এক জায়গায় অনেকের সর্দি হলেও সবার হয় না কেন
ঋতু পরিবর্তনের সময় আশপাশে তাকালেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। একই আবহাওয়ায় তোমার বন্ধু দিব্যি সুস্থ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ তুমি সামান্য বাতাসে সর্দি-জ্বরে বিছানায় পড়ে আছ। টিস্যু বক্স শেষ করতে করতে ভাবছ, দোষটা কি ভাইরাসের, নাকি তোমার শরীরের?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দোষ আসলে তোমার শরীরের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার। সর্দি-কাশির প্রধান কারণ রাইনোভাইরাস। এই ভাইরাস নাকের ভেতর ঢোকার পর তোমার শরীর ঠিক কীভাবে পাল্টা জবাব দেয় বা কাউন্টার অ্যাটাক করে, তার ওপরই নির্ভর করে তুমি কতটা অসুস্থ হবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। তা প্রকাশিত হয়েছে সেল প্রেস ব্লু জার্নালে। সেখানে দেখা গেছে, ভাইরাসের শক্তির চেয়ে শরীরের প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক বেশি।
সর্দি-কাশির ভাইরাস সাধারণত অন্য প্রাণীদের খুব একটা কাবু করতে পারে না। তবে মানুষের একদম বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। তাই ইঁদুর বা গিনিপিগ দিয়ে এ গবেষণা করা সম্ভব ছিল না। সিনিয়র গবেষক এলেন ফক্সম্যান ও তাঁর দল ল্যাবে কৃত্রিমভাবে মানুষের নাকের টিস্যু তৈরি করেন।
স্টেম সেল ব্যবহার করে চার সপ্তাহ ধরে এই টিস্যু তৈরি করা হয়। এতে মানুষের শ্বাসনালির মতোই মিউকাস তৈরির কোষ ও সিলিয়া ছিল। সিলিয়া মানে ময়লা পরিষ্কার করা ছোট লোমকূপ। ল্যাবে তৈরি নাকের টিস্যু হুবহু মানুষের নাকের মতোই আচরণ করতে সক্ষম।
এই ল্যাব-মডেল ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখলেন এক দারুণ যুদ্ধ। ভাইরাস যখনই নাকে প্রবেশ করে, নাকের কোষগুলো ইন্টারফেরন নামে একধরনের প্রোটিন নিঃসরণ করে।
ইন্টারফেরন হলো যুদ্ধের সাইরেনের মতো। এটি ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং আশপাশের সুস্থ কোষগুলোকে সতর্ক করে। গবেষক বাও ওয়াং জানান, যদি এই ইন্টারফেরন ব্যবস্থা দ্রুত কাজ শুরু করে, তবে ভাইরাস ছড়াতে পারে না। ফলে তুমি হয়তো টেরই পাবে না যে ভাইরাস তোমার শরীরে ঢুকেছিল। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই ব্যবস্থা দেরিতে কাজ করে বা বাধা পায়, তবেই সর্বনাশ! ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কোষগুলোকে ধ্বংস করে এবং তুমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ো।
আমরা ভাবি ভাইরাস বুঝি আমাদের কোষ খেয়ে ফেলছে, তাই অসুস্থ লাগছে। ব্যাপারটা পুরোপুরি তা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন ভাইরাস বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে, তখন শরীরের আরেকটি সেন্সর ব্যবস্থা চালু হয়। ফলে আক্রান্ত ও সুস্থ কোষগুলো প্রচুর সর্দি তৈরি করতে শুরু করে এবং জ্বালাপোড়া হয়। শরীর ভাইরাসকে বের করে দেওয়ার জন্যই এই সর্দি তৈরি করে। আর এই প্রক্রিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই আমাদের নাক বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এত দিন ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে শুধু ভাইরাস মারার কথা ভাবা হতো। এখন বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, ভাইরাসের পেছনে না দৌড়ে শরীরের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা।
ভাইরাস কেমন, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো আমাদের শরীর তাকে কীভাবে গ্রহণ করছে। হয়তো ভবিষ্যতে এমন ওষুধ আসবে, যা ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে শরীরকে আগেই প্রস্তুত করে রাখবে। তখন সর্দি-কাশি হয়তো আর কাউকে দিনের পর দিন বিছানায় ফেলে রাখতে পারবে না।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি ডটকম