গ্রুপ ‘এ’: কোন দল কতটা শক্তিশালী

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ‘এ’ গ্রুপের হয়ে খেলবে স্বাগতিক মেক্সিকোসহ দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চেক প্রজাতন্ত্র। এই গ্রুপে এক দলের আছে দুটি ফাইনাল খেলার রেকর্ড, কোনো দল খেলেছে সেমিফাইনাল। কিন্তু বিশ্বকাপটাই থেকে গেছে অধরা। এই গ্রুপ থেকে কি এবার কোনো দল ফাইনাল খেলতে পারবে? বর্তমানে কোন দল কতটা শক্তিশালী, চলো সংক্ষেপে জেনে নিই।

১. মেক্সিকো: নিজেদের ডেরায় কি এবার ইতিহাস গড়বে

ফুটবল ইতিহাসে মেক্সিকো এবার এক অনন্য রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে তারা নিজেদের নাম লেখাতে প্রস্তুত। কারণ, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তারা তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করছে বিশ্বকাপ! এল ট্রাইকালার নামে পরিচিত এই দলটি এবার বিশ্বমঞ্চে তাদের ১৮তম আসরে অংশ নিতে যাচ্ছে।

এর আগে ১৯৭০ আর ১৯৮৬ সালেও তারা নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, ওই দুইবারই তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ঘরের মাঠের উন্মাতাল সমর্থন সব সময়ই তাদের জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এবারও মেক্সিকান ভক্তরা গ্যালারি মাতাবেন। ১৯৮৬ সালের সেই দলের অভিজ্ঞ সদস্য হাভিয়ের আগুইরে এখন দলের কোচ। তাঁর হাত ধরে মেক্সিকো এবার কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে আরও অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

ফিকশ্চার

• ১২ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম

• ১৯ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (সকাল ৭টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা

• ২৫ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (সকাল ৭টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম

আরও পড়ুন

যেভাবে বিশ্বকাপে

স্বাগতিক দেশ হওয়ার সুবাদে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকো সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ৪৮ দলের এই বিশাল আসরটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট।

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

• কনফেডারেশন: কনক্যাকাফ

• বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৭০ ও ১৯৮৬)

• শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)

• প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০ (গ্রুপ পর্ব)

• বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১৮ বার (১৯৩০, ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

• টানা কোয়ালিফাই করার রেকর্ড: ৯ বার (১৯৯৪ সাল থেকে টানা)

• বিশ্বকাপ আয়োজক: ১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬ (যৌথ আয়োজক)

• বিশ্বকাপের সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৬০টি, জয় ১৭টি, ড্র ১৫টি, হার ২৮টি। গোল করেছে ৬২টি, গোল হজম করেছে ১০১টি।

আরও পড়ুন

২. দক্ষিণ আফ্রিকা: দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হবে?

অবশেষে খরা কাটল দক্ষিণ আফ্রিকার। টানা তিনটি বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকার পর বিশ্বমঞ্চে বীরদর্পে ফিরছে বাফানা বাফানারা। ২০১০ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে তাদের।

সম্প্রতি ২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাব মামেলোডি সানডাউনস তাদের চোখধাঁধানো আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপেও ঠিক একই রকম জাদুকরি পারফরম্যান্স দেখাতে মুখিয়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দল।

ফিকশ্চার

• ১২ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম

• ১৮ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১০টা)– আটলান্টা স্টেডিয়াম

• ২৫ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (সকাল ৭টা)– এস্তাদিও মন্টেরে

যেভাবে বিশ্বকাপে

বাছাইপর্বে সিএএফ বা আফ্রিকান অঞ্চলের গ্রুপ ‘সি’ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৫টি জয়, ৩টি ড্র এবং ২টি হার নিয়ে তারা গ্রুপ পর্ব শেষ করে।

তবে এই যাত্রায় নাটকের কোনো কমতি ছিল না। মহাদেশীয় পরাশক্তি নাইজেরিয়া এবং চমক দেখানো বেনিনের সঙ্গে শেষ ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত তাদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। শেষ ম্যাচে নিজেদের মাঠে রুয়ান্ডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের কাজটা ঠিকমতো সেরে রাখে দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর সবার নজর ছিল নাইজেরিয়া ও বেনিনের ম্যাচের দিকে। সেই ম্যাচে সুপার ইগলখ্যাত নাইজেরিয়া ৪-০ গোলে বেনিনকে হারিয়ে দিলে, পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে সোজা বিশ্বকাপের টিকিট পেয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা।

আরও পড়ুন

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

• কনফেডারেশন: সিএএফ

• সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০)

• শেষ বিশ্বকাপ: ২০১০ (গ্রুপ পর্ব)

• প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৯৮ (গ্রুপ পর্ব)

• বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ৪ বার (১৯৯৮, ২০০২, ২০১০, ২০২৬)

• বিশ্বকাপ আয়োজক: ২০১০ সাল

• সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৯টি, জয় ২টি, ড্র ৪টি, হার ৩টি। গোল করেছে ১১টি, গোল হজম করেছে ১৬টি।

৩. দক্ষিণ কোরিয়া: টানা ১১ বারের বিশ্বযাত্রী

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এশিয়ান পরাশক্তিদের কথা উঠলেই সবার আগে আসে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম। ৪৮ দলের ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের ১২তম আসর খেলতে যাচ্ছে কোরিয়ানরা। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ১৯৮৬ সাল থেকে টানা ১১ বার বিশ্বমঞ্চে কোয়ালিফাই করেছে তারা! বর্তমানে দলটির দায়িত্বে আছেন হং মিউংবো। তিনি নিজেও ফুটবল খেলেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে। এরপর সহকারী কোচ থেকে হয়েছেন প্রধান কোচ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে দীর্ঘ ১২ বছর পর শেষ ষোলোতে উঠলেও ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর পালা।

ফিকশ্চার

• ১২ জুন: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র (সকাল ৮টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা

• ১৯ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (সকাল ৭টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা

• ২৫ জুন: দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (সকাল ৭টা) – এস্তাদিও মন্টেরে

যেভাবে বিশ্বকাপে

কাতার বিশ্বকাপের পর দুবার প্রধান কোচ পরিবর্তন হলেও, এশিয়ান বাছাইপর্বে কোরিয়ার জয়রথ থামেনি। পুরো বাছাইপর্বে তারা ছিল অপরাজিত! দ্বিতীয় রাউন্ডে চীন, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিল তারা। থাইল্যান্ডের সঙ্গে মাত্র একটি ১-১ ড্র ছাড়া বাকি সব কটি ম্যাচ জিতেছে দলটি। এরপর চূড়ান্ত রাউন্ডে জর্ডান, ইরাক, ওমান, ফিলিস্তিন এবং কুয়েতের মতো দলগুলোর বিপক্ষে ৬টি জয় ও ৪টি ড্র নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই বিশ্বকাপের টিকিট কাটে কোরিয়া। এশিয়ার একমাত্র দল হিসেবে কোনো ম্যাচ না হেরেই কোয়ালিফাই করেছে তারা।

আরও পড়ুন

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

• কনফেডারেশন: এএফসি

• সেরা সাফল্য: চতুর্থ স্থান (২০০২)

• শেষ বিশ্বকাপ: ২০২২ (শেষ ষোলো)

• প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৫৪

• বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১২ বার (১৯৫৪, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

• টানা কোয়ালিফাই: ১১ বার (১৯৮৬ সাল থেকে)

• বিশ্বকাপ আয়োজক: ২০০২ সাল (জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে)

• সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৩৮টি, জয় ৭টি, ড্র ১০টি, হার ২১টি। গোল করেছে ৩৯টি, গোল হজম করেছে ৭৮টি।

৪. চেক প্রজাতন্ত্র: দুইবার ফাইনাল খেলেও অধরা বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে চেক প্রজাতন্ত্র এবার যে রূপকথার জন্ম দিয়েছে, তা হার মানাবে যেকোনো রোমাঞ্চকর মুভিকেও! উয়েফা অঞ্চলের প্লে-অফে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্ককে টানা দুটি পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে বীরদর্পে ফিরছে তারা। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠেয় ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠ মাতাতে প্রস্তুত চেকিয়া।

গ্রুপ

• ১২ জুন: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র (সকাল ৮টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা

• ১৮ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১০টা) – আটলান্টা স্টেডিয়াম

• ২৫ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (সকাল ৭টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম

আরও পড়ুন

যেভাবে বিশ্বকাপে

উয়েফা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ক্রোয়েশিয়ার পেছনে থেকে গ্রুপ রানার্সআপ হয় চেচিয়া। ফলে তাদের প্লে-অফ খেলতে হয়। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আয়ারল্যান্ড। নিজেদের ঘরের মাঠ প্রাগে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল তারা। কিন্তু পাত্রিক শিকের পেনাল্টি এবং শেষ মুহূর্তে অধিনায়ক লাদিস্লাভ ক্রেজচির গোলে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় চেকিয়া। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে তারা ফাইনালে ওঠে।

ঘরের মাঠে ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ডেনমার্ক। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ম্যাচটি ২-২ গোলে সমতায় ছিল। পাভেল সুলচ ও ক্রেজচি গোল করেন। এরপর পেনাল্টি শুটআউটে ডেনিশরা চারটির মধ্যে মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয়। আর মিশাল সাদিলেকের নেওয়া শেষ শটটি জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। এভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যায় চেচিয়ার!

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

• কনফেডারেশন: উয়েফা

• সেরা সাফল্য: রানার্সআপ (১৯৩৪ ও ১৯৬২)

• শেষ বিশ্বকাপ: ২০০৬ (গ্রুপ পর্ব)

• প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ (রানার্সআপ)

• বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১০ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৯০, ২০০৬, ২০২৬)

• সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৩৩টি, জয় ১২টি, ড্র ৫টি, হার ১৬টি। গোল করেছে ৪৭টি, গোল হজম করেছে ৪৯টি। (উল্লেখ্য, ১৯৩০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তারা চেকোস্লোভাকিয়া এবং ১৯৯৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চেক রিপাবলিক নামে খেলেছে)।

আরও পড়ুন