কিশোর আলোর তুমুল তেরো
ভেবে বের করো তো, কিশোর আলোর সঙ্গে তোমার প্রথম পরিচয় কবে হয়েছিল? নিশ্চিতভাবেই সেটা ২০১৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে এখন পর্যন্ত সময়ের কোনো এক দিনে। স্কুল থেকে ফেরার পথে পত্রিকার দোকানে কিআর নতুন সংখ্যা দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলে। প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছিল, কিনে ফেলেছিলে। কিংবা পরিবারের কেউ পড়ার জন্য এনে দিয়েছিল। প্রথমে হয়তো শুধু ছবি দেখেছিলে। পরে গল্প পড়তে পড়তে কিশোর আলো কখন যে তোমার পরিচিত হয়ে উঠেছে, তুমি নিজেও টের পাওনি। আবার এমনও হতে পারে, কিশোর আলোর প্রথম সংখ্যা যখন বের হয়, তখন তুমি পৃথিবীতেই আসোনি। আজ তুমি কিআ পড়ছ, আর কিআর বয়স ১৩ বছর।
একটি পত্রিকার জন্য ১৩ বছর কম সময় নয়। এই সময়ে কিশোর আলোর সঙ্গে বড় হয়েছে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। কেউ স্কুল পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে, কেউ চাকরি শুরু করেছে, কেউ দেশের বাইরে গেছে। কেউ লেখক হয়েছে, কেউ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, গবেষক কিংবা উদ্যোক্তা। কেউ আবার এখনো নিজের পছন্দের কাজটা খুঁজছে। তাদের সবার অভিজ্ঞতা এক নয়, কিন্তু কৈশোরের কোনো না কোনো জায়গায় কিশোর আলো থেকে গেছে।
২০১৩ সালের অক্টোবরের সেই শুরু থেকে কিশোর আলো শুধু একটি মাসিক পত্রিকা হয়ে থাকেনি। প্রতি মাসে নতুন সংখ্যা বের হয়েছে, নতুন গল্প এসেছে, নতুন লেখক এসেছে, নতুন ছবি ও কমিকস এসেছে। আর সেই সঙ্গে কিআর পাঠকেরাও একটু একটু করে বড় হয়েছে। যে পাঠক একসময় পত্রিকার পাতায় নিজের নাম ছাপা হয়েছে কি না, সেটা খুঁজে দেখত, সে-ই পরে হয়তো নিজে লেখক হয়েছে। যে পাঠক কিআড্ডায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকত, সে হয়তো পরে মঞ্চে উঠে গান গেয়েছে, কবিতা পড়েছে বা নিজের গল্প বলেছে। কেউ কিআর স্বেচ্ছাসেবক হয়েছে, কেউ কোনো আয়োজনের পেছনে কাজ করেছে।
কিশোর আলোর সঙ্গে পাঠকের এই সম্পর্কটা অন্য রকম। এখানে চিঠি লেখা যায়, নিজের লেখা পাঠানো যায়, আঁকা ছবি পাঠানো যায়, বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নেওয়া যায়। কিআর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে চিঠি লিখে পাঠক সরাসরি কথাও বলতে পারে। কিআর পাতার বাইরে আছে কিশোর আলো ডটকম, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম। ফলে কিশোর আলোর সঙ্গে যোগাযোগের জায়গাটাও এখন আগের চেয়ে অনেক বড়।
কিআর সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা পুরোনো পাঠকদের গল্পগুলোও কম নয়। কোনো একসময় যে ছেলেটি কিআর পাতা ওলটাতে ওলটাতে ভাবত, ‘ইশ্, আমার লেখাও যদি এখানে ছাপা হতো!’ সে হয়তো এখন নিজেই লেখে। কোনো কিশোর কিআড্ডায় এসে প্রথমবার কোনো কার্টুনিস্টের সঙ্গে কথা বলেছিল, সে হয়তো এখন নিজেই ছবি আঁকে। কেউ কিআর অনুষ্ঠান করতে করতে শিখেছে কীভাবে একটি আয়োজন পরিকল্পনা করতে হয়, মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। আবার কেউ হয়তো এসবের কোনোটাই করেনি। শুধু কিআ পড়েছে। সেটাও কম কিছু নয়। একটি ভালো গল্প পড়া, নতুন কোনো বিষয় নিয়ে ভাবা কিংবা অচেনা কারও জীবনের কথা জানা—এসবও তো বড় হয়ে ওঠার অংশ।
কিশোর আলোর কাজের একটা জায়গা এখানেই। পাঠকের পৃথিবীটাকে একটু বড় করে দেওয়া। ‘আমার পৃথিবী অনেক বড়’ কিশোর আলোর এই স্লোগান তাই শুধু একটি বাক্যে আটকে নেই। বই, গল্প, বিজ্ঞান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি আর নানা মানুষের গল্পের মধ্য দিয়ে কিশোর আলো পাঠকদের পরিচিত জগতের বাইরে তাকানোর সুযোগ করে দিতে চায়।
