মিসরের গোলটি বাতিল হলো কেন, ফুটবলের রুলবুক কী বলছে
আর্জেন্টিনা গোল করলে লিওনেল স্কালোনিকে খুব একটা আবেগ প্রকাশ করতে দেখা যায় না। পাথুরে মুখে খেলোয়াড়দের উদ্যাপন দেখেন, পাশে থাকা পাবলো আইমারের সঙ্গে দু-একটা কথা বলেন, তারপর হাতে তুলে নেন পানির বোতল। কিন্তু মিসরের বিপক্ষে ম্যাচটা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম।
লিওনেল মেসি যখন সমতাসূচক গোল করলেন, রীতিমতো লাফিয়ে উঠলেন স্কালোনি। দীর্ঘক্ষণ উদ্যাপন করলেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি; আবেগে বারবার গলা ধরে আসছিল।
এই ম্যাচে নাটকীয়তার কোনো অভাব ছিল না। প্রায় হেরে যাওয়া আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে, আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন লিওনেল মেসি। তিনি একাই টেনে তুলেছেন তাঁর দেশকে। কিন্তু এসবের আগে ঘটে গেছে বহু ঘটনা, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছে বিতর্ক।
ভিআর প্রটোকল-এর নীতি কী
ম্যাচের ৫৯তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়ে মোস্তফা জিকো আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠান। মিসর যখন উদ্যাপনে ব্যস্ত, তখন রেফারি ভিএআর-এর সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। এরপর মনিটরে রিপ্লে দেখে গোল বাতিল করে দেন। কারণ, আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় মিসরের একজন খেলোয়াড় আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারকে ফাউল করেছিলেন।
কিন্তু এই নিয়ম কীভাবে কাজ করে?
কোনো দল গোল করলে ভিএআর পুরো অ্যাটাকিং পসেশন ফেজ (এপিপি) অর্থাৎ, যে আক্রমণ থেকে গোল হয়েছে, সেই পুরো আক্রমণপর্ব পর্যালোচনা করে। এই সময়ে আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় আইন ভঙ্গ করে থাকলে, এমনকি সেটা গোল হওয়ার ৩০–৪০ সেকেন্ড আগে ঘটনা হলেও গোল বাতিল হতে পারে।
এ ধরনের আইন ভঙ্গের মধ্যে থাকতে পারে ডিফেন্ডারকে ধাক্কা দেওয়া বা ফাউল করা। অফসাইড অবস্থান থেকে আক্রমণ গড়ে তোলা। হ্যান্ডবল করে গোল করা বা গোলের সুযোগ তৈরি করা।
মিসরের বাতিল হওয়া গোলের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। বল প্রথমে ছিল লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিয়ন্ত্রণে। মিসরের খেলোয়াড় তাঁর কাছ থেকে বল কেড়ে নেন। কিন্তু রিপ্লেতে দেখা যায়, কাজটা তিনি ফাউলের মাধ্যমেই করেছেন। এরপর শুরু হয় দ্রুত এক কাউন্টার অ্যাটাক। পুরো আক্রমণজুড়ে আর্জেন্টিনার আর কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শই করতে পারেননি। অর্থাৎ, গোল হওয়ার আগে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সেই ফাউল। তাই ভিএআর প্রটকল-এর নীতির ভিত্তিতেই গোল বাতিল করা হয়েছে।
এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ভিএআর চালুর পর থেকে এমন সিদ্ধান্ত বহুবার দেখা গেছে। এবারের বিশ্বকাপেই জার্মানি–প্যারাগুয়ে ম্যাচে জোনাথান তাহ অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক একটি গোল করেছিলেন। কিন্তু ভিএআর কর্নার থেকে গড়ে ওঠা পুরো আক্রমণ পর্যালোচনা করে দেখে, আক্রমণের শুরুতে জার্মানির একজন খেলোয়াড় ফাউল করেছিলেন। ভিএআর প্রটকল-এর নীতি অনুযায়ী গোল বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত জার্মানি টুর্নামেন্ট থেকেই বিদায় নেয়।
শুধু বিশ্বকাপই নয়, ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতেও এমন ঘটনা নিয়মিত দেখা যায়। লা লিগা কিংবা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একটু খুঁজলেই অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে। যেমন এই মৌসুমে চেলসি–ফুলহাম ম্যাচে জস কিংয়ের গোলও ভিএআর-এর সহায়তায় বাতিল করা হয়েছিল। রিপ্লেতে দেখা যায়, গোল হওয়ার আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার প্রাথমিক পর্যায়ে রদ্রিগো মুনোজ ট্রেভর চালোবাহকে ফাউল করেছিলেন। ফলে এপিপি নীতি অনুসারে গোলটি বাতিল করা হয়।
সালাহকে কি ফাউল করেছেলিনে আলভারেজ
ম্যাচের দ্বিতীয় বিতর্কিত মুহূর্তটি ছিল মোহাম্মদ সালাহকে ঘিরে।
ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে বল নিয়ে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি। ঠিক তখনই সামনে এসে ট্যাকল করেন হুলিয়ান আলভারেজ। সালাহ পড়ে যান, আর আর্জেন্টিনা সঙ্গে সঙ্গে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল করে। প্রশ্ন ওঠে—লিসান্দ্রোর ঘটনায় যদি ফাউল ধরা হয়, তাহলে এখানে কেন নয়?
এর উত্তরও ফুটবলের রুলবুকের মধ্যেই রয়েছে।
‘যদি ডিফেন্ডার প্রথমে নিয়ম মেনে বল ক্লিয়ার করেন এবং পরবর্তী ট্যাকল স্বাভাবিক হয়, তাহলে সেটা সাধারণত ফাউল হিসেবে গণ্য করা হয় না।’
রিপ্লেতে দেখা যায়, হুলিয়ান আলভারেজের বুট প্রথমে সরাসরি বলে লাগে। এরপর নিজের গতির কারণেই সালাহ এসে আলভারেজের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। তাই রেফারি এটিকে বৈধ ট্যাকল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
তবে এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। ‘আগে বলে লাগলে ফাউল হবে না’—এমন কোনো লিখিত আইন কিন্তু নেই। এমন পরিস্থিতিতে রেফারিকে আরও দেখতে হয় যে ট্যাকল বেপরোয়া ছিল কি না, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, কিংবা প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে কি না। তাই আগে বল স্পর্শের পর ট্যাকল বিপজ্জনক হলে সেটা ফাউলও হতে পারে। কিন্তু হুলিয়ান আলভারেজের ট্যাকলের ক্ষেত্রে এমন কোনো উপাদান ছিল না।
বিতর্ক থাকবেই, কারণ ফুটবল এমনই। ভিএআর চালুর পর থেকে এমন বিতর্ক আরও বেড়েছে। ক্লাব ফুটবলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই অফসাইড, পেনাল্টি কিংবা ফাউল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। একই ঘটনার ব্যাখ্যায় ভিন্ন ভিন্ন রেফারি ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়ায় বিতর্কেরও শেষ থাকে না। আর এমনটা যদি বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে ঘটে, তাহলে সেই বিতর্ক আগুনে ঘি ঢালার মতোই ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচের এই দুটি সিদ্ধান্তই আইএফএবি-এর বর্তমান নীতি এবং ভিএআর প্রটকল-এর আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি কী ছিল, সেটি বোঝাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য বাস্তবতা হলো, ফুটবল বিতর্কে নিয়মের বই সব সময় শেষ কথা হয়ে ওঠে না। অনেক সমর্থক নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করেন। তাই একই ঘটনা একজনের কাছে নিখুঁত সিদ্ধান্ত, অন্যজনের কাছে স্পষ্ট অন্যায়। আর সেখান থেকেই ফুটবলের চিরন্তন বিতর্কের জন্ম।