্ষে ৭০ বছর তো হবেই।’

‘হুম। ছেলেটা বলছিল জঙ্গলের সবচেয়ে পুরোনো গাছ এটা।’

‘হুঁ। হতেই পারে। দেখে তা–ই মনে হচ্ছে।’

‘কিন্তু কথা সেটা না। এই গাছ নাকি কথা বলতে পারে।’

জাহিদের কথা শুনে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল রকিব। না, হাসাহাসি করল না তার কথায়। বরং একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমরা যাকে কথা বলা বলি, গাছেরা ঠিক সেভাবে কথা বলে না। তবে গাছেদের নিজস্ব ভাষা বা কমিউনিকেটিং ল্যাংগুয়েজ আছে। একে বলে উড ওয়াইড ওয়েব। মাটির নিচে গাছদের শিকড়ের একটা নেটওয়ার্ক আছে। মাইসেলিয়াম ও মাইকোরেজিয়া গোত্রের একধরনের ছত্রাক এই নেটওয়ার্ক তৈরিতে সাহায্য করে। এরা গাছ থেকে গাছে পানি, পুষ্টি আর কার্বন আদান–প্রদান করে। শুধু তা–ই নয়, বিপদে–আপদে এদের মাধ্যমে গাছেরা একে অপরকে সিগন্যাল বা সতর্কবার্তাও দেয়। ছত্রাকগুলো গাছের ফুটফরমাশ খাটে আরকি। তবে বিনে পয়সায় নয়। গাছেরা ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে যে কার্বন সুগার তৈরি করে, তা খেয়েপরেই তো বেঁচে থাকে এরা। বিনিময়ে গাছেদের তথ্য আদান–প্রদানে সাহায্য করে।

‘ইন্টারেস্টিং।’ জাহিদ বললেন।

‘এই ছত্রাক নেটওয়ার্কের বাইরে কেমিক্যাল সিগন্যাল বা বার্তা পাঠানোর ক্ষমতা আছে কিছু গাছের। যেমন বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন একাশিয়াগাছে পোকা আক্রমণ করলে সে ইথিলিন গ্যাস ছেড়ে সবাইকে জানায়। অন্য গাছেরা তখন ট্যানিন রিলিজ করতে থাকে পোকা নিধনের জন্য। আবার কেউ কেউ ফেরোমন বা সুগন্ধি ছেড়ে বার্তা দেয়। এভাবে একটা কেমিক্যাল নেটওয়ার্কও গড়ে তোলে গাছেরা পরস্পরের সঙ্গে।’

‘কিন্তু এটা তো গাছেদের মধ্যেই ঘটে, তাই না? মানুষের সঙ্গে গাছেদের কথাবার্তা কি সম্ভব?’

রকিব একটু চুপ থেকে বললেন, ‘কোনো কোনো গবেষণা আজকাল বলছে, গাছের ভাষা বোঝা অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হতেও পারে। কোনো কোনো গাছ ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল তৈরি করতে পারে। ঠিক আমাদের নার্ভ ইমপালসের মতো। এখন তুমি যদি হাইলি সেনসিটিভ অ্যাটমিক ম্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করে এই ইমপালসকে ধরতে পারো, তবে হয়তো সেটা রিড করতে পারবে। কিছুদিন আগে মনিকা গ্যাগিলানো নামের এক গবেষক দাবি করেছেন, কিছু কিছু গাছের কাছে গিয়ে তিনি অন্তত ২২০ হার্টজের সাউন্ড ওয়েভ শুনতে পেয়েছেন। রেকর্ডও করেছেন। কিন্তু তার মর্মোদ্ধার করতে পারেননি।’

‘এমন যদি হয় কেউ এই ইমপালস বা সাউন্ড ওয়েভ বুঝতে পারছে?’

রকিব হাসলেন। বললেন, ‘এখনো সম্ভব নয়। গাছের এই নীরব ভাষা বোঝার মতো এত সংবেদনশীল ম্যাগনেটোমিটার এখনো তৈরি করা যায়নি।’

কিন্তু এমনটা সত্যি ঘটেছে। জাহিদ হাসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বিষয়টা আজব হলেও সত্যি। ব্যাপারটা তাহলে খুলে বলতে হয়।

রুপারুদের গ্রামের হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা দুটোকে অবশেষে পাওয়া গেছে। রুপারু এক দিন পর খবর দিয়েছিল, দৈত্যাকৃতির বৈলামগাছ তাকে জানিয়েছে যে বাচ্চা দুটোকে জঙ্গলের উত্তর দিকে চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের পাদদেশে একটা কুটিরের মধ্যে আটকে রেখেছে চোরেরা। ওর তথ্য অনুযায়ী ফোর্স পাঠিয়েছিলেন জাহিদ হাসান। সত্যি সত্যি একটা ভাঙা কুটির থেকে হাত–পা বাঁধা অবস্থায় বাচ্চা দুটোকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চোরগুলো আগেই পালিয়ে গেছিল। তারা ভাবতেও পারেনি যে জঙ্গলের এত গভীরে পুলিশ তাদের খুঁজে পাবে।

‘তুমি কি ছেলেটাকে আমার এখানে নিয়ে আসতে পারবে?’ সব শুনে রকিব উৎসুক ভঙ্গিতে বললেন। ‘ছেলেটার ব্রেনের একটা এমআরআই করতে পারলে ভালো হতো। হি ডেফিনিটলি হ্যাভ সামথিং আনইউজুয়াল ফাংশনিং অব টেমপোরাল লোব।’

