অজিরা কি এখন চিনতে পারছেন মিরাজ–হাসানদের

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেন মিরাজশামসুল হক

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট ম্যাচের আগের দিন অজি এক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নিজের পডকাস্টে বলছিলেন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নাম জানার কোনো প্রয়োজনীয়তা আমি দেখছি না। তাঁরা হয়তো তাঁদের সর্বোচ্চটা দেবেন, কিন্তু অজিরা সেটাকে দেড় দিনেই টপকে ফেলবে। আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলার অর্থ একটাই, ফ্রিতে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট পাওয়া। সেই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নিশ্চয়ই এখন বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের ভালো করে চেনেন। অস্ট্রেলিয়াকে যে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দল।

অজিদের জন্য বাংলাদেশ সিরিজটা আসলে মুফতে পয়েন্ট পাওয়ার মতোই ছিল। ভাবুন তো, যে দলটা পৃথিবীর আর কোনো দলকে পাত্তাই দেয় না ঘরের মাটিতে, সেই দলটা কেন বাংলাদেশকে নিয়ে ভাববে? কোনো প্রশ্নই তো আসে না। যে কারণে ২০২৭ সালের টেস্ট সিরিজকে এগিয়ে এনেছিল আগস্টে। কারণ, এই সময়ে অজিরা নিজেদের মাটিতে খেলে না বললেই চলে। অজিদের ক্রিকেটিং সেশন শুরুই হয় গ্রীষ্মে। বাংলাদেশকে তাই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ডারউইনে, যেখানে অজিরা শেষ খেলেছিল ২০০৪ সালে।

বাংলাদেশ টেস্টকে ঘিরে অজিদের মনোভাবই ছিল অবহেলার। তাই তো সিরিজ এগিয়ে আনা, নিজেদের সেরা মাঠগুলোকে বাদ দিয়ে খেলা, সবকিছুতেই যেন ফুটে উঠেছিল অজিদের স্বেচ্ছাচারিতা। ২০০৮ সালে শেষবার অজিদের মাঠে খেলেছিল বাংলাদেশ, টেস্ট খেলেছিল তারও পাঁচ বছর আগে, ২০০৩ সালে। সেটাও এই ডারউইনের মাঠেই। কারণ একটাই, অজিদের কাছে এই সিরিজটা শুধুই একটু গা ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ। সেই সঙ্গে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের জায়গাটা পাকাপোক্ত করার। সে কারণেই অস্ট্রেলিয়া নেমেছিল নিজেদের সর্বশক্তির দল নিয়ে। আর সেটাই হয়ে রইল কাল।

আরও পড়ুন

নাজমুল হাসান শান্তর অধীন বাংলাদেশের টেস্টের গ্রাফটা ওপরের দিকে উঠছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। কিন্তু জিম্বাবুয়ের কাছে বাজেভাবে হারার পর যেন খোদ বাংলাদেশি ভক্তরাও আশা উঠিয়ে নিয়েছিলেন দলের ওপর থেকে। আর প্রতিপক্ষ যখন অস্ট্রেলিয়া, তখন তো আশা করাই বৃথা। বাংলাদেশের লড়াইটা তাই শুধু অজিদের বিপক্ষে নয়, ছিল নিজেদের প্রমাণ করার। সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগেই চোট হানা দিল দলে। নাহিদ রানা ছিটকে পড়লেন সিরিজ থেকে। যে ফাস্ট বোলারের ওপর ভরসা করে একটু প্রতিরোধের স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ, সেটাও উবে গেল মুহূর্তেই। এরপরের চিত্রায়ণ বদলে গেল মাঠে নামার পরপরই।

৬ উইকেট নিয়েছেন যে বল দিয়ে, মাঠ ছাড়ার সময় সেই বলটা দেখাচ্ছেন হাসান মাহমুদ
প্রথম আলো

প্রথম ইনিংসের বাংলাদেশকে ঠিক কোনো ছকেই ফেলা যায় না। কোনো শব্দেই ব্যাখ্যা করা যায় না। অস্ট্রেলিয়া দল যেন নিজেদের খুঁজেই পায়নি পুরো ইনিংসে। ৫৩ ওভারে ১৯৮ রান। এর মধ্যে আউট হয়ে গেছে সবাই। একমাত্র প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন স্টিভেন স্মিথ। ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেন, ক্যামেরন গ্রিন শুধু এসেছেন আর ফিরে গিয়েছেন। স্মিথের ক্যাচটা যদি ইনিংসের শুরুতে হাতে আটকা পড়ত, রানটা হয়তো দেড় শও পেরোতে না। চা–বিরতি শেষ হতেই অজিদের ইনিংসের সমাপ্তি টানা হয়ে গিয়েছিল হাসান মাহমুদের তাণ্ডবে। দারুণ লাইন–লেন্থ বজায় রেখে ১৭ ওভারে হাসান তুলে নিয়েছেন ৬ উইকেট।

বাংলাদেশের সামনে তখন চ্যালেঞ্জ চাপ সামলে নিজেদের খেলাটা খেলার। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের বড় একটা অংশই তো চাপ সামলাতে না পারার ঘটনা দিয়ে ভরা। ব্যাটাররা চাপ সামলে ভালোই খেললেন। সেই দিনের বাকি ২৪ ওভারে বাংলাদেশ হারালো মাত্র ১ উইকেট, ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ তখন বাংলাদেশের কাছেই।

বিজ্ঞজনেরা বলেন, টেস্ট ক্রিকেট হলো জীবনের মতো। লম্বা সময় ধরে ধৈর্য ধরে যারা টিকে থাকতে পারে, তারাই ভালো করতে পারে। তার প্রমাণ তানজিদ হাসান তামিম। টি-টুয়েন্টি আর ওয়ানডের মার মার কাট কাট খেলা যেমন খেলতে সিদ্ধহস্ত, তেমনই টেস্ট ক্রিকেট এসে প্রমাণ দিলেন ধৈর্যের। এক মুহূর্তের জন্যও যেন মনোযোগ হারাননি বলের ওপর থেকে। যার প্রতিদান পেলেন ইনিংস শেষে। নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি, সেটাও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে। তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হলো ৪২৬ রানে। ৩০৮ রানে ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশের ব্যাটাররা বোলারদের নিয়েও যোগ করেছে ১২০ রান। অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্সরা যত লাইন–লেন্থ মেনে বল করেছেন, বাংলাদেশি ব্যাটাররা তত বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল করেও কোনো দিশা খুঁজে পাননি অজি বোলাররা। ২২৮ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ যখন ইনিংস শেষ করে, তখন অজি ভক্তদের দিশাহারা অবস্থা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম। অজি ভক্তরা তুলাধুনা করছেন নিজেদের খেলোয়াড়দেরই। এমন হতশ্রী পারফরম্যান্স উপহার দেবে দল, তা ভাবেনি কেউ। কেউ কেউ তো বাংলাদেশের ২০০+ রানের লিডকে তুলনা করেছেন অজিদের ক্রিকেটের ‘মৃত্যু’ হিসেবে।

আরও পড়ুন

কিন্তু দলটা তো অস্ট্রেলিয়া, ম্যাচে ফিরতে যাদের লাগবে মাত্র একটা সেশন। বাংলাদেশকে যদি একবার টপকে যেতে পারে পরের ইনিংসে, তবেই কেল্লা ফতে। কিন্তু প্রথম ইনিংসে যেমন তাণ্ডব চালিয়েছিলেন পেসাররা, দ্বিতীয় ইনিংসে সেই দায়িত্ব তুলে নিলেন স্পিনাররা। মেহেদী হাসান মিরাজ নিলেন ৫ উইকেট। হাসান মাহমুদ এই ইনিংসেও তুলে নিলেন ৩ উইকেট। প্রথম ইনিংসে দাঁড়িয়েছিলেন স্মিথ, পরের ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন। কিন্তু সেটা শুধু ইনিংস ব্যবধানের লজ্জা এড়ানোর জন্যই যথেষ্ট ছিল। ২৮৪ রানে অল আউট হওয়া অজিরা বাংলাদেশের জন্য টার্গেট রাখল ৫৭ রানের।

দাপটের সঙ্গে খেলেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ
শামসুল হক

আর সেটা মাত্র ১ উইকেট হারিয়েই তুলে নিলেন সাদমান ইসলাম আর মুমিনুল হক। বাউ ওয়েবস্টারের বলে মুমিনুলের চার নিশ্চিত করে দিল বাংলাদেশের জয়। অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ টেস্ট পাঁচ দিনে গড়াবে না তা জানত সবাই। কিন্তু পাশার দান বদলে যাবে এভাবে, তা ভাবেনি কেউ। ডারউইনের মাঠে সাবেক খেলোয়াড়, ভিআইপি গেস্টদের জন্য প্রিমিয়াম লাউঞ্জ বলে একটা জায়গা আছে। যেখান থেকে পুরো ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। সেটাও টেস্টের চতুর্থ দিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, সেখানে যথেষ্ট দর্শক আসবেন না। খোদ বাংলাদেশি দর্শক বাদে চতুর্থ দিন বাংলাদেশের জয় দেখার জন্য উপস্থিত ছিলেন না কেউই।

কিন্তু মাঠে কেউ থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের জয়ের প্রতিধ্বনি পৌঁছে গেছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। ৩১ বছর পর ভারত ছাড়া এশিয়ার কোনো দলের কাছে হারল অজিরা। খোদ নিউজিল্যান্ড ১১ বছর ধরে পারছে না অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে, ইংল্যান্ড তো অ্যাশেজ জয়ের কথা ভুলেই গিয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত আর ইংল্যান্ড ছাড়া শেষ ১০ বছরে যে দল ঘরের মাঠে অপরাজিত, সেই দলটাই হেরে গিয়েছে বাংলাদেশের কাছে। অস্ট্রেলিয়া ‘আপসেট’ বলে নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারবে হয়তো, কিন্তু বাংলাদেশ বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে ঠিকঠাক। পরেরবার হয়তো অফ সিজনে ডারউইনে নয়, বাংলাদেশের ডাক পরবে মেলবোর্নের ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামেই।

আরও পড়ুন