ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা, সেটাও আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে বড় রোমাঞ্চকর ম্যাচ কমই আছে। বিশ্বের দুই পরাশক্তি মুখোমুখি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। কিন্তু এই ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা ম্যাচকে কেন্দ্র করেই রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক এক অধ্যায়। যেখানে ফেয়ার-প্লের নিয়মকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এক কাণ্ড ঘটিয়েছিল আর্জেন্টিনা, যা এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে ‘হোলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি’ নামে।
ব্রাজিল আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে মাত্র চারবার। ৭৪, ৭৮ ও ৮২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তাদের দেখা হয়েছিল। কিন্তু ৯০ বিশ্বকাপে তাদের দেখা হয়েছিল শেষ ষোলোতে। নকআউট পর্বের সেই লড়াইয়ে মুখোমুখিও হয়েছিল ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। ব্রাজিল তখন ফর্মের তুঙ্গে—কারেরা, রোমারিও, বেবেতোর মতো দুর্দান্ত খেলোয়াড় ব্রাজিলের মূল একাদশে। অন্যদিকে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনাকে একা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন ম্যারাডোনা। পুরো বিশ্ব তাকিয়ে ছিল সেদিন সেই ম্যাচের দিকে।
ইতালির তুরিনে রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে মুখোমুখি দুই দল। শুরু থেকেই ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে শুরু করে ব্রাজিল। কিন্তু সবকিছু বদলে যায় ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে এসে। ব্রাজিলের মিডফিল্ডার রিকার্ডো রোচা ফাউল করেন আর্জেন্টিনার পেদ্রো ট্রগলিওকে। মাঠে প্রবেশ করেন ফিজিও। এমন সময় ব্রাজিলিয়ান রাইট-ব্যাক ব্র্যাঙ্কো ফিজিওর কাছ থেকে পানি চান। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা যে জায়গা থেকে পানি নিচ্ছেন, সেখান থেকে না নিয়ে আলাদা একটি সবুজ বোতল এগিয়ে দেন তাঁর দিকে। ব্র্যাঙ্কো সেখান থেকে পানি পান করেন। এর পর থেকেই ব্র্যাঙ্কো দাবি করেন পানি পানের পর থেকেই তাঁর মাথা ঘোরানো শুরু করে। মাঠের মধ্যেই তাঁর ঘুম ঘুম ভাব আসতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত ব্র্যাঙ্কোর পাশ দিয়েই ম্যাচের একমাত্র গোল করেন ক্লদিও ক্যানেজিয়া। ম্যারাডোনার দুর্দান্ত এক পাস থেকে গোলরক্ষককে কাটিয়ে গোল করেন ক্যানেজিয়া। সেই একমাত্র গোলেই ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টারে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের পর থেকেই এই বিষয় নিয়ে বারবার অভিযোগ করে গিয়েছেন ব্র্যাঙ্কো। কিন্তু কোথাও কোনো সুবিচার পাওয়া দূরে থাক, তাঁর কথাকে পাত্তাই দেয়নি কেউ। কিন্তু ২০০৫ সালে, সেই ঘটনার প্রায় ১৫ বছর পর এক বোমা ফাটান ডিয়েগো ম্যারাডোনা। টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনা হেসেখেলেই স্বীকার করেন যে সেই বোতলে আসলে ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল। ম্যারাডোনা মজা করে বলেছিলেন, ব্র্যাঙ্কোকে যখন সেই পানির বোতল দেওয়া হয়েছিল, তখন ম্যারাডোনা নিজেও নাকি দলের অন্য খেলোয়াড়দের চিৎকার করে বলছিলেন যেন কেউ ভুল করে ওই বোতলের পানি না পান করে। যদিও তৎকালীন আর্জেন্টাইন কোচ কার্লোস বিলার্দো আজীবন অস্বীকার করে এসেছিলেন এই অভিযোগ।
এই ঘটনার পর তোলা অভিযোগ স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ফুটবল বিশ্বকে। বিশেষ করে ম্যারাডোনা অকপটে স্বীকার করে নেওয়ার পর তো অভিযোগ ওঠে পুরো দলের সততা নিয়ে। ব্র্যাঙ্কো পরে বলেছিলেন, ‘সেদিন আমার সঙ্গে যা করা হয়েছিল তার অনেক বড় শাস্তি হওয়া উচিত ছিল।’ ফিফা সরাসরি সেই অভিযোগে ব্যবস্থা না নিলেও মানুষের মনে এখনো দাগ কেটে আছে সেই ‘হোলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি’।