সন্তানের না, মা–বাবার স্ক্রিন টাইম নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে
একসময় মনে করা হতো, মুঠোফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল শিশু-কিশোরদের আক্রান্ত করছে। শিশুদের হাতে ফোন দেখলে অভিভাবকেরা চিন্তিত হয়ে পড়তেন। মার্কিন সমাজমনোবিজ্ঞানী জোনাথন হেইথ সতর্ক করে বলেছিলেন, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া নাকি এক ‘উদ্বিগ্ন প্রজন্ম’ তৈরি করছে। কিছু দেশ তো ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পথেও হাঁটছে।
কিন্তু উদ্বেগ কি আমরা সঠিক মানুষের জন্য করছি? বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছেন প্রবীণেরা। বহু বছর ধরে তাঁরা ছিলেন টিভির দর্শক। এখন টিভির সঙ্গে তালিকায় যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন, আইপ্যাড, ভিডিও গেমস ইত্যাদি। ফলে অবসরপ্রাপ্তরা দিনের জেগে থাকা সময়ের অর্ধেকের বেশি কাটাচ্ছেন স্ক্রিনের সামনে।
একাকিত্বের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের প্রভাব দুই দিকে। নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে স্ক্রিন একরকম সঙ্গী। কিন্তু যদি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় স্ক্রিন, তখন কী হবে?
বয়স্ক মানুষের এই ডিজিটাল রূপান্তরকে অবশ্য পুরোপুরি খারাপ বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি আশীর্বাদ। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পুরোনো বন্ধু কিংবা দূরে থাকা নাতি-নাতনিদের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। ঘরে বসেই সব কাজে বা সামাজিক দলে যোগ দেওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ থেকে শুরু করে সব সেবাই ঘরে বসে নিতে পারছেন তাঁরা। বাজারে যাওয়ার ঝামেলাও কমে গেছে। সিনেমা দেখা, গান শোনা এখন সব হাতের কাছে। এটি নিশ্চয়ই অফলাইন জীবনের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় ও আনন্দের।
তবে অনলাইন জীবনেও ঝুঁকি কম নয়। বয়স্কদের অনলাইন জগৎ কিশোরদের মতো নয়। প্রবীণেরা অনলাইনে স্ক্যাম বিষয়টা ঠিকঠাক বুঝতে পারেন না। একসময় আমাদের বাস্তব জীবনে প্রতারকেরা নিজে উপস্থিত হয়ে ঠকানোর চেষ্টা করত। এখন আর তাদের আমাদের সামনে আসতে হয় না। অনলাইনেই জালিয়াতির বুদ্ধি বের করেছে এরা। অনলাইন জালিয়াতি, ভুয়া বিনিয়োগ, প্রতারণামূলক লিংক—সবটাই এখন প্রবীণ বা বয়স্কদের বোকা বানানোর জন্য। শিশু-কিশোরেরা অনলাইনে প্রতারকদের বুঝতে পারে। শিশু-কিশোরদের রক্ষা করার জন্য মোটাদাগে ব্যবস্থা আছে। অনলাইনের যোগাযোগমাধ্যমগুলো শিশু-কিশোরদের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখে। কিন্তু বয়স্কদের আলাদা করে বাঁচানোর জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভুয়া তথ্য। প্রবীণেরা তরুণদের তুলনায় দ্বিগুণ পত্রিকা বা অনলাইনে নিউজ মাধ্যম ব্যবহার করেন। কিন্তু অনলাইন গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতি তাঁদের সংবেদনশীলতা বেশি। আগে তাঁরা হয়তো খবর দেখতেন প্রথম আলো বা বিবিসিতে। এখন অনেকেই সময় কাটান ইউটিউব বা টিকটকে। এসব মাধ্যমে তথ্যের দুনিয়াটা একদম এলোমেলো। সঠিক খবরটা বের করা কঠিন। কারণ, এতে নিয়ন্ত্রণ কম। বিভ্রান্ত করার জন্য কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একাংশ বসে আছেন। বয়স্করা এসব মাধ্যমে কোনো তথ্য দেখলে বিশ্বাস করার প্রবণতা দেখান। তাঁদের বিভ্রান্তির কারণে অন্যদের ওপর বিষয়টি প্রভাব ফেলতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভুয়া তথ্য। প্রবীণেরা তরুণদের তুলনায় দ্বিগুণ পত্রিকা বা অনলাইনে নিউজ মাধ্যম ব্যবহার করেন। কিন্তু অনলাইন গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতি তাঁদের সংবেদনশীলতা বেশি।
একাকিত্বের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের প্রভাব দুই দিকে। নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে স্ক্রিন একরকম সঙ্গী। কিন্তু যদি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় স্ক্রিন, তখন কী হবে? অনলাইনে কেনাকাটার মতো কাজগুলো করা যায়, কিন্তু পাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলা কমে যায়। আরেকটি দিক হলো, এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট। শিশু-কিশোরেরা কনটেন্টটা যে এআই দিয়ে তৈরি, সেটা সহজে ধরতে পারে, বয়স্করা সেটা সহজে পারেন না।
তাই এখন শুধু শিশু-কিশোরদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বয়স্কদের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সময় হয়েছে। পরেরবার যখন আমরা কোনো শিশুকে বলব, এখন ফোনটা রেখে দাও, তখন হয়তো সে দাদুর দিকেও তাকাবে। কারণ, দাদুও তো ফেসবুকে একটা নতুন মিম দেখে হাসছেন।