ভিনদেশি খেলা সেপাক টাকরাও
সেপাক টাকরাও। ভিনদেশি এই খেলা কিছুটা ভলিবলের মতো। কিন্তু ভলিবল খেলতে হয় হাত দিয়ে আর সেপাক টাকরাওয়ের বেলায় পা প্রযোজ্য। কেননা পুরো খেলাটি পা দিয়ে খেলতে হয়। অল্প দিনেই নীলফামারীর সৈয়দপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে সফলতা দেখিয়েছে এই খেলায়। নারী জাতীয় দলের হয়ে বিদেশেও খেলতে গেছে তারা।
সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালিপুর ইউনিয়ন। শহর থেকে বেশ দূরে বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়। স্কুলটির ৩০ জন ছেলেমেয়ে নিয়মিত অনুশীলন করে সেপাক টাকরাও খেলার। ১১ জানুয়ারি সকালে বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে দেখা গেল, খেলোয়াড়েরা অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গায়ে জার্সি। নানা রকম ব্যায়ামেও অংশ নিতে দেখা যায় তাদের। ঘণ্টাখানেক অনুশীলন। এরপর খেলায় অংশ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েরা সম্মিলিত হয়ে খেলাটি শুরু করে। কখনো চারজনের দল আবার কখনো তিনজনের। পা দিয়ে তুমুল ভলিখেলা। অনুশীলন পরিচালনা করছিলেন জাতীয় সেপাক টাকরাও দলের কোচ ববি রায়। তিনি একাধারে সৈয়দপুরের ছেলে ও মেয়ে দুই দলেরই কোচ। ২০২২ সাল থেকে সেপাক টাকরাও দলে যুক্ত আছেন তিনি।
ববি রায় জানান, সেপাক টাকরাওয়ের উৎপত্তি মালয়েশিয়ায়। পরে খেলাটি থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও চীনেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও ৩০টি জেলায় সেপাক টাকরাওয়ের আঞ্চলিক দল রয়েছে। দিন দিন খেলাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
নতুন দল হিসেবে বেশ ভালো সাফল্য ছিল আমাদের। ওই দলের সদস্য ববি রায়ের দুর্দান্ত খেলা দেখে খুশি হন বাংলাদেশ সেপাক টাকরাও অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক ঢালী।
ববি রায় বলেন, ‘২০২২ সালে বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আবদুস সালামের হাত ধরে সৈয়দপুরে সেপাক টাকরাও যাত্রা শুরু করে। আমি প্রথম ওই দলের সদস্য হয়ে খেলা শুরু করি। আমার সঙ্গে বাঙালিপুর স্কুলের অনেক ছেলেমেয়ে খেলাটিতে যুক্ত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইরিন আক্তার। সে বর্তমানে জাতীয় দলে খেলছে। জাতীয় পুরুষ দলে স্থান করে নিয়েছে রাব্বি মন্ডল। আমি সৈয়দপুরের মেয়ে, তাই সৈয়দপুর দলটি ভালো করুক, সে প্রত্যাশা সব সময় থাকে। আমি এরই মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে নেপাল ও থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক খেলায় অংশ নিয়েছি। বর্তমানে আমি বাংলাদেশ নারী সেপাক টাকরাও দলের কোচ হিসেবে কাজ করছি। গত অক্টোবরে ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জাতীয় সেপাক টাকরাও প্রতিযোগিতায় সৈয়দপুর তথা নীলফামারী জেলা দল রাঙামাটি জেলাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ছেলেদের দলটিও সাতক্ষীরার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়। ওই দুই দলেরই প্রশিক্ষক ছিলাম আমি। ফলে এ নিয়ে গর্ববোধ করি।’
কথা হয় বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে সেপাক টাকরাও খেলার প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের জুন মাসে নীলফামারী ক্রীড়া সংস্থার সদস্য দিপু আহমেদ আমাদের স্কুলে এসেছিলেন। তিনি বলেন, “প্রচলিত খেলার বাইরে নতুন কিছু করেন।” তিনি সেপাক টাকরাওয়ের ধারণা দেন আমাদের। আমিও প্রথমত মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করি। পরে ছেলেরাও এতে যুক্ত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো খেলাটিতে প্রয়োজন বিশেষভাবে তৈরি বল, নেট ও কোর্ট। এসবের ব্যবস্থা করে দেন দিপু আহমেদ। ওই বছরের ডিসেম্বরেই আমরা জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। নতুন দল হিসেবে বেশ ভালো সাফল্য ছিল আমাদের। ওই দলের সদস্য ববি রায়ের দুর্দান্ত খেলা দেখে খুশি হন বাংলাদেশ সেপাক টাকরাও অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারুক ঢালী। তিনি ববিকে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করেন। ববি জাতীয় দলের হয়ে নেপাল ও থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। পরে নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ববি হয়ে ওঠেন জাতীয় নারী দলের কোচ।’
