কোচকে বরখাস্ত করতে যাচ্ছে লিভারপুল?
মৃণাল সাহা
ফুটবলের দুনিয়া বেশ অদ্ভুত। কয়েক দিন আগেই যাঁকে মাথায় তুলে রাখেন সমর্থকেরা, সপ্তাহ পার হতে না হতেই তিনি হয়ে ওঠেন চক্ষুশূল। তাঁকে বিদায় করার জন্য মাঠে চলতে থাকে দুয়োধ্বনি। ইউরোপিয়ান ফুটবলের শীর্ষ লিগে সবকিছুই নির্ভর করে ফলাফলের ওপর। ফলাফল দিতে পারলে চাকরি আছে, নইলে পত্রপাঠ বিদায়। লিভারপুলের কোচ আর্নে স্লটের চাকরিও এখন সেই দোটানায়। শেষ ১২ ম্যাচে তাদের জয় মাত্র ৩টিতে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ বাদ দিলে ইংল্যান্ডে শেষ ৯ ম্যাচের ১টিতে জিতেছে তারা।
অথচ গত মৌসুমে লিভারপুল ছিল সপ্তম আসমানে। দলকে শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন ডাচ কোচ আর্নে স্লট। ইয়ুর্গেন ক্লপের রেখে যাওয়া দলে হাত দেওয়ার কোনো সুযোগই পাননি। বরং সেই দলকে কাজে লাগিয়েছেন, নিজের মতো সাজিয়ে নিয়েছেন। সেটাই যথেষ্ট ছিল লিভারপুলকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার জন্য। সেই লিভারপুলকে থামানোর সাধ্য হয়নি কারও। সিটির রাজত্ব্য ভেঙে দিয়ে ১০ পয়েন্টের ব্যবধানে লিগ নিশ্চিত করেছিল ‘অল রেডস’রা।
তার পারফরম্যান্সের ওপর ভরসা রেখেছিল ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিল ব্ল্যাংক চেক। যে চেকের দেখা পাননি খোদ ইয়ুর্গেন ক্লপও। দিনের পর দিন বলার পরও তাঁকে চলতে হয়েছে মেপে মেপে। সেই মালিকপক্ষ আর্নে স্লটকে খরচ করতে দিয়েছে ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড। এত দাম দিয়ে কেনা খেলোয়াড়েরা আর্নে স্লটকে শুধু হতাশাই উপহার দিয়েছে। ১৪৫ মিলিয়নে কেনা অ্যালেকজেন্দার ইসাক জানেন না কী করছেন। ১২৫ মিলিয়নে কেনা ফ্লোরিয়ান ভির্টজ তো গোলের কথা ভুলেই গেছেন। জেরেমি ফ্রিমপং, মিলোস কিরকিজ কেউই নিজেদের নামের সুনাম করতে পারছেন না। হুগো ইকিতেকে যেটুকু ফর্মে ছিলেন শুরুতে, সেটাও হারিয়ে ফেলেছেন।
শুধু নতুন খেলোয়াড়েরা নন, পুরোনো সেনানীদের অস্ত্রেও জং ধরেছে। মোহাম্মদ সালাহ নেই ফর্মে। কোডি গ্যাকপো, ম্যাক এলিস্টার—সবাই যেন ছায়া হয়ে আছেন দলে। কেউ ম্যাচে মনোযোগই দিতে পারছেন না। সবাই যেন কোথায় হারিয়ে গেছেন।
লিভারপুলের দুর্দশা শুরু হয়েছে একেবারে হুট করেই। মৌসুমের শুরুতে ভালোই খেলছিল—ছিল অপরাজিত, লিগের শীর্ষে। ধাক্কাটা আসে সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ, ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে হেরে। এই মৌসুমের অষ্টম ম্যাচ ছিল সেটা, এর আগের সাত ম্যাচেই জয়ের দেখা পেয়েছিল তারা। সেটাও যে খুব একটা ভালো খেলে তা নয়, বরং শেষ মুহূর্তের গোলে নিজেদের বাঁচিয়েছে। ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে ২-১ গোলে হেরেই যেন সব তছনছ হয়ে যায় তাদের। এরপর একে একে হেরেছে গ্যালাতেসারেই, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ব্রেন্টফোর্ড, দ্বিতীয়বারের মতো ক্রিস্টাল প্যালেস, ম্যান সিটি, নটিংহাম ফরেস্ট আর পিএসভির কাছে। গুনে গুনে তিনটি জয় পেয়েছে শেষ ১২ ম্যাচে। সেগুলোও এসেছে আইনট্রাখট ফ্র্যাঙ্কফ্রুট, রিয়াল মাদ্রিদ আর অ্যাস্টন ভিলার সঙ্গে। অর্থাৎ ম্যাচে ফিরতে চাইলে সেই শক্তি তাদের আছে, কিন্তু কোনো কারণে পারছেন না।
জোতাকে হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে লিভারপুল। ছবি: এক্স
কারণ হিসেবে যত কিছুই যোগ করা হোক না কেন, লিভারপুলের খেলোয়াড়েরা সত্যি বলতে এখনো খেলার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। দিয়োগো জোতার মৃত্যু এখনো সমর্থক, সতীর্থদের মনে দাগ কেটে আছে। অ্যান্ডি রবার্টসন বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে প্রথম মনে করেছেন জোতার কথা। প্রতি ম্যাচেই সমর্থকেরা মনে করছেন তাঁর কথা, সতীর্থরাও তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন পিচে, বেঞ্চে। দলের সবচেয়ে হাসিখুশি খেলোয়াড়কে এভাবে হারিয়ে ফেলার কথা ছিল না কারও। তবু এই শূন্যতা নিয়ে চলতে হচ্ছে, মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
গত মৌসুমে আর্নে স্লোটের ট্রাম্প কার্ড ছিলেন জোতা। শেষ মুহূর্তে তার গোলেই কয়েকটি জয় নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। সেই তুরুপের ত্রাস নেই, সঙ্গে রেখে গেছেন হাজারো স্মৃতি। সেই স্মৃতি নিয়ে ফুটবল খেলায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন নয়, অসম্ভব বটে। তাই তো যখন জয়ের সুতো কেটে গেছে, সেই সুতো আর জোড়া লাগাতে পারেনি লিভারপুল।
কোচ আর্নে স্লট কম চেষ্টা করছেন না। কিন্তু তিনিও পারছেন না। কারণ, বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। যদিও তারা দাবি করছে, তাদের এই শোক কোনো অজুহাত নয়। খারাপ খেলাতেই হাছে তারা। কিন্তু একটা প্রভাব তো থাকেই। কর্তৃপক্ষও তাই দিশাহারা। আর্নে স্লটের দল নিজেদের মাটিতে পিএসভির কাছে হেরেছে ৪-১ গোলে। নামতে নামতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ১৩তম অবস্থানে আছে তারা। আর প্রিমিয়ার লিগে আছে ১২তম অবস্থানে। চ্যাম্পিয়নস লিগে ২৪ পর্যন্ত থাকার সুযোগ আছে, প্রিমিয়ার লিগে তো আর তা নেই। গতবারের লিগজয়ী দল যখন ১২তম অবস্থানে থাকে, তখন তো কোচকে সরিয়ে দেওয়ার কথা আসাটাই স্বাভাবিক।
কোচদের বরখাস্ত করা লিভারপুলের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইয়ুর্গেন ক্লপ এতটাই দুর্দান্ত খেলেছেন যে তাঁকে বরখাস্ত করার কোনো সুযোগ ছিল না দলের কাছে। কিন্তু এর আগের তিনজন কোচকেই পত্রপাঠ বিদায় করেছে লিভারপুল। তখন অবশ্য তাদের এই রমরমে অবস্থা ছিল না, মিড টেবিলেই অনেক সময় খাবি খেতে হতো তাদের। একসময়ের পুরোনো জৌলুশ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল তারা। ব্র্যান্ডন রজার্স লিভারপুলের হয়ে সেরা ম্যানেজারের পদক পেয়েও হয়েছেন বরখাস্ত। সেই জায়গায় বড়সর পরিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। ক্লপ তো আর নেই, ফলাফলও নেই। তাই স্লটের বিদায়টা আসন্ন বলেই মনে হচ্ছে।
কিন্তু প্রিমিয়ার লিগজয়ী কোচকে এত সহজে বিদায় করবে বলে মনে হয় না লিভারপুল। যে কারণে এখনই চাকরি হারানোর দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না তাঁকে। বরং মনোযোগ দিতে পারছেন কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন, সেই সঙ্গে দলকে ফিরিয়ে আনবেন লড়াইয়ে। কীভাবে জোতার শোককে শক্তিতে পরিণত করবে। প্রিমিয়ার লিগের লড়াই থেকে এখনো ছিটকে যায়নি অল রেডসরা। শুধু ফর্মে ফেরার অপেক্ষা। আর যদি ফিরতে না পারেন, তাহলে আর্নে স্লটের লিভারপুল ক্যারিয়ার থেমে যেতে পারে বড়দিনের আগেই।