ক্রিকেটের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হতে হলে কী করতে হবে

পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজের জন্য প্রয়োজন নিবিড় মনোযোগ

তোমরা সবাই হয়তো টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখো। ব্যাটসম্যান, বোলার কিংবা ফিল্ডারদের কাজ কী, সেটিও বোঝো। ক্রিকেটারদের জন্য কোচদের ভূমিকার কথাও জানা আছে নিশ্চয়ই। আধুনিক ক্রিকেটে তো সব বিভাগের জন্যই আলাদা কোচ থাকেন। যেমন ব্যাটসম্যানদের জন্য ব্যাটিং কোচ, বোলারদের জন্য বোলিং কোচ, ফিল্ডারদের জন্য ফিল্ডিং কোচ। এমনকি স্পিন বা পেস বোলারদের জন্য আলাদা কোচ তো বটেই, দৌড়ে রান নেওয়ার কৌশল শেখানোর জন্যও আলাদা কোচ থাকেন এখন। কিন্তু এর বাইরেও কিন্তু এখনকার ক্রিকেট দলগুলোয় একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র থাকেন—পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট।

আগস্ট মাসেই যে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে টেস্ট জিতল, সেখানেও একজন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট ছিলেন। সাধারণত বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফে বিদেশি কোচই থাকেন বেশি, কিন্তু ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হিসেবে ছিলেন শাওন জাহান নামের এক বাংলাদেশি। তাঁর কাছেই আমরা জানতে চেয়েছিলাম ক্রিকেটে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টদের আসলে কাজ কী, তাঁরা কীভাবে ক্রিকেট দলকে সাহায্য করেন, এই পেশায় আসতে চাইলে কী করতে হবে।

শাওন জাহান

পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট কারা

‘অ্যানালিস্ট’ শব্দটি শুনেই বুঝতে পারার কথা কাজটা আসলে বিশ্লেষণের। ল্যাপটপে নির্দিষ্ট কিছু সফটওয়্যার থাকে, আর থাকে ডেটা ও ভিডিও। এসব বিশ্লেষণ করে দলের পরিকল্পনা কেমন হবে, তা সাজিয়ে দেওয়াই মূলত একজন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টের কাজ।

শুরুর দিকে এই কাজটাকে বলা হতো ভিডিও অ্যানালাইসিস। এই শতাব্দীর শুরুর দিকেও প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। শুধু ভিডিও নিয়ে বিশ্লেষণ করে দলকে তা জানাতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে অ্যানালিস্টদের কাজের পরিধি বেড়েছে। মাঝে ডেটা অ্যানালিস্ট থেকে এখন এই কাজটার নাম হয়েছে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট।

প্রতিপক্ষ দলের ক্রিকেটারদের ব্যাটিং কিংবা বোলিংয়ের পুরোনো ভিডিও বিশ্লেষণ করে তাদের শক্তি বা দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হয় অ্যানালিস্টকে। কতজন ডানহাতি খেলবেন, কতজন বাঁহাতি, কতজন স্পিনার, কতজন পেসার—তাদের মুখোমুখি হলে দল কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে, সেটা মোকাবিলা করার জন্য সম্ভাব্য উপায়গুলো কী কী, সে সম্পর্কে দলকে বিস্তারিত ধারণা দিতে হয় পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টদের।

আরও পড়ুন

যে মাঠে খেলা হবে ওখানকার আবহাওয়া কেমন থাকত পারে, যে পিচে খেলা হবে সেটির আচরণ কেমন, পেসাররা বেশি সুবিধা পাবেন নাকি স্পিনাররা, বাতাস কোন দিকে বেশি হবে, বাতাসের প্রভাব কেমন হবে, মাঠের কোন দিকে শট খেললে রান করা সহজ হবে—এসব ধারণাও পায় দল অ্যানালিস্টের কাছ থেকে।

শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজের দলের খেলোয়াড়দের দিকেও নজর রাখেন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্টরা। কোন ক্রিকেটার কী ধরনের সমস্যায় ভুগছেন, তা নজর রাখা, ওই সমস্যা সমাধান করার উপায় কেমন হতে পারে, এ নিয়েও তিনি পরামর্শ দেন। এখন তোমরা ভাবতে পারো, সব যদি তিনিই করে দেন তাহলে কোচের কাজ কী?

