সারা সপ্তাহ সুস্থ, ছুটির দিনেই কেন অসুস্থ লাগে
সারা সপ্তাহ কাজের চাপে দিব্যি চলে যাচ্ছে, কিন্তু ছুটির দিনেই যত ঝামেলা! এমনটা কি তোমার সঙ্গেও হয়? কেন শরীর বিশ্রামের সময় বিদ্রোহ করে?
সারা সপ্তাহ পড়ালেখা বা কাজ করে যখনই ছুটির দিন আসে, তখনই শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করে। গলায় খুসখুসে কাশি, পিঠে ব্যথা, মাথাব্যথার মতো নানা রোগ যেন শরীর দখল করে নেয়। সারা সপ্তাহে যে ক্লান্তি দেখা যায়নি, তা-ই যেন চেপে বসে পাহাড়সমান হয়ে। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘুমিয়েই দিন কেটে যায়। কিন্তু কেন হয় এমন? শরীরটা কেন ঠিক ছুটির দিনেই এমন বিদ্রোহ করে বসে?
শরীরের এই বিদ্রোহের একটা নাম আছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির নাম দিয়েছেন লেজার সিকনেস। অনেকে একে লেট-ডাউন ইফেক্টও বলে। কিন্তু এটা কি আসলেই কোনো রোগ, নাকি মনের ভুল? অনলাইনে বা লোকমুখে এ নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়, কিন্তু সব সত্যি নয়। আসলে বিষয়টা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও তেমন একটা হয়নি। তাই একটুখানি বিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
‘লেজার সিকনেস’ কথাটা ২০০২ সালে প্রথম ব্যবহার করেন একদল ডাচ্ গবেষক। সহজ কথায় এর মানে হলো, যাঁরা কাজের দিনগুলোয় দিব্যি সুস্থ থাকেন, কিন্তু ছুটির দিন এলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। গবেষকেরা জরিপ চালিয়েছিলেন প্রায় ১ হাজার ৮৯৩ জন মানুষের ওপর। দেখা গেছে, এদের মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ ছুটির দিনে অসুখে ভোগেন। লক্ষণগুলোও বেশ পরিচিত। মাথাব্যথা, প্রচণ্ড ক্লান্তি, সর্দি-জ্বর, গায়ে ব্যথা ও বমি বমি ভাব। মজার ব্যাপার হলো, সাপ্তাহিক ছুটির চেয়ে টানা ছুটিতে গেলে আরও বেশি অসুস্থ হয় মানুষ। আর ছুটির প্রথম সপ্তাহেই লক্ষণগুলো দেখা দেয় সবচেয়ে বেশি।
তবে এই গবেষণার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। গবেষণাটি চালানো হয়েছিল মানুষের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। আর জানোই তো, মানুষের স্মৃতি সব সময় বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তা ছাড়া ‘মাঝেমধ্যে’ ও ‘প্রায়ই’ শব্দগুলোর মানে একেকজনের কাছে একেক রকম।
২০১৪ সালের আরেকটা গবেষণায় মাইগ্রেন নিয়ে কাজ করা হয়। ২২ জন মাইগ্রেন রোগীকে তাঁদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপের ডায়েরি লিখতে বলা হয়েছিল। ফলাফলটা ছিল চমকে দেওয়ার মতো! দেখা গেল, যেদিন তাঁদের স্ট্রেস বা চাপ কমে যাচ্ছে, ঠিক তারপরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের মাইগ্রেনের আক্রমণ হচ্ছে। অর্থাৎ সারা সপ্তাহ কাজের চাপে শরীর ঠিক ছিল, কিন্তু যে-ই চাপ কমল, অমনি মাথাব্যথা শুরু!
যেহেতু এ নিয়ে খুব গভীর গবেষণা নেই, তাই বিজ্ঞানীরা কিছু সম্ভাব্য কারণের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। প্রথমত, ছুটির দিনে অনেকেই ভ্রমণে বের হন। প্লেন, বাস বা ট্রেনে গাদাগাদি করে বসা মানেই জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি। আবার নতুন কোনো জায়গায় গেলে সেখানকার নতুন ধরনের জীবাণুর সঙ্গে আমাদের শরীর পরিচিত থাকে না। ফলে চট করে হতে পারে সংক্রমণ।
দ্বিতীয়ত, ছুটির দিনে আমরা অনেকেই অনিয়ম করি। হয়তো আগের রাতে একটু বেশি রাত জাগি বা রিলস দেখি। মানে এমন কোনো কাজ করি যা শরীর নিতে পারে না। এতে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরেকটি থিওরি হলো মনোযোগের অভাব। কাজের দিনে আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে ছোটখাটো ব্যথা বা অস্বস্তিকে পাত্তাই দিই না। কিন্তু ব্যস্ততা কমলে মস্তিষ্ক শরীরের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার সময় পায়। ফলে ঘাড়ব্যথা, মাথাব্যথা বা ক্লান্তির মতো লক্ষণগুলো তখন প্রকট হয়ে ধরা দেয়।
মানসিক চাপের সঙ্গে আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার একটা জটিল সম্পর্ক আছে। আমরা যখন চাপে থাকি, তখন আমাদের শরীর অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোন নিঃসরণ করে। দীর্ঘমেয়াদি চাপ অবশ্যই খারাপ, কারণ এতে কর্টিসলের মাত্রা সব সময় বেশি থাকে। এতে দুর্বল হয়ে যায় শরীর। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য বা তাৎক্ষণিক চাপ আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে চাঙা রাখে। এ সময় অ্যাড্রেনালিন আর কর্টিসল ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। কর্টিসলের একটা গুণ হলো, এটি ব্যথা কমায়। তাই কাজের চাপে থাকলে ব্যথা বা অসুস্থতা টের পাওয়া যায় না। সমস্যা বাধে যখন এই চাপ হুট করে কমে যায়, মানে ছুটিতে থাকলে। তখন শরীরে হরমোনের এই বাড়তি সুরক্ষা আর থাকে না। কর্টিসলের ব্যথানাশক প্রভাবটাও চলে যায়। ফলে শরীরের সব ক্লান্তি, ব্যথা আর লুকিয়ে থাকা অসুস্থতা একসঙ্গে আক্রমণ করে। একেই বলে লেট-ডাউন ইফেক্ট।
ছুটির আনন্দ যাতে মাটি না হয়, তার জন্য কিছু নিয়ম মানতে পারো। ফিনল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অসুস্থতার হার অলসদের চেয়ে অনেক কম। তাই ব্যস্ত থাকলেও শরীরচর্চা করা ভালো। কাজের চাপ যতই থাকুক, ঘুমের সঙ্গে আপস করবে না। সুষম খাবার খেতে হবে। এতে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে। হুট করে চাপ কমানোর চেয়ে চাপ সামাল দেওয়া শিখতে হবে। মেডিটেশন, মাইন্ডফুলনেস বা রিল্যাক্সেশন টেকনিক চর্চা করলে শরীর হুট করে শক খাবে না। ভিড়ের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার করতে পারো। এতে অন্তত বাইরের জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। ছুটি মানেই আনন্দ। একটু সচেতন থাকলে আর শরীরের ভাষা বুঝলে সেই আনন্দ আর বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে না!
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট