ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ

ছোটবেলা থেকে ম্যারাডোনার স্বপ্ন ছিল দুটি—আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা আর আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জেতা। দুটো স্বপ্নই ১৯৭৮ সালে ভেঙে দিয়েছিলেন সিজার মানোত্তি। অভিজ্ঞতার কথা বলে ১৭ বছর বয়সী ম্যারাডোনাকে বাদ দিয়েই বিতর্কিত এক বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি। ম্যারাডোনা তখনো জানতেন না তাঁর সামনে যে পথটা খুলে গিয়েছে, তা পুরোটাই লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের পোস্টার

১৯৮৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল কলম্বিয়া। কিন্তু অর্থনৈতিক কারণে ১৯৮২ সালে নিজেদের সরিয়ে নেয় তারা। একক ক্ষমতাবলে তৎকালীন ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ বদলি হিসেবে বেছে নেন মেক্সিকোকে। যদিও ১৯৮৫ সালে এক ভূমিকম্পে অবস্থা খারাপ হয় মেক্সিকোর। কিন্তু তা সামলে ঠিকই দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনে সমর্থ হয় মেক্সিকো।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও আসে সামান্য পরিবর্তন। ৬ গ্রুপের ১২ দল নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডের পরিবর্তে নেওয়া হয় ১৬ দল। প্রতি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি নেওয়া হতো চারটি সেরা তৃতীয় দলকে। ১৬ দলের নকআউট পর্বটিই হয় দ্বিতীয় রাউন্ড। সেখান থেকে রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে বের করে আনা হয় বিশ্বকাপজয়ী দল।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই বিশ্বকাপকে নিজের করে নেন ম্যারাডোনা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তাঁর শুরুটাই হয় তিন অ্যাসিস্ট দিয়ে। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে ইতালির বিপক্ষে গোল আর বুলগেরিয়ার বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে দলকে একাই টেনে নিয়ে যান দ্বিতীয় রাউন্ডে। গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার ৬ গোলের ৫টিতে সরাসরি অবদান ছিল ম্যারাডোনার। রাউন্ড অব সিক্সটিনে আড়ালে থেকেই নিজের কাজ সারেন ম্যারাডোনা। উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে সরাসরি ছিল না তেমন কোনো অবদান।

কিন্তু এরপরই পাদপ্রদীপে আলোয় আসে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে যখন শীতল সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে। চার বছর পরে এসে আলোচনা দূরে থাক, মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ তাদের। প্রথমবারের মতো দুই দেশ মুখোমুখি হলো ১৯৮৬ সালে এসে। আর সেটাকেই স্মরণীয় করে রাখলেন ম্যারাডোনা।

আরও পড়ুন
ম্যারাডোনার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’।
ছবি: এক্স

প্রথমেই বিশ্ব কাঁপিয়ে দেন তাঁর বহুল আলোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ দিয়ে। গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সমানে সমান লাফ দিয়ে বল জালে জড়ান ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ডের আবেদন সত্ত্বেও সে গোল মেনে নেন রেফারি, ফুটবল ইতিহাসে আইকনিক হয়ে থাকে সেই গোল। আর ঠিক তার চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা জন্ম দেন তাঁর আরেক অনবদ্য সৃষ্টি, ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। ইংল্যান্ডের পাঁচ ফুটবলারকে কাটিয়ে করা সে গোল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর গোল হিসেবে ধরা হয় এখনো। ৮১ মিনিটে গ্যারি লিনেকার গোল শোধ করলেও ইংল্যান্ডকে ম্যাচে ফেরাতে পারেনি তা।

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল বেলজিয়াম। সে ম্যাচেও চারজনকে কাটিয়ে অসাধারণ এক গোল করেছিলেন ম্যারাডোনা। বলতে গেলে এক ম্যারাডোনাতে ভর করেই বিশ্বকাপ ফাইনালে পা দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ পরাক্রমশালী জার্মানি।

জার্মান কোচ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ভেবেই রেখেছিলেন, ম্যারাডোনাকে কীভাবে আটকাবেন। ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার লোথার ম্যাথিউসকে দায়িত্ব দিলেন ম্যারাডোনাকে আটকানোর। আর সেটাতে সফলও হয়েছিলেন অনেকটা। সমস্যা হলো ম্যারাডোনার মতো খেলোয়াড়দের খেলা পাল্টে ফেলতে খুব একটা সময় লাগে না। সেদিন অ্যাজটেক স্টেডিয়ামে সেটাই করেছিলেন ম্যারাডোনা। শুরুতেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। একসময় যখন মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা সময়ের ব্যাপার। তখনই মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে দারুণভাবে খেলায় ফিরে আসে পশ্চিম জার্মানি।

আরও পড়ুন
বুরুচাগার গোলে বিশ্বকাপের ছোঁয়া পায় আর্জেন্টিনা।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমনস

ম্যাচের সময় যখন ৮৫ মিনিট, তখনই ৩০ সেকেন্ডের জন্য জেগে ওঠেন ম্যারাডোনা। আর সেটুকুই যথেষ্ট ছিল ম্যাচে ফেরাতে। ম্যারাডোনার বাড়ানো পাস জালে জড়িয়ে রাতারাতি নায়ক বনে যান লুইস বুরুচাগা। ৩-২ গোলে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনাময় একটি বিশ্বকাপের সমাপ্তি ঘটে ম্যারাডোনার হাতে শিরোপা দিয়ে।

আরও পড়ুন