এখানে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। অ্যানালিস্ট মূলত পরামর্শ দেন। আসল কাজটা কোচের তত্ত্বাবধানে করেন ক্রিকেটাররাই। এ নিয়েই বাংলাদেশ জাতীয় দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট শাওন বলছিলেন, ‘পরিকল্পনা একটা জিনিস, আর বাস্তবায়ন অন্য। অবশ্যই বেশির ভাগটা নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর, আর সেটা ক্রিকেটাররা মাঠে করেন। কিন্তু আমরা তাঁদের আগেই একটা আভাস দেওয়ার চেষ্টা করি এ রকম চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। সহজ করে বললে, আমরা বলে দিই যে এ ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, সেটার জন্য যেন প্রস্তুত থাকতে হবে।’

শাওন জাহান ও শান্ত

প্রতিদিন কী ধরনের কাজ করতে হয়

ক্রিকেট ম্যাচ যে টিভিতে দেখানো হয়, প্রতিটা বলই দেখেন অ্যানালিস্টরা। শুধু দেখলেই কাজ শেষ হয় না। বলটা কি সুইং করে ভেতরে ঢুকল নাকি বের হয়ে গেল, কোথায় পিচ করল, ব্যাটসম্যান কোন দিকে খেললেন—প্রতিটা বলে এমন অন্তত ১০০টি তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়। তারপর সেখান থেকে বাছাই করে ১৫-২০টি ভবিষ্যতের জন্য সফটওয়্যারে আপলোড করে রাখেন তাঁরা।

দুটি বলের মাঝখানে কয়েক সেকেন্ডের বিরতির মধ্যেই এই কাজগুলো করতে হয়। জাতীয় দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট শাওন আমাদের বলছিলেন, ‘প্রতিটা বল আমাদের অনেক খুঁটিয়ে দেখতে হয়। এ জন্য অনেক সূক্ষ্ম জিনিস ধরা পড়ে। আমরা তা কোচ এবং সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে জানাই। খেলোয়াড়েরাও প্রশ্ন নিয়ে আমাদের কাছে আসে, এটা-ওটা জানতে চায়। আমরা তাদের সম্ভাব্য সমাধান কেমন হতে পারে তা বলি, পরে তারাই সিদ্ধান্ত নেয় কী করবে।’

তোমরা জানলে হয়তো একটু অবাকই হবে, প্রায় এক কোটি বলের ডেটা আছে শাওন জাহানের কাছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই সম্প্রচার হওয়া ম্যাচের ডেটা মুহূর্তের মধ্যেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাঁর কাছে চলে আসে। সেসব থেকেই একজন নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের বিপক্ষে যখন বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়, তখন তিনি তাঁর বিপক্ষে কেমন পরিকল্পনা নেওয়া উচিত, তা দলের সামনে উপস্থাপন করেন।

আরও পড়ুন

শাওন জাহান কীভাবে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হলেন

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা—২০১৮ সালে নারীদের এশিয়া কাপ জয় ও ডারউইন টেস্ট, দুটিতেই দলের সঙ্গী ছিলেন শাওন। পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হিসেবে তাঁর শুরুটা ছিল ২০১২ সালে। ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে তখনো নিয়মিত খেলছেন।

অ্যানালিস্টের ভূমিকায় তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে ছিলেন শুধু দুজন। তাঁদের একজন নাসির আহমেদ নাসু। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম অ্যানালিস্ট। শাওনও প্রস্তাব পেয়েছিলেন তাঁর কাছ থেকেই।

ওই গল্পটাও শোনালেন শাওন, ‘তখন যাঁরা ক্রিকেট খেলতেন, তাঁরা পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগ দিতে পারতেন না। এখন এটা অনেক বেড়েছে, ক্রিকেটাররা পড়াশোনা নিয়ে সচেতন। আমাদের কাজে খেলার ব্যাকগ্রাউন্ড ও পড়াশোনা দুটিই দরকার। ওই জায়গা থেকেই আমাকে প্রস্তাব করা হয়েছিল।’

ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি স্নাতক, স্নাতকোত্তরের পর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করা শাওন সেই প্রস্তাব পেয়েও শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে থাকার আগ্রহ থেকেই তিনি রাজি হন। প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। এরপর যোগ দেন ছেলেদের দলে। মাঝে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দুজন বিদেশিকে নিয়োগ দিলেও কয়েক বছর ধরে আস্থা রাখছে চাঁদপুরের শাওনের ওপর।

অস্ট্রেলিয়া সিরিজ জয়ের পর ক্রিকেটারদের সঙ্গে শাওন জাহান (মাঝে)

ডারউইনে সেই রূপকথার গল্প

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে টেস্টে বাংলাদেশের জয়টা তোমরা অনেকেই টিভিতে দেখেছ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এটা রূপকথার মতোই একটা গল্প। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বাংলাদেশ তাদের হারিয়ে দেবে—এটা খুব বেশি লোকের বিশ্বাস ছিল না।

শাওন ছিলেন ব্যতিক্রম একজন, ‘আমি কিন্তু আমার স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলাম যে আমরা এই সিরিজের দুটি ম্যাচের অন্তত একটাতে জিতব। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেনকেও বলেছিলাম যে আমরা জিততে পারি। কী কী কারণে জিততে পারি, সেটিও বলেছিলাম।’

ক্রিকেটের কারণগুলো বিস্তারিত তিনি বলেননি। তবে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে তাঁর এই ধারণা তৈরি হয়েছিল তথ্য বিশ্লেষণ করেই। ডারউইনে বাংলাদেশ পৌঁছে গিয়েছিল ১৩ দিন আগে। তখনো অস্ট্রেলিয়া দলও পৌঁছায়নি। সেখানকার যে রকম আবহাওয়া ছিল, বাংলাদেশকে সেটিও বাড়তি সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করেন শাওন।

অস্ট্রেলিয়ার বাকি অঞ্চলে তখন তীব্র শীত থাকলেও ডারউইনে ছিল গরম। বাংলাদেশই সেখানে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল বেশি। বাকি কাজটা মাঠে ক্রিকেটাররাই করে দেখিয়েছেন। পুরোটা সময়ই ইতিবাচক শরীরী ভাষা নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ীই লড়াই করেছিল বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

তুমিও কি হতে পারবে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট

কারা হতে পারবেন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট—শাওনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তবে কিছু অনলাইন কোর্স করলে প্রাথমিক একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার খেলাটাকে খুব ভালোভাবে অনুসরণ করা। প্রতিটা বলের পরই খুঁটিনাটি সবকিছুই খেয়াল করতে হবে।

তবে এসবের বাইরেও শাওন বললেন সবচেয়ে জরুরি হলো পড়াশোনা করা, ‘এখানে অনেক সফটওয়্যার চালাতে হবে, অনেক কঠিন সময় আসবে, যেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য পড়াশোনাটা খুব দরকার। পাশাপাশি টিভিতেও যখন খেলা দেখবে, তখনো খেয়াল করতে হবে কীভাবে একজন ক্রিকেটার পরিকল্পনা সাজান; তিনি কেন এই শট খেললেন, এ রকম বল করলেন।’

এর সঙ্গে পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হওয়ার জন্য দরকার হবে ধৈর্যের। কারণ, দিনের পর দিন প্রায় একই ধরনের কাজ করে যেতে হবে। একই রকম মনোযোগ দিয়ে প্রতিটা বল দেখতে হবে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।

প্রতিটি সিরিজের আগে নতুন নতুন ক্রিকেটাররা প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির হবে, তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। কাজটা কিন্তু সহজ নয়। কোনো কোনো দিন ২০ ঘণ্টাও কাজ করতে হয় এ জন্য। তোমার যদি তেমন ধৈর্য থাকে আর ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ; চেষ্টা করে দেখতে পারো।

আরও পড়ুন