ছোটবেলার সম্পর্ক যেভাবে ঠিক করে দেয় আমাদের ভবিষ্যৎ

মা ও শিশুপ্রতীকী ছবি

পৃথিবীতে এসেই আমরা কেঁদে উঠি। তখন আমরা একদম অসহায়। ক্ষুধা লাগলে কান্না, ভয় পেলেও কান্না। আমাদের তখন আগলে রাখেন মা-বাবা বা পরিবারের বড়রা। তাঁরাই আমাদের শেখান কীভাবে নিরাপদে থাকতে হয়, কীভাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়। কিন্তু জানো কি, এই যে এখন তুমি ছোট, তোমার মা-বাবার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন, কিংবা স্কুলের বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে তুমি কীভাবে মিশছ, এর ওপরই নির্ভর করছে বড় হয়ে তুমি কেমন মানুষ হবে। তোমার বন্ধুত্ব কেমন হবে। এমনকি বড় হয়ে তোমার প্রিয় মানুষটির সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন হবে, তার বীজ কিন্তু বোনা হচ্ছে এখনই!

সম্প্রতি এই বিষয়ে বিশাল এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটির গবেষক কিলি ডুগান ও তাঁর দল ৩০ বছর ধরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিশুর ওপর নজর রেখেছেন। সেই শিশুরা যখন দোলনায় ছিল, তখন থেকে শুরু করে তাদের বয়স ৩০ হওয়া পর্যন্ত গবেষণাটি চলেছে। দীর্ঘ ৩০ বছরের এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল যা পাওয়া গেল, তা এককথায় চমকে দেওয়ার মতো।

গবেষকেরা দেখেছেন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটা জাদুর কাঠির মতো কাজ করে। যাদের ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল, ঝগড়াঝাঁটি কম হতো এবং মায়ের ওপর ভরসা করতে পারত, তারা বড় হয়ে সবার সঙ্গেই বেশ চমৎকার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে। তা সে বন্ধুই হোক, বাবা হোক কিংবা জীবনসঙ্গী।

আরও পড়ুন

যাদের মায়ের সঙ্গে বন্ডিং ভালো, বড় হয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়। তারা মানুষকে বিশ্বাস করতে ভয় পায় না। গবেষক ডুগান বলছেন, ‘জীবনের প্রথম মানুষটি (মা) যদি তোমার পাশে থাকে, তবে সারা জীবনই তুমি অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নিরাপদ বোধ করবে।’

শুধু মা-বাবা নয়, স্কুলের সেই বেস্ট ফ্রেন্ডের কথাও ভুললে চলবে না! ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন? তোমরা কি টিফিন ভাগ করে খাও? ঝগড়া হলে আবার মিলে যাও নাকি রাগ পুষে রাখো? গবেষকেরা বলছেন, ছোটবেলার বন্ধুত্ব মাঠে অনুশীলনের মতো। এখানে তুমি শিখতে পারবে কীভাবে ছাড় দিতে হয়, কীভাবে অন্যের কথা শুনতে হয়। যারা ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে শেখে, বড় হয়ে তারা বেশি সুখী হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের সম্পর্কের ধরনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেন। একটু মিলিয়ে দেখো তো তুমি বা তোমার পরিচিতরা কোন দলের। প্রথমটির নাম অ্যাটাচমেন্ট অ্যাংজাইটি। এরা সব সময় ভয়ে থাকে। ভাবে, আমার বন্ধু বুঝি আমাকে আর পছন্দ করছে না বা প্রিয় মানুষটা আমাকে ছেড়ে হয়তো চলে যাবে। এদের সব সময় আশ্বাস বা সান্ত্বনার দরকার হয়। দ্বিতীয় দলের নাম অ্যাটাচমেন্ট অ্যাভয়ডেন্স। এরা কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। মনের কথা খুলে বলে না। সাহায্য চাইতেও লজ্জা বা ভয় পায়। এরা মনে করে, সবার থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ।

আরও পড়ুন

যাদের ছোটবেলায় মা-বাবা বা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর ছিল, তারা সাধারণত এই দুই দলের বাইরে থাকে। তারা নিরাপদ থাকে। তারা সঙ্গীকে বিশ্বাস করে, নিজেও ভালো থাকে।

তোমার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, শুধু মায়ের কথা বলা হলো, বাবারা কি গুরুত্বপূর্ণ নন? অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই গবেষণার ডেটা যখন নেওয়া শুরু হয়েছিল (১৯৯১ সালে), তখন পরিবারে মায়েদের ভূমিকাটাই বেশি ছিল। বাবারা তখন বাচ্চার দেখাশোনায় আজকের দিনের মতো এতটা সময় দিতেন না। তাই এই নির্দিষ্ট গবেষণায় বাবার প্রভাবটা অতটা জোরালোভাবে আসেনি। তবে এখন দিন বদলেছে, বাবারাও এখন সেরা বন্ধু হয়ে উঠছেন।

তোমার হয়তো মনে হতে পারে, ‘ইশ! আমার তো ছোটবেলাটা অত ভালো কাটছে না, বা আম্মুর সঙ্গে তো সেদিনই ঝগড়া হলো। তাহলে কি আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার?’ একদমই না! গবেষক ডুগান অভয় দিয়ে বলেছেন, ছোটবেলার প্রভাব থাকে ঠিকই, কিন্তু ওটাই শেষ কথা নয়। তুমি মোটেও অভিশপ্ত নও। মানুষের মন কাদামাটির মতো, একে যেকোনো বয়সে বদলানো যায়।

তোমার ছোটবেলা যেমনই হোক, তুমি চাইলেই বড় হয়ে নিজেকে বদলাতে পারো। ভালো বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে, সঙ্গীকে বিশ্বাস করে বা নিজের ব্যবহার পরিবর্তন করে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। সব সময় মনে রেখো, সম্পর্ক সুন্দর করার চাবিকাঠি তোমার হাতেই আছে। শুধু একটু চেষ্টাই যথেষ্ট!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন