লিওনেল মেসি: লাল কার্ড দিয়ে শুরু, লেজার শোতে শেষ
আকাশি-সাদা জার্সির সঙ্গে লিওনেল মেসির সম্পর্কটা অম্ল-মধুর। আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল ১৩ বছর বয়সেই। এরপর বড় হয়েছেন স্পেনে, বার্সেলোনায়। থাকা-খাওয়া, বেড়ে ওঠা পুরোটাই স্পেনের মাটিতে। স্প্যানিশ বয়সভিত্তিক দলের কোচরাও তাই নজরে নজরে রাখছিলেন তাঁকে। মেসিকে স্পেনের দলে নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল অনেক, লাভ হয়নি। বাবার প্রচেষ্টাতে যেমন রোজারিও ছেড়ে বার্সেলোনার প্লেনে উঠতে পেরেছিলেন মেসি, তেমনি আর্জেন্টিনা দলের কোচের কাছে মেসির খেলার ভিডিও টেপ পৌঁছে দিয়েছিলেন হোর্হে মেসি। স্প্যানিশদের পাশ কাটিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন লিও। আর সেই ফিরে আসার গল্প শুরু হয়েছিল ৪৭ সেকেন্ডে লাল কার্ড দেখে! হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকেই লাল কার্ড দেখেছিলেন মেসি।
আমরা লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটাকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখতে পারি। প্রথম ভাগে ছিল সম্ভাবনা। দীর্ঘদিন ট্রফি না জেতা আর্জেন্টিনার মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল মেসিকে ঘিরে। দুর্দান্ত প্রতিভাবান মেসি যখন এসেছেন, এবার নিশ্চয়ই কাটবে ট্রফির খরা। কিন্তু ইউরোপিয়ান লিগ সবকিছু জয় করা মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে জিততে পারেননি কোনো ট্রফি। বারবার হতাশ হয়েছেন সমর্থকেরা। হতাশা ঘিরে ধরেছিল মেসিকেও। বারবার তাঁর ওপর ভরসা করে বিশ্বকাপে পা রেখেছে আর্জেন্টিনা। ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন ম্লান। গোল পাননি। ২০১৪ বিশ্বকাপে একক দক্ষতায় ফাইনালে তুলেছেন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। মেসিকে বিদ্ধ হতে হয়েছে সমালোচনায়। কটু কথা শোনাতেও পিছপা হননি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও। মেসির মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নেই, জাতীয় দলের জার্সিতে এলেই পুরোপুরি ব্যর্থ—এমন অনেক কথা সুচের মতো খুঁচিয়েছে মেসিকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে ১৫ ও ১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল—বারবার মেসি ব্যর্থ মনোরথে শুধু বাড়ির পথ ধরেছেন। ২০১৬ ফাইনালের পর হতাশায় ঘোষণা দিয়ে ফেললেন অবসরের। এ নিয়েও সমালোচনা-ট্রল কম হয়নি।
সবকিছুর জবাব দিতেই হয়তো অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে আবার ফিরে আসেন মেসি। সেটাকেই ধরা যায় তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ভাগ। এটাকে মেসির জীবন বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত বললেও বোধ হয় কম বলা হবে। কয়েক মাসের বিরতি নিয়ে ফিরলেন ভিন্ন এক মেসি। ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সুযোগ পাওয়ারই কথা ছিল না। হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া দলটাকে মেসি তুললেন বিশ্বকাপে। কিন্তু বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে নক আউট পর্বেই হাতছাড়া হয়ে গেল স্বপ্ন। মেসি হাল ছাড়লেন না। এর মধ্যে আশীর্বাদ হয়ে এলেন লিওনেল স্কালোনি। মেসিকে ছাড়া প্রথম কয়েক মাস দলটাকে সাজালেন নিজের মতো। ফলাফল? সাফল্য আছড়ে পড়ল আর্জেন্টিনার কাঁধে। ২০২১ কোপা আমেরিকা দিয়ে শিরোপা খরা ঘোচালেন মেসি। আন্তর্জাতিক শিরোপার যে খোঁটা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন, সেটাই ঝেড়ে ফেললেন কাঁধ থেকে।
বাকি গল্প সিনেমার গল্পের মতো। মেসি পেয়েছেন এমন কিছু খেলোয়াড়, যাঁরা তাঁর জন্য জীবন দিয়ে দিতেও প্রস্তুত। মাঠে তো কোনো কথাই নেই। ২০২২ বিশ্বকাপটা তাই আর্জেন্টাইন ভক্তদের কাছে স্বপ্নের থেকেও বেশি কিছু। কাতারের বিশ্বকাপটা লিওনেল মেসি নিজের করে নিলেন। ৭ ম্যাচে ৭ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট—গোল্ডেন বলের জন্য এর থেকে যোগ্য ছিল না কেউ। ফ্রান্সকে হারিয়ে পেলেন নিজের পরম আরাধ্য, বিশ্বকাপ শিরোপা। মারিও কেম্পেস, ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে নিজের নামটা লিখে রাখলেন আজীবনের মতো। দুই দশকের ক্যারিয়ার পূর্ণতা পেল সেদিন।
মেসি চাইলে সেদিনই বুটজোড়া তুলে রাখতে পারতেন। বলেছিলেনও, তাঁর জীবনে পাওয়ার আর কিছু নেই। তবু মেসি খেলেছেন, ২০২২ বিশ্বকাপের পর কোপা আমেরিকা জিতেছেন আরেকবার, জিতেছেন ফিনালেসিমাও। তবু মেসি আরেকবার চেষ্টা করলেন, আমেরিকার মাটিতে আরেকটি বিশ্বকাপ ছিনিয়ে আনার। চেষ্টা করেছিলেন সর্বোচ্চ। ৮ ম্যাচে ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট করে আবারও একক প্রচেষ্টায় দলকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে। কিন্তু তিরে এসে এবার আর তরী ভেড়াতে পারলেন না। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে থমকে গেল আর্জেন্টিনা। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা মেসি পেরোতে পারলেন না ফাইনালের বাধা।
তাতে অবশ্য মেসির আক্ষেপ থাকার কথা নয়। দুই বিশ্বকাপে রানার্সআপ, এক বিশ্বকাপে শিরোপা। সঙ্গে দুটি কোপা আমেরিকা। ২৮ বছর ধরে বিশ্বকাপের স্বপ্নকে সত্যিতে পরিণত করা। মেসির ক্যারিয়ার রূপকথার মতোই।
তাই তো বিশ্বকাপের পর যখন তিন পাতার লেখায় অবসরের ঘোষণা দিলেন, অবাক হননি কেউ। মেসি তো যা জেতার সবকিছু জিতেই ফেলেছেন। শেষ দিনেও যেভাবে বলের পেছনে ছুটেছেন, তিন গোলের তিনটিতেই যেভাবে অবদান রেখেছেন, তাতে তাঁকে শেষ বলা সম্ভব নয় কারও। তবু থামতে তো হয় কখনো না কখনো। মেসিও তাই থামলেন।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটা কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তদের চোখে যেমন পানি এনেছে, তেমনি স্বস্তির নিশ্বাসও ফেলেছেন সবাই। কিংবদন্তির বিদায় মনের মতো না হলে অস্বস্তিতে ভোগেন ভক্তরা। মেসির ক্ষেত্রে তা হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এমন বিদায় পাওয়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের স্বপ্ন। মেসিকে পুরো রোজারিও মিলে উপহার দিয়েছে সেটাই। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে পুরো দেশ থেকে বিশ্ব ছিল মেসিময়। এমন বিদায় তো কিংবদন্তিদের জন্যই। মেসি যেন তাদেরও আরেক ধাপ ওপরে।