লুকা মদরিচ: যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফুটবলের অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টর
যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সার্বীয় বাহিনীর আক্রমণে বিধ্বস্ত হচ্ছিল একের পর এক গ্রাম।
১৯৯১ সালের ডিসেম্বর। সবে শুরু হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধ। ক্রোয়েশিয়ার জাদার শহরের কাছে ছোট্ট গ্রাম জাটন। সেই গ্রামে ছয় বছরের লুকা মদরিচ খেলছিলেন তাঁর বাড়ির উঠোনে, পাশেই বসে দারুণ সব গল্প বলছেন তাঁর দাদু লুকা মদরিচ সিনিয়র। তাঁর নামেই রাখা হয়েছে আদরের নাতির নাম। হঠাৎ তাঁদের গ্রামে আক্রমণ করল সার্বিয়ার সৈন্যরা। একটু পর চোখের সামনে নিজ বাড়ির সেই উঠোনেই গুলি করে হত্যা করল লুকা মদরিচের প্রিয় দাদু লুকা মদরিচ সিনিয়রকে। একমুহূর্তে চেনা পৃথিবীটা বদলে গেল ছয় বছরের ছোট্ট লুকার।
এর ঠিক ছয় বছর আগে ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে এই ছোট্ট শান্ত শহরে জন্ম হয়েছিল লুকা মদরিচ জুনিয়রের। সুখেই ছিল তাঁর পরিবার। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সেই সবকিছু শুধুই স্মৃতি।
সার্বিয়ার মিলিটারিরা পুড়িয়ে দিয়ে গেল জাটনের সব ঘরবাড়ি। শেষে প্রাণ বাঁচাতে মদরিচ পরিবার পালিয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয় জাদার শহরে। ছোট হোটেল কোলোভারের সরু এক কক্ষে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে বিদ্যুৎ কখনো থাকত, কখনো থাকত না। খাবারের টানাটানি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, আর রাতে ঘুমাতে যেতে হতো বোমা পড়ার আতঙ্ক নিয়ে। এই হোটেল কোলোভারেই কেটে গেল শিশুটির শৈশবের সাতটি বছর।
কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ছোট্ট লুকা হাতছাড়া করেনি একটা জিনিস—ফুটবল। হোটেলের পার্কিং লটে, রাস্তার ধারে, এমনকি মাঝেমধ্যে সেনাবাহিনীর তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়েও বল নিয়ে খেলতেন লুকা। যুদ্ধের বিভীষিকা যখন চারপাশে, তখন ফুটবলই ছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র আনন্দের উৎস।
বোমা বা সাইরেনের শব্দ শুনলে সবাই যখন বাংকারে পালাত, লুকার পায়ে তখনো ফুটবল, হোটেলের ভাঙা পার্কিং লটে দিনরাত এক করে শুধু ফুটবলই খেলতেন তিনি। লুকার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে দামি বুট বা বল কিনে দেওয়া সম্ভব ছিল না। লুকার বাবা কাঠের টুকরা দিয়ে লুকার জন্য বানিয়ে দিতেন শিন-গার্ড। কিন্তু এত কিছুর পরও যুদ্ধের ধকল সামলে লুকার শরীর খেলোয়াড়সুলভ বড় হতে পারল না। অতিরিক্ত রোগা আর খাটো হওয়ার কারণে কোনো ক্লাব তাঁকে নিতে চায় না। সবাই বলে, যতই ভালো খেলুক, এ ছেলে খেলায় টিকবে না। এত দুর্বল ছেলে দিয়ে ফুটবল হবে না। কিন্তু লুকার ভেতরে এক অদম্য জেদ। সব বাধা পায়ে ঠেলে শেষমেশ লুকা যোগ দিলেন স্থানীয় ক্লাব জাদারে। সেখান থেকে তাঁর ওপর নজর পড়ে ক্রোয়েশিয়ার অন্যতম সেরা ক্লাব দিনামো জাগ্রেবের।
কিশোর বয়সেই লুকা পাড়ি জমান দিনামো জাগরেবের একাডেমিতে। সেখানেও তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে নিজের শারীরিক গঠনের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে। বহুবার হতাশ হয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। একবার তাঁকে খেলতে পাঠানো হয় বসনিয়ার ক্লাব জ্রিনস্কি মোস্তারে। সেখান থেকেই শুরু হয় লুকার উত্থান। তাঁর খেলার ধরন, নিখুঁত পাসিং, মাঠের প্রতিটি কোণ দেখার ক্ষমতা, আর ক্লান্তিহীন দৌড় নজর কাড়ে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর। ২০০৮ সালে তিনি যোগ দেন ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে।
টটেনহ্যামে বেশ কয়েক মৌসুম দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১২ সালে লুকা পাড়ি জমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায় শুরু হয় মদ্রিচ-মহাকাব্যের এক নতুন অধ্যায়।
কখনো কোনো অর্কেস্ট্রা দেখেছ?
যেখানে ৫০ বা তারও অধিক শিল্পী একসঙ্গে বাজাচ্ছেন—কেউ বেহালা, কেউ বাঁশি, কেউ পিয়ানো। কিন্তু সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেন একজন মানুষ। তিনি নিজে কিছু বাজাচ্ছেন না। কিন্তু তাঁর এক ইশারায় বদলে যায় পুরো সুর। এই মানুষকেই কন্ডাক্টর বলে।
একটি মিউজিক অর্কেস্ট্রায় যেমন কন্ডাক্টর ইশারায় সব বাদ্যযন্ত্রের সুর ও তাল নিয়ন্ত্রণ করেন, ফুটবল মাঠে লুকা মদরিচও ঠিক তা–ই করেন। আর এ কারণেই লুকা মদরিচকে বলা হয় ফুটবল অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টর।
লুকা গোল করার জন্য বিখ্যাত হননি। তিনি বিখ্যাত অন্যদের দিয়ে গোল করানোর জন্য। তাঁর ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যেও শান্ত মাথায় বল ধরে রাখার ক্ষমতা এবং নিখুঁত টাইমিংয়ের পাস—সবকিছু মিলিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন মাঠের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরিচালক। মদ্রিচের খেলা মন দিয়ে লক্ষ করলে দেখবে, তিনি কখনোই তাড়াহুড়ো করেন না। বল পায়ে আসার আগেই তিনি জানেন পরের তিনটি পদক্ষেপ কী হবে। এই ‘প্রি-স্ক্যানিং’ ক্ষমতাই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। লুকা মদরিচের ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে বাড়ানো পাসগুলো এতটাই নিখুঁত যে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ স্রেফ বোকা বনে যায়। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বহু ফাইনালে দেখা গেছে, দল যখনই চাপে থাকে, তখন মদরিচ নিজের পায়ে বল রেখে দলকে ব্রিদিং স্পেস করে দিয়েছেন। এটাকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় ‘টেম্পো কন্ট্রোল’ আর এই ফুটবলীয় জাদুতে বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকজনই আছে লুকার সমকক্ষ।
লুকা মদরিচের ক্যারিয়ারের সোনালি চূড়া আসে ২০১৮ সালে। তাঁর জাদুকরি নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়ার মতো ছোট একটি দেশ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়। যদিও রানার্সআপ হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু পুরো বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন লুকা। সেই বছরই লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ১০ বছরের একচ্ছত্র রাজত্ব ভেঙে লুকা মদরিচ জিতে নেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মাননা ‘ব্যালন ডি’অর’। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন ছয়টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য ট্রফি।
মাঠে মদরিচকে খুব কমই চিৎকার করতে দেখা যায়। তিনি আলোচনার কেন্দ্র হতে চান না। অহংকারীও নন। কাউকে অবজ্ঞা করেন না। তবু তাঁর নেতৃত্ব সবার চোখে পড়ে। কঠিন সময়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন ঢাল হয়ে। অন্যদের চেয়ে একটু বেশি লড়াই করেন লুকা। একটু বেশি দায়িত্ব নেয়। একজন নেতার তো এটাই সবচেয়ে বড় গুণ। লুকার বয়স এখন ৪০ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু মাঠে নামলে মাঝমাঠ থেকে রক্ষণ, আবার রক্ষণ থেকে আক্রমণ ছুটে বেড়ান ২০ বছরের তরুণের মতো, সে যেন এক ক্লান্তিহীন যোদ্ধা। ২০২৬ বিশ্বকাপে লুকা মদরিচ তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতি টানছেন।
জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে হেরেও লুকার মুখে ছিল এক অমলিন হাসি। কোনো অভিযোগ নয়, কোনো অভিনয় নয়, লুকা মদরিচের হৃদয়ের পুরোটাজুড়েই ফুটবলের প্রতি নিবেদন। লুকা মদরিচ প্রমাণ করেছেন, জীবনের শুরুটা নয়, শেষ পর্যন্ত তুমি কী হয়ে উঠলে, সেটাই আসল পরিচয়। যুদ্ধ তাঁর শৈশব কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। যদিও বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস লাগে, আর সেই স্বপ্নকে সত্যি করতে লাগে প্রতিদিনের পরিশ্রম। লুকা মদরিচ সেটা করে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন, জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, কখনো হাল ছাড়তে নেই। তিনি কেবল কিংবদন্তি ফুটবলারই নন; তিনি আশা, ধৈর্য আর হার না-মানা মানুষের প্রতীক।