১৯৭৪ বিশ্বকাপ ছিল আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বকাপের নতুন এক শুরু। দশম আসরে এসে পাল্টে ফেলতে হয় বিশ্বকাপের শিরোপা। গ্রিক দেবী নাইকির আদলে তৈরি করা ‘জুলে রিমে ট্রফি’ পাকাপাকিভাবে তিনবার জেতায় চলে গিয়েছে ব্রাজিলের ঘরে। সে শূন্যস্থান পূরণের জন্য ডাক পড়ে তামাম দুনিয়ার শিল্পীদের। আর সেখান থেকেই বেছে নেওয়া হয় ইতালিয়ান শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগার নকশা।
৩৬ সেন্টিমিটারের এই ট্রফিতে হাত উঁচু করে পৃথিবীকে ধরে রেখেছে দুজন অ্যাথলেট। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি ট্রফির ওজন ৬ দশমিক ১ কিলোগ্রাম। যদিও বিশ্বকাপের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এই শিরোপা পাকাপাকিভাবে আর দেওয়া হচ্ছে না কাউকে। দিন শেষে শিরোপা ফেরত আসবে ফিফার কাছেই।
বিশ্বকাপ শিরোপার মতো ফরম্যাটেও আসে কিছুটা পরিবর্তন। ১৬ দলকে ভাগ করা হয়েছিল ৪টি আলাদা গ্রুপে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল উঠবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ৪ গ্রুপ থেকে শীর্ষ ৮ দল আবারও ভাগ হয়ে যাবে ২টি গ্রুপে। দুই গ্রুপের সেরা দল খেলবে ফাইনাল। আর রানার্সআপ দল খেলবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী।
বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ছিল চমক। স্পেন, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ফ্রান্সের মতো হেভিওয়েট দলকে বিশ্বকাপ মৌসুম কাটাতে হয় বাসায় বসে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে নাম লেখায় পূর্ব জার্মানি, হাইতি, অস্ট্রেলিয়া ও জায়ার। ১৯৭৪ বিশ্বকাপই একমাত্র বিশ্বকাপ, যেখানে জার্মানি দুই প্রান্ত (পূর্ব ও পশ্চিম) অংশ নিয়েছিল বিশ্বকাপে।
সত্তরের দশকে ফুটবল বিশ্ব পরিচিত হয় ফুটবলের নতুন এক ধারার সঙ্গে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক যেখানে মেতে ছিল সাম্বা ফুটবলে, সেখানে সত্তরের দশকে নবজাগরণ ঘটে নেদারল্যান্ডসের টোটাল ফুটবলের। কোচ রেনাস মিশেল ও ইয়োহান ক্রুইফের হাত ধরে ফুটবল বিশ্বকে পাল্টে দেয় টোটাল ফুটবল। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েই তাক লাগিয়ে দেয় নেদারল্যান্ডস।
অপরাজিত থেকে গ্রুপপর্ব শেষ করে নেদারল্যান্ডস। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল যে তাদের টোটাল ফুটবলের কাছে কিছুই না, তার প্রমাণ মেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে। পরাক্রমশালী ব্রাজিলকে ২-০ গোলে হারিয়ে নিশ্চিত করে ফাইনাল। যদিও পেলে, গারিঞ্চা, গার্সনদের বিদায়ে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল ব্রাজিল দল, তাতে কী? সাম্বা ফুটবলের বিপক্ষে এমন জয়, দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছিল দ্রুতই।
অন্যদিকে অপর পাশ থেকে ফাইনাল নিশ্চিত করে স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানি। যদিও তাদের শুরুটা হয়েছিল বেশ কঠিন। শিক্ষাদীক্ষা থেকে শুরু করে ফুটবল—সবকিছুতে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শুরুতেই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল পূর্ব জার্মানি। পশ্চিম জার্মানি তার শোধ নিল বাকি দলগুলোর ওপর। টানা জয় নিয়ে ফাইনালে উঠল তারা।
পূর্ব জার্মানির কাছে এক হার খোলনলচে বদলে দিয়েছিল পশ্চিম জার্মানির খেলার ধরনে। ফর্মের তুঙ্গে থাকা জার্মানি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাল আবার। ২০ বছর আগে ঠিক যেভাবে পরাক্রমশালী হাঙ্গেরিকে হারিয়ে ‘জায়ান্ট হান্টার’ উপাধি পেয়েছিল, ঠিক একই পথে হাঁটা শুরু করল তারা। এবার তাদের প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস।
মিউনিখের অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডস ও পশ্চিম জার্মানি। প্রথম মিনিট থেকেই নিজেদের ট্যাকটিসে জার্মানিকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন ইয়োহান ক্রুইফরা। প্রথম মিনিটেই ক্রইফকে ডি বক্সের মধ্যে ফাউল করে বসেন উলি হোয়েনেস। ম্যাচের দুই মিনিটের মাথায় নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে নেন ইয়োহান ন্যাসকেন্স। সেটাই ছিল নেদারল্যান্ডসের শুরু ও শেষ। ২৬ মিনিটে পেনাল্টি থেকে জার্মানিকে সমতায় ফেরান পল ব্রেটনার। ৪৩ মিনিটে গার্ড মুলারের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। সেটাই হয়ে থাকে নেদারল্যান্ডসের ১৯৭৪ বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ পেরেক। টুর্নামেন্ট–সেরা দলকে হারিয়ে শিরোপা উল্লাসে মেতে ওঠে পশ্চিম জার্মানি—এ যেন জার্মানির প্রতিটি বিশ্বকাপ জয়ের ‘দেজা ভ্যু’।