এবারের শীতকালীন অলিম্পিকে পদকের দাম ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কেন

অলিম্পিক পদক

মঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত শুনছেন একজন অ্যাথলেট। গলায় ঝুলে আছে পদক। যেকোনো অলিম্পিকে একজন অ্যাথলেটের এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। এই অনুভূতির কোনো দাম হয় না। তবু বাস্তবের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের শীতকালীন অলিম্পিকের পদকগুলো সত্যিই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দামি। ইতালিতে অনুষ্ঠিত হবে এবারের শীতকালীন অলিম্পিক। এবার ক্রীড়াবিদেরা যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জপদক পাবেন, সেগুলোর আর্থিক মূল্য অলিম্পিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

স্কিইং, আইস হকি, ফিগার স্কেটিং, কার্লিং—এমন নানা ইভেন্টে অংশ নেওয়া বিশ্বের সেরা ক্রীড়াবিদদের হাতে তুলে দেওয়া হবে সাত শতাধিক পদক। কেবল ধাতুর বাজারদর হিসাব করলেও এই পদকগুলোর দাম আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের পর থেকে সোনা ও রুপার আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়েছে যথাক্রমে প্রায় ১০৭ শতাংশ এবং ২০০ শতাংশ। এ কারণেই এখন একটি অলিম্পিক স্বর্ণপদকের ধাতুমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ডলার। প্যারিস অলিম্পিকের সময়ের দ্বিগুণেরও বেশি। রৌপ্যপদকের মূল্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডলার, যা দুই বছর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

আরও পড়ুন

বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপার দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে আছে খুচরা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। অন্যদিকে স্বর্ণের দাম বেড়েছে মূলত বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। অনিশ্চয়তার সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীরা। ফলে দাম আরও বেড়েছে।

তবে ‘স্বর্ণপদক’ নাম শুনে মনে হতে পারে পুরো পদকটাই সোনার তৈরি। বাস্তবে বিষয়টি তেমন না। ইতালির স্টেট মিন্ট ও পলিগ্রাফিক ইনস্টিটিউটে পুনর্ব্যবহৃত ধাতু দিয়ে তৈরি এই পদকগুলোর মোট ওজন প্রায় ৫০৬ গ্রাম। তবে এর মধ্যে খাঁটি স্বর্ণ মাত্র ছয় গ্রাম। বাকি অংশ রুপার। ব্রোঞ্জপদকগুলো তৈরি তামা দিয়ে। ওজন প্রায় ৪২০ গ্রাম। আর বাজারমূল্যে প্রতিটির দাম মাত্র সাড়ে পাঁচ ডলারের মতো।

আসলে অলিম্পিকের ইতিহাসে ১৯১২ সালের স্টকহোম গেমসের পর আর কখনোই খাঁটি সোনার পদক দেওয়া হয়নি। সে সময়ের স্বর্ণপদকের ওজন ছিল মাত্র ২৬ গ্রাম। তখনকার স্বর্ণদরে যার মূল্য ছিল ২০ ডলারেরও কম। আজকের মার্কিন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে হিসাব করলে সেটি প্রায় ৫৩০ ডলারের সমান।

আরও পড়ুন

কিন্তু অলিম্পিক পদকের আসল জাদু লুকিয়ে আছে সংগ্রাহকদের চোখে। লন্ডনের বিখ্যাত নিলামঘর বাল্ডউইন’স-এর বিশেষজ্ঞ ডমিনিক চর্নি বলছেন, একটি অলিম্পিক পদক অনেক সময় তার ধাতুমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। কারণ, এর সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসরের সঙ্গে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ২০১৫ সালে ১৯১২ সালের স্টকহোম অলিম্পিকের একটি স্বর্ণপদক নিলামে বিক্রি হয়েছিল ১৯ হাজার পাউন্ডে, যা প্রায় ২৬ হাজার ডলারের সমান। পরের বছর ১৯২০ সালের অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিকের একটি ব্রোঞ্জ ‘অংশগ্রহণকারী পদক’ বিক্রি হয় ৬৪০ পাউন্ডে। ধাতুমূল্য প্রায় না থাকলেও ইতিহাসের ছোঁয়াই এটিকে মূল্যবান করে তুলেছিল।

তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ অলিম্পিয়ান তাঁদের পদক কখনো বিক্রি করেন না। চর্নির মতে, ‘খুব কম ক্রীড়াবিদই তাঁদের পদক ছাড়েন, কারণ এগুলো তাঁদের কাছে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি।’

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সোনা ও রুপার দামে কিছু ওঠানামা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘ মেয়াদে দাম আরও বাড়তে পারে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের কারণে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকবে। স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি কৌশল প্রধান ওলে হ্যানসেনের অনুমান, ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে দেওয়া স্বর্ণ ও রৌপ্যপদকগুলো হয়তো আজকের শীতকালীন অলিম্পিকের পদকগুলোর চেয়েও বেশি দামি হবে।

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন