পেলের ‘জুতা কাহিনি’

ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাবেন রেফারি। প্রস্তুত দুই দলের খেলোয়াড়েরা, রেফারি দুই দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করে নিলেন, ‘সবাই রেডি তো?’ ঠিক সেই মুহূর্তে হাত উঁচিয়ে এক মিনিট চেয়ে নিলেন একজন। পায়ের জুতাটা বাঁধা হয়নি তাঁর। গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার দর্শক আর টিভির সামনে কোটি চোখ তখন তাকিয়ে। ক্যামেরার ফোকাস চলে গেল তাঁর পায়ে। এই পা যে-সে পা নয়, স্বয়ং ফুটবল–সম্রাট পেলের পা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য জাদুকরের পা হয়ে উঠল পুরো ফুটবল–বিশ্বের ফোকাস।

পেলে ধীরেসুস্থে হাঁটু গেড়ে বসলেন মাঠের ঘাসে, আর নিপুণ হাতে বাঁধতে শুরু করলেন তাঁর বুটের ফিতা। ক্যামেরার লেন্স জুম করতেই ধরা পড়ল বিখ্যাত ‘পুমা’ লোগো। পুরো ফুটবল ইতিহাস বদলে গেল সেই কয়েক সেকেন্ডেই। ফুটবলে জোরেশোরে শুরু হলো বিজ্ঞাপনের যাত্রা।

জুতা বাঁধছেন পেলে।
ছবি: এক্স

এ ঘটনার গল্প জানতে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ফুটবল–জগতে ব্র্যান্ডের আবির্ভাব ঘটেছেই দুই কোম্পানির লড়াই করে কেন্দ্র করে—অ্যাডিডাস আর পুমা। মজার ব্যাপার হলো জার্মান দুই কোম্পানির মালিক আপন দুই ভাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অ্যাডলফ ও রুডলফ ড্যাসলার—দুই ভাই মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘ড্যাসলার ব্রাদার্স শু ফ্যাক্টরি’। বিশ্বযুদ্ধের পর মনোমালিন্যে ভাগ হয়ে যায় কোম্পানি, আদি ড্যাসলার গড়েন ‘অ্যাডিডাস’ আর রুডলফ ড্যাসলার গড়ে তোলেন ‘পুমা’। সেই সময় পুরো হারজোজেনাউরাক শহর বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল দুই ভাগে, অন্য কোম্পানির জুতা পরলে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেত লোকদের।

আরও পড়ুন
পুমার বিজ্ঞাপনে পেলে।
ছবি: এক্স

১৯৭০ বিশ্বকাপের আগে পেলের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তাঁর মতো মহাতারকাকে নিজেদের ব্র্যান্ডে ভেড়াতে গেলে দুই কোম্পানির পকেট থেকেই বিশাল অঙ্কের টাকা গচ্চা যাবে। এমনও হতে পারে, নিজেদের লড়াইয়ে নিঃশ্ব হয়ে যেতে পারেন তাঁরা। তাই দুই কোম্পানি একটি ‘জেন্টেলসম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’-এ পৌঁছায়, যার নাম ছিল ‘পেলে প্যাক্ট’। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো পক্ষই পেলেকে স্পনসর করবে না।

পেলের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে পুমা শেষ পর্যন্ত নিজেদের লোভ সামলাতে পারেনি। চুক্তি ভেঙে পেলেকে মোটা অঙ্কের টাকা অফার করে তারা। সেই সময়ে বিশ্বকাপে পুমার জুতা পরার জন্য পেলেকে দেওয়া হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার ডলার। বিনিময়ে শর্ত ছিল একটাই, পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিতে হবে ফুটবল–সম্রাট ‘পুমা’র বুট পরেই খেলেন।

আরও পড়ুন
পেলের সেই বিখ্যাত বুট।
ছবি: এক্স

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল পেরু। পেলে সেই ম্যাচই বেছে নেন পুমাকে পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত করার জন্য। রেফারি যখন ম্যাচ শুরু করবেন, ঠিক তখনই খেলা থামিয়ে বুটের ফিতা বাঁধতে শুরু করেন। শোনা যায় টিভি ব্রডকাস্টারকে আলাদা করে টাকা দিয়ে রেখেছিল পুমা, যাতে পেলের পায়ের ‘ক্লোজ-আপ’ শটের জন্য তৈরি থাকে তারা। আর কয়েক সেকেন্ডেই পুমার লোগো পৌঁছে যায় পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। তৈরি হয় এক নতুন ইতিহাস।

মজার ব্যাপার হলো গ্রুপ পর্বে তিন গোল পাওয়া পেলে পুমার বুট পরে নক-আউট পর্বের তিন ম্যাচে পেয়েছিলেন মাত্র ১ গোল। সেই গোলই ছিল ফাইনালে। তবে যতবার পেলের পায়ের জাদু মুগ্ধ করেছে বিশ্বকে, পুমার লোগো চোখে পড়েছে সকলের। ‘৭০ বিশ্বকাপে পেলের নৈপুণ্যে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল, নিজেদের করে নেয় জুলে রিমে ট্রফি। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিন বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড় হন পেলে।

আরও পড়ুন
১৯৭০ বিশ্বকাপের ফাইনালে পুমার বুট পায়ে পেলে।
ছবি: এক্স

বিশ্বকাপের পরও পুমার সঙ্গেই ছিলেন পেলে। পুমার জনপ্রিয়তা তখন আরও বেড়েছে। বিশ্বকাপের পর নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেন পেলে, তার জন্য তৈরি করা ‘পুমা কিং’ বুটটি পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে আইকনিক জুতায়। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পুমার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন পেলে।

ফুটবল–সম্রাট বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু মাঠের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে সেই ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের বুট বাঁধার গল্প রয়ে গিয়েছে এক আইকনিক দৃশ্য হিসেবে।

আরও পড়ুন