কিছু আকাশচুম্বী ভবনে কেন ১৩ তলা থাকে না

কিছু মানুষ ১৩ সংখ্যাটিকে যমের মতো ভয় পায়

লিফটে উঠে বোতাম টিপতে গিয়ে থমকে গেলে। ১২-এর পরই জ্বলজ্বল করছে ১৪! মাঝখানের ১৩ গেল কই? ওটা কি কোনো গোপন কুঠুরি? নাকি ধনকুবেররা পুরোটা নিজেদের জন্য দখল করে রেখেছে?

এর পেছনে আছে মানুষের আদিম ভয়, আধুনিক ব্যবসার প্যাঁচ ও কিছুটা রিয়েল এস্টেট আইনের কারসাজি। স্থপতিরা বলেন, দালান তৈরির সময় মানুষের মনের খবর রাখাটা খুব জরুরি। দালান তো আর শুধু ইট-পাথরের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের মনস্তত্ত্ব। তাহলে আসল ঘটনাটা কী? কেন আধুনিক সব ঝকঝকে ভবনেও এই একটা সংখ্যা গায়েব করে দেওয়া হয়?

ভয়ের নাম ১৩

কিছু মানুষ ১৩ সংখ্যাটিকে যমের মতো ভয় পায়। এই ভয় এত অদ্ভুত যে মানুষ হোটেলে ১৩ নম্বর রুমে থাকতে চায় না, লটারিতে ১৩ নম্বর টিকিট কেনে না। দাওয়াতে ১২ জন অতিথি হলে সেটা আভিজাত্য, কিন্তু ১৩ জন হলে যেন অজান্তেই শয়তানকে ডেকে আনা!

আরও পড়ুন
এই ভয়ের একটা খটমট নামও আছে—ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া। নামটা শুনলেই কেমন জাদুমন্ত্র মনে হয়, তা–ই না? কিন্তু আসলে এটা শুধুই একটা মার্কেটিং সমস্যা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন আকাশচুম্বী ভবন বা স্কাইস্ক্র্যাপার তৈরি করা শুরু হলো, দালানের মালিকেরা ভাবলেন, শুধু শুধু ঝুঁকি নেওয়ার কী দরকার? কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাড়াটিয়ারা যদি ভয়ে ১৩ তলায় ভাড়াই না নিতে চান? তার চেয়ে বরং লিফটের বোতাম থেকে ১৩ সংখ্যাটা হটিয়ে দেওয়াই ভালো। ওটিস এলিভেটর কোম্পানি ১৮৫৩ সাল থেকে লিফট বানাচ্ছে। তারা জানিয়েছে, আজও বিশ্বের বেশির ভাগ দালানের লিফটে ১৩তম তলার কোনো বোতাম থাকে না।

এই ভয়ের একটা খটমট নামও আছে—ট্রিসকাইডেকাফোবিয়া। নামটা শুনলেই কেমন জাদুমন্ত্র মনে হয়, তা–ই না? কিন্তু আসলে এটা শুধুই একটা মার্কেটিং সমস্যা। ফ্রাইডে দ্য থার্টিন বা ১৩ তারিখ শুক্রবার এলে মানুষ যেমন ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, ঠিক তেমনি ১৩ তলায় অফিস নিতে বা থাকতেও তাদের আপত্তি। যদি লোডশেডিং হয় বা ফটোকপি মেশিন জ্যাম হয়ে যায়, দোষটা গিয়ে পড়বে ওই ‘অভিশপ্ত’ সংখ্যাটার ওপর!

কবে শুরু হলো এই লুকোচুরি

গুজব আছে, শিকাগোতে তৈরি বিশ্বের প্রথম স্কাইস্ক্র্যাপার থেকেই নাকি এই ১৩ তলা বাদ দেওয়ার প্রথা চালু হয়। যদিও এর কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। তবে নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং বা ক্রাইসলার বিল্ডিংয়ের মতো পুরোনো দালানগুলোয় কিন্তু ১৩শ তলা আছে। অর্থাৎ শুরুর দিকে স্থপতিরা বোধ হয় অতটা ভীতু ছিলেন না। অথবা গুনতে ভুল করেছিলেন!

কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের দিকে মানুষের মধ্যে কুসংস্কার বেড়ে যায়। তখন থেকেই নকশা থেকে ১৩ সংখ্যাটা ঝেটে বিদায় করা শুরু হয়।

আরও পড়ুন
তবে সব সময় যে কুসংস্কারের কারণে এমনটা হয়, তা নয়। অনেক সময় বহুতল ভবনে ১০-১২ তলা পরপর মেকানিক্যাল ফ্লোর থাকে। সেখানে এসি বা পানির পাম্পের বড় বড় মেশিন বসানো হয়।

সংখ্যাটার দোষ কী

তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, বেচারা ১৩ কী দোষ করল? এর উত্তর খুঁজতে যেতে হবে অনেক পেছনে। লাস্ট সাপার বা যিশুর শেষ ভোজের ছবিতে ১৩ নম্বর অতিথি ছিল জুডাস, যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। সেই থেকে ১৩ মানেই অলক্ষুনে।

আবার নর্স মিথলজিতেও একই কাহিনি। ১২ জন দেবতার রাজকীয় ভোজে ১৩ নম্বর অতিথি হয়ে এসেছিল লোকি। তাতেই শুরু হলো দেবরাজ্যে তুমুল অশান্তি, মারা গেলেন আনন্দের দেবতা বাল্ডার।

সংখ্যাতত্ত্বও বা কম যায় কিসে! ১২ হলো একটা নিখুঁত সংখ্যা। ১২ মাসে এক বছর, ১২ জন নিয়ে রাশিচক্র, এমনকি ডজন কিনলেও ১২টাই পাওয়া যায়। ১৩ এসে সেই নিখুঁত ছন্দে তালভঙ্গ করে।

এই কুসংস্কার আমাদের সংস্কৃতিতে এমনভাবে মিশে গেছে যে হোটেল বা এয়ারলাইন্সে সবাই ১৩ এড়িয়ে চলে। যদি ১৩ তলায় অদ্ভুত কিছু ঘটে, সবাই সঙ্গে সঙ্গে ফ্লোরটাকেই দোষ দেবে। হয়তো ১৩ তলায় কোনো কোম্পানির আইটি সেকশন বসে। আইটির কোনো মানুষ যদি ভুল লিংকে ক্লিক করে কম্পিউটারে ভাইরাস ঢুকিয়ে দেয়, তাহলে দোষটা কার? আইটির মানুষটির নাকি ১৩ তলার?

আরও পড়ুন
গণিতের হিসাবে তুমি যেটাকে ১৪ তলা বলছ, মাটি থেকে গুনলে ওটাই কিন্তু ১৩শ তলা! দালান তো আর লাফ দিয়ে ১৪ তলায় ওঠে না। কিন্তু এই মিথ্যা মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়।

এখনো কি এমন হয়

হ্যাঁ, এখনো হয়। আজকের দিনে স্মার্ট লিফট ও বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি থাকলেও ডেভেলপাররা ১৩ সংখ্যাটা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে লাস ভেগাসের মতো জায়গায়, যেখানে অনেকে ভাগ্যে বেশি বিশ্বাস করে।

তবে সব সময় যে কুসংস্কারের কারণে এমনটা হয়, তা নয়। অনেক সময় বহুতল ভবনে ১০-১২ তলা পরপর মেকানিক্যাল ফ্লোর থাকে। সেখানে এসি বা পানির পাম্পের বড় বড় মেশিন বসানো হয়। অনেক ভবনে ১৩শ তলাটাই হয়তো সেই মেশিনঘর, তাই লিফটে সেটাকে ‘M’ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে হয়তো এই কুসংস্কার এতটা জেঁকে বসেনি এখনো!

ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

আসল সত্যটা কী

স্থপতি গ্লেন নোয়াক একটা মজার কথা বলেছেন। যখন কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করে, কেন দালানে ১৩ তলা নেই, তিনি হেসে বলেন, আছে তো! শুধু লেবেলটা ভিন্ন।

গণিতের হিসাবে তুমি যেটাকে ১৪ তলা বলছ, মাটি থেকে গুনলে ওটাই কিন্তু ১৩শ তলা! দালান তো আর লাফ দিয়ে ১৪ তলায় ওঠে না। কিন্তু এই মিথ্যা মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়।

এটা অনেকটা শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য জুস খেতে বলার মতো। এখানে যুক্তি খাটে না, খাটে বিশ্বাস ও স্বস্তি। ভাড়াটিয়া যাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন এবং ১৩ তারিখ শুক্রবারে মাইক্রোওয়েভ নষ্ট হলে ১৩ তলাটাকে অভিশাপ না দেন, সে জন্যই এই লুকোচুরি!

তাই ভবিষ্যতে লিফটে উঠে ১৪ তলায় নামলে মনে রেখো, তুমি আসলে সেই রহস্যময় ১৩ তলাতেই দাঁড়িয়ে আছ!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন