রাগ থেকে ভালো কিছু

এআই দিয়ে তৈরি

কিশোর আলোর সঙ্গে আমার পরিচয়টা হয়েছিল একটু অদ্ভুতভাবে। অক্টোবর মাস। কিছুদিন আগে গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহ চলে এসেছি আমরা। ছোট ছিলাম, আগের স্কুলের বন্ধুদের খুব মিস করতাম। যেদিন আমি ময়মনসিংহে আমার নতুন স্কুলে ভর্তি হই, সেদিন স্বাভাবিকভাবে আমার মনটা খারাপ ছিল। তাই সেদিন রাগ করে আমি টিফিন খাইনি। আম্মুর দেওয়া টিফিনের ২০ টাকা ব্যাগে রেখে দিয়েছিলাম। স্কুল ছুটির পর দেখি, আম্মু আমাকে নিতে আসেননি। একে তো নতুন স্কুল, কাউকে চিনি না। তার ওপর আম্মু আসেননি আমাকে নিতে। তাই আমি আরও রেগে গেলাম। আম্মু অবশ্য আমাকে রিকশাভাড়া দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি ভাবলাম আমি হেঁটে বাসায় যাব। যাতে আমার দেরি হয় আর আম্মু টেনশন করেন। যেই ভাবা সেই কাজ, হেঁটে হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলাম। তখন দেখি, সবাই সবার বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে বাসায় যাচ্ছে। তখন আমার আরও খারাপ লাগল। আর আম্মুর ওপর অনেক রাগ হলো। তিনি কেন আমাকে ময়মনসিংহে নিয়ে এসেছেন (ছোট থাকায় আমার রাগ বেশি ছিল)।

আরও পড়ুন

আমি ভাবতে লাগলাম, কীভাবে সময় কাটানো যায়। আসলে আমি চাইছিলাম আরও দেরিতে বাসায় যেতে আর আম্মুর টেনশন বাড়াতে। তখন আমি রাস্তার পাশে থাকা বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। আমি আগে থেকেই বই পড়তে পছন্দ করি। কিন্তু আমার কাছে টাকা না থাকায় বই কিনতে পারছিলাম না। তখন দেখি, একটা বইয়ের ওপরে দাম লেখা ৫০ টাকা (আসলে ওটা কিশোর আলো ছিল। তখন বই আর ম্যাগাজিনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতাম না)। টিফিনে দেওয়া ২০ টাকা আর রিকশাভাড়া ৩০ টাকা মিলিয়ে ম্যাগাজিনটা কিনে ফেললাম। এভাবেই কিশোর আলোর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেদিন বাসায় যাওয়ার পর কী হয়েছিল, সেটা না বলাই ভালো। এর পর থেকে কখনো আর বাসায় দেরিতে আসিনি। তো এটা ছিল কিআর সঙ্গে পরিচয়ের ঘটনা। এখন কিশোর আলো নিয়ে ঘটে যাওয়া একটা মজার ঘটনা বলি।

নভেম্বর মাসের ১ তারিখ আমি আবার ওই বইয়ের দোকানে গিয়েছিলাম কিশোর আলো কেনার জন্য। কিন্তু দোকানে থাকা আঙ্কেল জানান, ৫ তারিখে কিশোর আলো আসবে। তখন ভাবলাম, বাবাকে বললে তিনিই আমাকে কিশোর আলো এনে দেবেন। তাই আমি বাবাকে বললাম কিশোর আলো নিয়ে আসতে। তখন বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কিশোর আলো দিয়ে আমি কী করব। আমি মজা করে বলেছিলাম, একটা এক্সপেরিমেন্টের জন্য লাগবে। বাবা পরদিন অফিস থেকে খালি হাতে ফিরলেন। যখন বাবাকে কিশোর আলোর কথা জিজ্ঞেস করলাম, বাবা বললেন, তিনি নাকি বাজারে অনেক খোঁজাখুঁজি করে কিশোর আলো পাননি। তখন আমি জেদ করা শুরু করলাম, আমার কালকেই লাগবে। বাবা পরদিন আবার বাজার থেকে ফিরে এসে বললেন, কিশোর আলোর সময় নাকি এখন না, ওটা শুধু শীতে পাওয়া যায়। কিন্তু আমি জানতাম কিশোর আলো মাসিক ম্যাগাজিন। তাই আমি বাবার কথায় কান না দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলাম। তখন বাবা বলেছিলেন, তিনি পরের দিন এনে দেবেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই আমি আম্মুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজেই কিশোর আলো কিনে আনলাম। সেদিন রাতে বাবাও কিশোর আলো নিয়ে এলেন। কিন্তু ওটা ‘কিশোর আলো’ ছিল না, ছিল ‘কেশর আলু’। বাবার কাণ্ড দেখে তো আমি হাসতে হাসতে শেষ। তখন আমি আমার ব্যাগ থেকে কিশোর আলো বের করে বাবাকে দেখালাম। তখন বাবাও বুঝতে পারলেন যে আমি ‘কেশর আলু’ নয়, ‘কিশোর আলো’র কথা বলেছিলাম।

আরও পড়ুন

আরেক দিন আমি আর আমার এক বন্ধু কিআ নিয়ে কথা বলছিলাম। ওর আর আমার বন্ধুত্ব কিশোর আলোর মাধ্যমে হয়েছিল। আমার বন্ধু আর আমি মিলে কিশোর আলোতে পাঠানোর জন্য একটা চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু পরে আর সেটা পাঠানো হয়নি। তো আমরা কিশোর আলোকে সংক্ষেপে কিআ বলে সম্মোধন করছিলাম। যা আমার আরেক বন্ধু বুঝতে পারেনি। সে আমার আম্মুর কাছে বিচার দিয়েছিল যে আমি ‘কেয়া’ নামের একটা মেয়েকে চিঠি লিখেছি। যা শুনে আম্মু প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে যখন আম্মুকে ঘটনা খুলে বলি, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমার ওই বন্ধু খুব লজ্জা পেয়েছিল। পরে সে কখনো আমার আম্মুর সামনে যায়নি। এই দুই ঘটনাই ছিল শুরুর দিকে।

এখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। কিশোর আলোও কিশোর হয়ে গেছে, সঙ্গে আমিও। এই অক্টোবরে কিশোর আলোর ১২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। কিন্তু আমার এখনো মনে হয়, সেদিনই তো কিশোর আলো পড়া শুরু করলাম। আর এর মধ্যে এতগুলো বছর কেটে গেল! ময়মনসিংহে আসার পর কিশোর আলোই আমার প্রথম বন্ধু ছিল। যার মাধ্যমে আমি আরও অনেক বন্ধু খুঁজে পেয়েছি। অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেলেও কিশোর আলো এখনো আমার বন্ধুই আছে। এখনো কিশোর আলো পড়লে আমি সাহস পাই, আনন্দ পাই। এখন মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, সেদিন আম্মু স্কুলে আমাকে না নিতে এসে ভালোই করেছিলেন। আম্মুর জন্যই আমি আমার প্রিয় বন্ধুর দেখা পেয়েছিলাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, কিআ।

এতগুলো বছর আমাকে খুশি রাখার জন্য, আমার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য। তুমিই আমার জীবনের সেরা বন্ধু, যার কথা আমি আজীবন মনে রাখব। আজ তোমার জন্যই আমি বলতে পারি, ‘আমার পৃথিবী অনেক বড়।’

শুভ জন্মদিন, কিআ। এভাবে এগিয়ে যাও তোমার লক্ষ্যে।

লেখক: শিক্ষার্থী, অষ্টম শ্রেণি, মুকুল নিকেতন উচ্চবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

আরও পড়ুন