রুপারুরা অবশ্য খুবই গরিব। তার বাবা খালপাড় থেকে সাদা পাথর কুড়িয়ে এনে বিক্রি করে। মা জমিতে ছোট গোল পাহাড়ি আলু ফলায়। এই দিয়ে কোনোমতে কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে তাদের। ছেলেটা মেধাবী, তাই অনেক কষ্টে তাকে হাইস্কুলে পড়তে পাঠায় বাবা-মা। তাদের গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাহায্য–সহযোগিতা করেন অনেক। কারণ, তিনিও জানেন, এই ছেলেটা তাঁর অন্য ছাত্রদের চেয়ে অন্য রকম। সে অনেক কিছু বোঝে ও জানে।

এবার জাহিদ হাসান উঠলেন। বাচ্চাটাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। ওকে ওর বাবা–মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তারা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে।

প্রথমে একটু ভয় পেলেও পরে কিছু টাকাপয়সা দেওয়ার পর রুপারুকে জাহিদ হাসানের সঙ্গে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পাঠাতে রাজি হলেন তার বাবা–মা। রুপারুর ব্রেনের এমআরআই করা হলো। নিউরোলজিস্ট ডাক্তার আলী হায়দার এমআরআইয়ের ফিল্মে কলম দিয়ে স্পটিং করে দেখালেন—‘এই যে দেখেন টেমপোরাল লোব। এটাই আমাদের সেন্সরি পারসেপশনের মূল জায়গা। এই জায়গাটা হলো এমিগডালা। আর এটা ফিউজিফর্ম জাইরাস। এই ছেলের এ দুটো জায়গাতে নিউরনগুলো ঘন সন্নিবেশিত। জাইরিতে অনেক খাঁজ। মানে তার সেন্সরি পারসেপশন আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ভেরি স্ট্রেঞ্জ। আমি কখনো এমনটা দেখিনি।’

ডাক্তার আলী হায়দার অনেকক্ষণ রুপারুর সঙ্গে কথা বললেন। আরও কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হলো। ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি। ইইজি। এমনকি হতে পারে ওর টেমপোরাল লোব এপিলেপসি আছে? যে কারণে তার অডিটরি হ্যালুসিনেশন হয়? তার মনে হয় সে গাছের কথা শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু আসলে তেমন কিছু ঘটে না। কিন্তু ছেলেটার ব্রেনে আর কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেল না। ছেলেটাকে আর দশটা গ্রামের ছেলের মতোই ভীরু, কুণ্ঠিত আর সরল মনে হচ্ছে। এত সব পরীক্ষা–নিরীক্ষার কারণে সে একটু ঘাবড়ে গেছে।

আরও পড়ুন

‘তুমি নাকি গাছের কথা বুঝতে পারো?’

রুপারু মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। ডাক্তার আলী হায়দার আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘গাছেরা কি তোমার সঙ্গে কোনো বিশেষ গন্ধ বা শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে?’

রুপারু বড় বড় দুটি চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। কথাটা ঠিক বুঝতে পারছে না।

‘মানে জানতে চাইছিলাম গাছেরা তোমার সঙ্গে ঠিক কীভাবে কথা বলে?’

‘জানি না।’ রুপারু মৃদু স্বরে বলল।

‘তুমি কি চাইলেই তাদের সঙ্গে আলাপ জমাতে পারো?’

রুপারু দুদিকে মাথা নাড়ল, ‘না। কেবল যখন তারা কিছু বলতে চায়।’

‘কিছু শোনা যায়? মানে সাউন্ড? শব্দ? তুমি কান দিয়ে শুনতে পাও?’

এবারও মাথা নাড়ল রুপারু, ‘না।’

‘তাহলে?’ ডাক্তার আলী হায়দারের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।

‘জানি না।’

এবার জাহিদ হাসান উঠলেন। বাচ্চাটাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। ওকে ওর বাবা–মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তারা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে।

রুপারুর ব্যাপারটার কোনো মীমাংসা হলো না। রুপারুদের গ্রামের লোকজন এখনো ভয়ে ভয়ে আছে। হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা দুটোকে তো উদ্ধার করা গেছে কিন্তু নতুন করে কেউ যে হারাবে না, তার নিশ্চয়তা কী? তারা পালা করে চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের নিচে জঙ্গলের আশপাশে পাহারা বসাবে বলে ঠিক করেছে। গ্রামের বাচ্চারা খালপাড়ে, মাঠে, আমবাগানে, জঙ্গলের ধারে খেলাধুলা করে, ফুল–ফল কুড়ায়, কখন কাকে কে ধরে নিয়ে যায় কে জানে! গোত্রপ্রধান জাহিদ হাসানকে উঠানে মোড়ায় বসিয়ে বলেন, ‘আমরা দিনে, রাতে আলাদা আলাদা দল করেছি। বাচ্চাদের পাহারা দেব। এই বাচ্চাগুলো ছাড়া আমাদের আর কিছু নেই। ওরা হারিয়ে গেলে আমাদের কী হবে স্যার?’

জাহিদ হাসান উঠানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আপনাদের বাচ্চাদের কিছু হবে না। আপনি চিন্তা করবেন না।’

‘কী করে নিশ্চিন্ত থাকব স্যার?’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলেন গোত্রপ্রধান। ‘আসামি তো ধরা পড়েনি। জানি না কবে আবার এ গাঁয়ে হানা দেবে। আবার কাকে চুরি করে নিয়ে যাবে।’

দূর জঙ্গলের গহিন সবুজ আর সুউচ্চ চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়ের দিকে চেয়ে জাহিদ বললেন, ‘আর হবে না। আপনাদের শিশুদের জন্য ওখানে এক বিরাট পাহারাদার দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না।’

আরও পড়ুন