বিশ্বকাপে বিশ্ব কাঁপে
ভদ্রলোকের নাম ছিল ক্লোভিস আকোস্তা ফার্নান্দেজ। লোকে ডাকে ‘গাউচো দা কোপা’; বাংলায় ‘বিশ্বকাপের রাখাল’। ব্রাজিল ফুটবল দলকে খুব ভালোবাসতেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও জাতীয় দলের ম্যাচ থাকলে সব লাটে উঠত। সেই ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিল ফুটবল দলের পথচলার সঙ্গী। গ্যালারিতে হলুদ জার্সি পরে বিশ্বকাপ ট্রফিটা আগলে রাখতেন সন্তানের আদরে। এমন ছবি কি চেনা চেনা লাগছে? গুগল-ফেসবুকে কিন্তু খুবই পরিচিত মুখ। কিন্তু সেই মুখেই একদিন এমন বিষাদ ভর করল যে নাম হলো, ‘ব্রাজিলের সবচেয়ে দুঃখী মানুষ’।
সেদিন ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ব্রাজিল-জার্মানি ম্যাচ। বাকিটা তোমাদের নিশ্চয়ই জানা। সেভেন-আপ। জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরেছিল ব্রাজিল। হারের পর অশ্রুসিক্ত চোখে ক্লোভিস সেদিন এমন একটি কাজ করেছিলেন, যেটা বিশ্বকাপের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। কেউ কেউ বলেন, বিশ্বকাপ যে দেশ, জাতি ও বর্ণের সীমানা পেরিয়ে গোটা পৃথিবীর এক আনন্দ উৎসব, সেটা সেদিন বোঝা গিয়েছিল।
ক্লোভিস সেদিন পাশের এক জার্মান সমর্থকের হাতে ট্রফিটি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাও। এটা তোমাদের প্রাপ্য।’
জার্মানি সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়, সেটা তোমরা জানো। ক্লোভিসের ছেলের গল্প শুনলে বুঝবে, বিশ্বকাপ আসলে নিছক কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়। কিংবা শুধু ফুটবল খেলার আসর নয়। বিশ্বকাপ মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
ক্লোভিস কিডনির ক্যানসারে ভুগে মারা যান ২০১৫ সালে। এর পর থেকে তাঁর ছেলেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে একই জার্সিতে, ট্রফি নিয়ে একই ভঙ্গিতে, গ্যালারিতে বসে। শুধু বিশ্বকাপই পারে ভালোবাসার এমন গল্প বলতে।
কিংবা সেই যে একদল উলভারহ্যাম্পটন সমর্থক বন্ধুদের দল। ইংল্যান্ডে চাকরি-বাকরি হারিয়ে বেকার বসেছিলেন। সামনে ’৮৬ বিশ্বকাপ। সিদ্ধান্ত হলো খেলা দেখতে সবাইকে মেক্সিকো যেতে হবে। সেখানে গিয়ে বিশ্বকাপ তাঁদের এতই ভালো লাগল যে আর জন্মভূমিতে ফিরতে ইচ্ছা হলো না। অন্য দেশে থেকে গিয়ে জীবনটা গড়ে নিলেন দারুণভাবে। তোমাদেরও এখন জীবনটা গড়ারই সময়। কিছু করে দেখানোর শুরুটা হতে পারে এখনই। আর্জেন্টিনার তিন যুবক ভিসেন্তে কনকুলিনি, মিগুয়েল সিলিও ও ইয়ামান্দু মার্তিনেজ কিন্তু বয়সে তোমাদের বেশ বড়। তাঁরা করেছেন কি জানো, আর্জেন্টিনার গুয়ালুগয়েচু থেকে সাইকেলে করে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছে কানসাস সিটিতে। ১৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের এই শহরে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দেশের খেলা দেখবেন তাঁরা। বিশ্বকাপের চৌম্বকীয় টানের কত শক্তি এবার বুঝলে তো?
চাইলে তাকাতে পারো তোমারই শহর কিংবা গ্রামে। গাছে গাছে আমের মুকুলের মতো পতাকায় ছেয়ে গেছে কিংবা যাওয়ার অপেক্ষা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেনের জার্সিতে সয়লাব চারপাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা, লিওনেল মেসি নাকি লামিনে ইয়ামাল অথবা কিলিয়ান এমবাপ্পে—এসব প্রশ্নে, বিশ্লেষণে, মজার ভিডিওতে, মিমে তিল ঠাঁই আর নাই রে! এ শুধু তোমার দেশ নয়, বলতে পারো গোটা পৃথিবীই কাঁপে বিশ্বকাপে। পৃথিবীটা আবার দুপাশে কমলালেবুর মতো চাপা হলেও দেখতে গোলাকার বলের মতোই কি না!
যাক গে, ওসব মজার কথা। আচ্ছা, ফুটবলে একবারও লাথি না মারা মানুষ হয় কখনো? এ তো পৃথিবীর মানুষের প্রাণের খেলা। বই-পত্র কিংবা গুগলে অলিম্পিককে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে পেতে পারো, কিন্তু শুধু একটি খেলা নিয়ে এমন বৈশ্বিক মিলনমেলা পৃথিবীতে আর একটিও নেই। জেমসের সেই গানের লাইনের মতো, ‘সিনায় সিনায় লাগে টান…সিনায় সিনায়।’
সর্বশেষ বিশ্বকাপেই তোমরা এর প্রমাণ পেয়েছ। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়েছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। এ দেশের মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন মেসিরা। আচ্ছা এই যে ভালোবাসার বেতার আদান-প্রদান, সেটা তোমার রাস্তার পাশে দেয়ালে মেসি কিংবা এমবাপ্পেদের গ্রাফিতিতেই স্পষ্ট। সবচেয়ে মজার বিষয় কি জানো, বিশ্বকাপের মোহে শুধু তুমি নও, তোমার বাবা কিংবা দাদাও একসময় ডুবেছেন।
সেই যে ১৯৩০ সাল, বিশ্বকাপের জন্ম হলো। তারপর শুরু হলো থরে-বিথরে অবিশ্বাস্য সব ইতিহাসের পাতা সংযোজন। বৈরী সম্পর্ক তাই প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বল নিয়ে খেলা, মারাকানা ট্র্যাজেডি, মিরাকল অব বার্ন, হ্যান্ড অব গড…বিশ্বকাপের ইতিহাসগুলো যখন জানবে, তখন বুঝবে মানুষের কাছে আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। মানুষ তাঁর স্বপ্নের সমান বড়, বিশ্বকাপ হলো সেই স্বপ্নপূরণের মঞ্চ। অমরত্ব প্রাপ্তির চাবিকাঠি। আচ্ছা, বলো তো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী? কিংবা তাদের ইতিহাসে অন্যতম সেরা দুজন রাষ্ট্রনায়কের নাম বলো? একটু কঠিন লাগছে? অন্য প্রশ্ন করি, মেসি, নেইমার, পেলে, ম্যারাডোনার নাম শুনেছ?
ঠিকই ধরেছ। সেরা সেরা ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও আটলান্টিক ও ইউরোপ পেরিয়ে তোমার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু ম্যারাডোনা কিংবা মেসি হয়তো তোমার ঘরে পৌঁছেছেন আরও আগেই। বাবার কাছে পেলে, ম্যারাডোনার গল্প শুনেছ হয়তো, অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মুছে গেলেও তাঁরা এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের মুখে মুখে টিকে থাকবেন চিরকাল। বিশ্বকাপের এই এক শক্তি।
এবারের বিশ্বকাপ তো আরও স্পেশাল। ২০২২ সাল পর্যন্তও দল ছিল ৩২টি। এবার ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে তিন দেশে; যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। তিন আয়োজক দেশ নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় কলেবরের বিশ্বকাপ আসর আগে কখনো দেখা যায়নি। ব্যাপার আছে আরও একটি। তবে সেটা তোমাদের অনেকের জন্যই একটু দুঃখের; এটাই সম্ভবত মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। সম্ভবত—কথাটা তিনজনের বয়স দেখে ভুলে যেতে পারো। আসলেই এবার তাঁদের শেষ বিশ্বকাপ। বলতে পারো, বিশ্বকাপের আকাশ থেকে একসঙ্গে তিনটি নক্ষত্রের পতন!
সেটাও যেনতেন নয়। মেসি ও রোনালদো এরই মধ্যে ইতিহাস সেরাদের কাতারে। নেইমারও খুব একটা পিছিয়ে নেই। তাঁর জনপ্রিয়তাও ঈর্ষণীয়। বিশ্বকাপে এক যুগ ধরে এই ত্রয়ী পৃথিবীর প্রিয় মুখ, শুধু মেসি ও রোনালদোকে ধরলে পিছিয়ে যেতে হবে কুড়ি বছর; অনেকেরই শৈশব গড়ে উঠেছে তাঁদের খেলা দেখে। বাসার পাশে মাঠে তাঁদের মতো খেলার চেষ্টা করেছ অনেকেই। তাঁদের শেষ বিশ্বকাপের একট মুহূর্তও যেন মিস না হয়। কারণ, বিশ্বকাপে আরেকজন মেসি কিংবা রোনালদোকে কিন্তু আর কখনো না–ও দেখা যেতে পারে!
কিলিয়ান এমবাপ্পের ওপর চোখ রাখবে। অবশ্য তাঁর যে গতি, চোখ রাখাই কষ্ট! বেচারা সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও মেসির আর্জেন্টিনার ট্রফি জয় ঠেকাতে পারেননি। এবার নিশ্চয়ই আরও আটঘাট বেঁধেই নামবেন। অবশ্য বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ তাঁর পাওয়া হয়েছে আরও আট বছর আগেই। সেটা তোমাদের কাছাকাছি বয়সে (১৯ বছর)। তোমাদের বয়সী ছেলেও কিন্তু বিশ্বকাপ জিতেছে। ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে; সেই ছেলেটির নাম পেলে।
শুধু পছন্দের দলের খেলাটা অন্তত দেখো। এখনো কোনো দল পছন্দ করে না থাকলে একটি বেছে নাও। ব্যস, থ্রিলার রাইডের শুরু। বিশ্বকাপের প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চ। মেসির ভাষায়, ‘…যেকোনো কিছুই হতে পারে!’
১৮ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল বয়সে তোমাদের চেয়ে একটু বড়ই হবে। এবার বিশ্বকাপে সে কিন্তু তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি। স্পেনের আশা-ভরসার প্রতীক, একটি দেশের মানুষের প্রত্যাশার ভার বইতে হচ্ছে অত অল্প বয়সেই। বিশ্বকাপে গোটা পৃথিবীর কিশোর বয়সীদের পথ দেখাচ্ছে এই ছেলেটিই। ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে ঠিকমতো ঘষামাজা করে খুব অল্প বয়সেই কোথায় পৌঁছানো সম্ভব, সেটা তাকে দেখে শিখতে পারো। বিশ্বকাপ আসলে প্রেরণার গল্প বলে মানুষকে। কিংবা মানুষই বিশ্বকাপে প্রেরণার গল্প তৈরি করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। মজার বিষয় কি জানো, এসব গল্প শুধু জয়ে নয়, হারেও জন্ম নেয়। সেই যে ১৯৫০ বিশ্বকাপে মারাকানায় হারল ব্রাজিল, কষ্ট সইতে না পেরে স্টেডিয়ামের ছাদ থেকে দু-একজনের লাফ দেওয়ার খবরও শোনা গিয়েছিল, তারপর কী হলো জানো!
সেই শোককে শক্তি বানিয়ে ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। আর কোনো দেশ এতবার বিশ্বকাপ জেতেনি। কিংবা মেসির কথাই ধরো। বেচারা ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর জাতীয় দলে তাঁর ওপর থেকে আর্জেন্টাইনদের আস্থা ধীরে ধীরে প্রায় উঠে যেতে বসেছিল। কিন্তু সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঠিকই দেখিয়ে দিলেন!
মানুষের কাছে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই।
বিশ্বকাপ আসলে অসম্ভবের গল্পই বলে।
ধরো, আর্জেন্টিনার ভিলা ফিওরিতোর কোনো বস্তি থেকে উঠে আসা ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামের একটি ছেলে গোটা পৃথিবীর মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো। কিংবা ডাচদের বিজন অশ্রুর কবি হয়ে থাকা ইয়োহান ক্রুইফ। একটি লোক বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয়েই ইতিহাসে অন্যতম সেরা। কিংবা জিনেদিন জিদান। জন্ম আলজেরিয়ায়, বিশ্বকাপ জেতাল ফ্রান্সকে, এরপর মাথার এক ঢুঁসে আরও বিখ্যাত কিংবা হালকা কুখ্যাত হয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি পাশ কাটিয়ে নিচু মাথায় চলে গেলেন; বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত দুঃখের ছবি নাকি আর হয় না। ম্যাজিকটা কি জানো, বিশ্বকাপে এমন সব মুহূর্তের ম্যাজিক যখন দেখবে, তোমারও যেন কেমন কেমন লাগবে। এই অনুভূতি ব্যাখ্যাতীত। বলতে পারো, গোল করলে কিংবা খেলে যেমন লাগে, তার কাছাকাছি। গোল করোনি কখনো? কখনো কখনো এমনিতেই আনন্দে চোখে পানি এসেছে নিশ্চয়ই? কিংবা কাঁদতে ইচ্ছে করেছে, তেমন।
শুধু পছন্দের দলের খেলাটা অন্তত দেখো। এখনো কোনো দল পছন্দ করে না থাকলে একটি বেছে নাও। ব্যস, থ্রিলার রাইডের শুরু। বিশ্বকাপের প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চ। মেসির ভাষায়, ‘…যেকোনো কিছুই হতে পারে!’
যেমন ধরো, ২০২২ বিশ্বকাপ দেখেছে ৫০০ কোটি মানুষ। এবার দল বাড়ায় দর্শক আরও বাড়বে। গ্রামে, পাড়ামহল্লা কিংবা শহরে শহরে বাড়বে পতাকার বৈচিত্র্যও। রাস্তা দিয়ে যেতে সেসব দেখতে দেখতে তোমার মনে পড়ে যেতে পারে গ্রীষ্মে আমের মুকুলের ম–ম ঘ্রাণ। আমের মৌসুমের মতো বিশ্বকাপের মৌসুমও সমাগত।
মনের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করো বিশ্বমিলনের এই চিঠি। হও মানুষের অমরত্ব প্রাপ্তির অংশীদার। বিশ্বকাপে স্বাগতম।