আধঘণ্টার স্বাধীনতা

অলংকরণ: এস এম রাকিব

​তখন ২০১৪ সাল। ক্লাস ফোরের ফার্স্ট বয় আর পেছনের বেঞ্চের ডানপিটে ছেলেটা—স্বভাব-চরিত্রে উত্তর-দক্ষিণ মেরু হলেও একটা জায়গায় এসে তাদের দুজনের পৃথিবী রোজ এক হয়ে যেত। সেটি হলো স্কুলের ওই লোহার পাতের তৈরি ঢং ঢং ঘণ্টার আওয়াজ। টিফিনের ঘণ্টা!

​গ্রামের ছায়া সুনিবিড় স্কুলের এক কোণে ছিল একটা বিশাল বটগাছ। ঘণ্টা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুলজুড়ে যেন একটি আনন্দের ঝড় বয়ে যেত। সব ক্লাস থেকে পাখির ঝাঁকের মতো বাচ্চারা কিচিরমিচির করতে করতে বেরিয়ে আসত বারান্দায়, তারপর এক দৌড়ে সেই বটতলায়।

​একজন রোজই বাড়ি থেকে মায়ের গুছিয়ে দেওয়া প্লাস্টিকের চারকোনা বাটি নিয়ে আসত। কোনো দিন তাতে থাকত ধোঁয়া ওঠা ডিম-নুডলস, কোনো দিন চিনি-পরোটা; আর অন্যজনের পকেটে থাকত মুচমুচে একমুঠো মুড়ি কিংবা বাড়ি থেকে আনা নারকেলের নাড়ু।

​সেদিন ছিল বৃষ্টির দিন। ঝুম বৃষ্টির পর চারপাশটা কেমন স্নিগ্ধ হয়ে আছে, মাঠের এক কোণে জল জমেছে। টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই বাটি খুলে দেখা গেল—মা আজ প্রিয় সুজি আর লুচি দিয়েছেন; কিন্তু অন্য বন্ধুটি সেদিন ক্লাসের এক কোণে চুপচাপ বসে ছিল। কোনো এক কারণে সেদিন তার বাড়ি থেকে টিফিন আনা হয়নি, পকেটেও নেই সেই চেনা এক টাকার আচারের পয়সা।

​সেটা চোখ এড়ায়নি প্রথমজনের। সে বন্ধুর বেঞ্চের সামনে গিয়ে বাটিটা ধপাস করে টেবিলের ওপর রাখল।

‘কিরে, আজ মাঠে যাবি না?’

অন্যজন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

‘ধুর, ভালো লাগছে না।’

​সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বাটি থেকে একটি বড় লুচি আর এক চামচ সুজি বন্ধুর খাতার ওপর রেখে দিল। বলল,

‘একা একা খেতে ভালো লাগে না। অর্ধেক তুই খা, অর্ধেক আমি। তারপর মাঠে গিয়ে কাগজের ফুটবল বানাতে হবে না?’

আরও পড়ুন

​সে প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও বন্ধুর মুখের অমলিন হাসি দেখে আর না করতে পারল না। গ্রামের স্কুলের সেই ছোট্ট টিফিনবাটির খাবারটা যখন দুজন ভাগ করে নিচ্ছিল, তখন বাইরের বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ যেন সেই বন্ধুত্বে আরও মায়াবী এক সুবাস ছড়িয়ে দিচ্ছিল। নিজের বাটির চেয়ে বন্ধুর হাতের খাবারটা কেড়েকুড়ে খাওয়ার মাঝেই তো লুকিয়ে ছিল আসল আনন্দ।

​খাবার শেষ হতে না হতেই শুরু হলো মাঠের সেই চিরচেনা যুদ্ধ। ছেঁড়া খাতার পাতা গোল করে, সুতা দিয়ে বেঁধে বানানো কাগজের ফুটবল নিয়ে কাদা-জলের মধ্যেই শুরু হলো দৌড়াদৌড়ি। জামাকাপড়ে কাদা মাখামাখি, কপালে ঘাম আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার। ঠিক যখন একজন গোল দিতে যাবে, তখনই আবার ঢং ঢং করে বেজে উঠল ক্লাস শুরুর ঘণ্টা!

​মিনিট তিরিশের সেই স্বাধীনতা যেন এক লহমায় শেষ হয়ে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে, ধুলাবালু আর কাদা মেখে আবার ক্লাসে গিয়ে বসা; আর স্যারের চশমার ওপর দিয়ে তাকানো সেই চেনা বকুনি খাওয়া—সব মিলিয়েই ছিল এক পরম পাওয়া।

​আজ এত বছর পর, পেছনের দিকে তাকালে মনে হয়, সেই ২০১৪ সালের ক্লাস ফোরের টিফিনের গল্পগুলো শুধু কিছু খাবারের গল্প ছিল না। ওগুলো ছিল একটুকরা খাঁটি শৈশব, নিখাদ বন্ধুত্ব আর আজীবন মনে রাখার মতো কিছু সোনালি বিকেল।

কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি নয়নাভিরাম অপরূপ সবুজ স্নিগ্ধ ছায়া ঘেরায় অবস্থিত সেই গ্রামের স্কুল ছেড়ে বহু দূরে বিশাল অট্টালিকার মাঝে অবস্থান করছি।

লেখক: আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিসর

আরও পড়ুন