কিআড্ডার কথাও আলাদা করে বলতে হয়। প্রথমবার আসার আগে হয়তো মনে হয়, এখানে গিয়ে কাকে চিনব? কিন্তু অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, পাশে বসা মানুষটিও কিআ পড়ে। তারও প্রিয় লেখক আছে, তারও কোনো গল্প ভালো লেগেছে, তারও কোনো কমিকস পছন্দ। কথা বলতে বলতে অচেনা মানুষ বন্ধু হয়ে যায়। কিআড্ডায় কেউ প্রথমবার মাইক্রোফোন হাতে নেয়, কেউ নিজের লেখা পড়ে শোনায়, কেউ গান গায়, কেউ প্রশ্ন করে। আবার কেউ কিছুই করে না। চুপচাপ বসে অনুষ্ঠান দেখে। ঢাকার বাইরে থাকা পাঠকদের জন্য অনলাইনেও কিআড্ডার আয়োজন হয়েছে। ফলে দূরত্বটাও অনেকটা কমে এসেছে।
এই ১৩ বছরে কিআর পাতায় কত মানুষের গল্প যে এসেছে! কেউ গল্প লিখেছে, কেউ কবিতা, কেউ রহস্যের জগতে নিয়ে গেছে, কেউ বিজ্ঞানকে সহজ করে বুঝিয়েছে, কেউ কমিকস এঁকেছে, কেউ নিজের জীবনের গল্প বলেছে। এভারেস্টজয়ী ইকরামুল হাসান শাকিলের এভারেস্ট অভিযানের গল্পও প্রকাশিত হয়েছে কিশোর আলোতে। কিআড্ডায় এসে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন পাঠকদের।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে পদক পাওয়া কিশোর-কিশোরী, রোবট বানানো শিক্ষার্থী, বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা তরুণ, খেলাধুলায় সাফল্য পাওয়া কিশোরী কিংবা নিজের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করা পাঠকদের গল্পও বলেছে কিআ। কারণ, কিশোর আলোর কাছে বড় হওয়া মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়া নয়। নিজের ভালো লাগার কাজ খুঁজে পাওয়া, চেষ্টা করে যাওয়া, অন্যের পাশে দাঁড়ানো, নিজের ভুল থেকে শেখাও বড় হয়ে ওঠার অংশ। ১৩ বছরে কিশোর আলোর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই পাঠকদের সঙ্গে এই দীর্ঘ সম্পর্ক।
কিশোর আলোও এই ১৩ বছরে বদলেছে। একসময় মাসে একবার তোমাদের হাতে পৌঁছাত কিআ। এখন কিশোর আলো ডটকমে প্রতিদিন নতুন লেখা প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন স্কুল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে কিআ যুক্ত হয়। বিজ্ঞান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বই, প্রযুক্তি, কত রকম বিষয় নিয়ে অনলাইনে লেখা প্রকাশিত হয়। পৃথিবী বদলেছে, তোমাদের পড়ার অভ্যাস বদলেছে, নতুন নতুন মাধ্যম এসেছে। কিন্তু এত কিছুর পরও কিআর লেখা পাঠকেরা পড়ছে।
১ অক্টোবর কিআর জন্মদিন। আজ প্রথম আলোর ১০ তলার সভাকক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান হবে। নিবন্ধিত পাঠকদের কেউ আসবে কিআর পুরোনো বন্ধু হয়ে, কেউ নতুন পাঠক হয়ে। কেউ হয়তো অনেক বছর পর কিআর কোনো অনুষ্ঠানে আসবে, কেউ হয়তো প্রথমবার। থাকবে গান, গল্প, আড্ডা, হাসি আর শুভেচ্ছা। জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে অবশ্য সবাইকে নিয়ে আসা যাচ্ছে না। সবাই মিলে কেক কাটা হবে।
তোমার হয়তো মনে হতে পারে, ১৩ বছর অনেক লম্বা সময়। পত্রিকার জন্য এটা দীর্ঘ সময় হলেও বাস্তবে ১৩ বছর অনেকের জীবনেই হুট করে চলে যায়। সময় কত দ্রুত যায়, সেটা তো জানোই। যে পাঠক একসময় স্কুলের ব্যাগে কিআ নিয়ে ঘুরত, আজ সে হয়তো অফিসের ব্যাগ নিয়ে ছুটছে। যে কিআড্ডায় বসে অন্যদের বড় হওয়ার গল্প শুনত, সে হয়তো আজ নিজের জীবনের গল্প অন্যদের বলছে। আর যে ছোট্ট পাঠকটি আজ কিআর নতুন সংখ্যা হাতে নিয়ে বসেছে, কয়েক বছর পর সেও হয়তো এই লেখাটা পড়ে ভাববে, ‘আমিও তো একসময় কিআ পড়তাম!’
এভাবে ১৩ বছর ধরে কিশোর আলো তোমাদের সঙ্গে আছে। এই দীর্ঘ পথচলায় কিআর সঙ্গে থাকার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ!