সেপাক (Sepak) একটি মালয় শব্দ। এর অর্থ ‘লাথি মারা’। ‘টাকরাও’ (Takraw) থাই শব্দ, যার অর্থ ‘বোনা বল’। অর্থাৎ সেপাক টাকরাও মানে হলো, বোনা বল দিয়ে লাথি মেরে খেলা। এ খেলায় সাধারণত বেত বা সিনথেটিক প্লাস্টিকের তৈরি একটি ছোট ছিদ্রযুক্ত বল ব্যবহার করা হয়।
সেপাক টাকরাও খেলার জাতীয় নারী দলের সদস্য বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী আইরিন আক্তার বলেন, ‘জাতীয় দলে খেলতে পেরে ভালো লাগছে। আমরা রাঙামাটিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।
অনেকটা ভলিবল ও ফুটবলের সংমিশ্রণ এই খেলার কিছু নিয়ম আছে। সাধারণত প্রতি দলে তিনজন করে খেলোয়াড় থাকেন (যাকে বলা হয় ‘রেগু’)। তাদের মধ্যে একজন সার্ভার (Teukgong), একজন স্ট্রাইকার (Striker) এবং একজন ফিডার (Feeder) থাকেন।
ব্যাডমিন্টন কোর্টের মতো আয়তাকার একটি মাঠে খেলা হয়, যার মাঝখানে থাকে একটি নেট। খেলোয়াড়েরা পা, হাঁটু, বুক ও মাথা ব্যবহার করে বল খেলতে পারবেন। কিন্তু হাত বা বাহুর সাহায্য নেওয়া যাবে না।
পয়েন্ট পদ্ধতি: প্রতিপক্ষ বলটি ফেরাতে না পারলে বা বল নেটের বাইরে চলে গেলে পয়েন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত ২১ পয়েন্টে একটি সেট হয়। তিন সেটের মধ্যে যারা দুটি জিতবে, তারাই খেলায় বিজয়ী হবে।
টান টান উত্তেজনাপূর্ণ এই খেলায় থাইল্যান্ড ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দল এবং তারাই অধিকাংশ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতও সেপাক টাকরাও খেলায় বেশ ভালো করছে।
বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুস সালাম বলেন, ‘সেপাক টাকরাও খেলাটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কেবল সৈয়দপুরে নয়, দেশের ৩০টি জেলায় খেলাটি এখন বেশ জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাফল্য ধরে রাখতে আমাদের স্কুলের মাঠে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান শিক্ষক সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের।’
প্রতিপক্ষ বলটি ফেরাতে না পারলে বা বল নেটের বাইরে চলে গেলে পয়েন্ট পাওয়া যায়। সাধারণত ২১ পয়েন্টে একটি সেট হয়। তিন সেটের মধ্যে যারা দুটি জিতবে, তারাই খেলায় বিজয়ী হবে।
এ বছর মালয়েশিয়ায় সেপাক টাকরাও বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৬টি দেশ অংশ নেবে এই বিশ্বকাপে।
সেপাক টাকরাও খেলার জাতীয় নারী দলের সদস্য বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী আইরিন আক্তার বলেন, ‘জাতীয় দলে খেলতে পেরে ভালো লাগছে। আমরা রাঙামাটিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এটা আমাদের নীলফামারী জেলাবাসীর জন্য গৌরবের।’ তিনি বলেন, এ খেলার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। একদিন ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো বাংলাদেশে খেলাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী আইরিন। কেবল বাঙালিপুর স্কুল নয়, সেপাক টাকরাও এখন খেলছে সৈয়দপুরের ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, পাইলট বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ ও লক্ষ্মণপুর স্কুল ও কলেজ। খেলাটি ধীরে ধীরে সৈয়দপুরের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাঙালিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমার প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা সেপাক টাকরাও খেলে গৌরব অর্জন করেছে। আমাদের মেয়েরা দেশসেরা হয়েছে। এটি আমরা উদ্যাপন করছি। জাতীয় নারী দলের কোচ ববি রায়কে নিয়েও আমরা গর্বিত। তিনি আমাদের ছেলে ও মেয়ে দলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। আমরা আশাবাদী, একদিন আমাদের দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে।’