আর্সেনাল কি আবারও লিগ ফসকাতে চলেছে?
‘দ্বিতীয় হওয়ার দুঃখ আমাদের থেকে আর কে-ই বা ভালো বোঝে?’ আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন এক আর্সেনাল সমর্থক। বলবেন না-ই বা কেন? তিন বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে আর্সেনাল। শুরুটা যেমনই হোক, শেষটা হচ্ছে লিগে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে। কখনো পয়েন্টের ব্যবধান ২, কখনো ৫, কখনো আবার ১০। কিন্তু জায়গাটা একেবারেই নির্ধারিত। মিকেল আর্তেতার অধীন আর্সেনালের ভাগ্য যেন ঘুরেফিরে থেমে আছে দুই নম্বরে এসেই। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে?
এবারের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। একূলে কেউ ওপরে উঠলে ওকূলে কেউ না কেউ পথ হারায়। দুর্দান্ত শুরুর পর পথ হারিয়েছে লিভারপুল। ভরাডুবির পরও কীভাবে কীভাবে যেন এখনো চ্যাম্পিয়নস লিগের লড়াইয়ে টিকে আছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। চমক হিসেবে অ্যাস্টন ভিলা শুরু থেকেই ধারাবাহিক। বাকি রইল শুধু আর্সেনাল। মৌসুমের শুরুর দিন থেকে এখন পর্যন্ত একটা দল যদি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে আসে, সে–ই আর্সেনাল। মিকেল আর্তেতা নিজের হাতে যে দলকে গড়ে তুলেছেন, সেই দল এখন সোনার ডিম পাড়ার হাঁস হয়ে প্রতিদান দিচ্ছে তাঁকে। কিন্তু সেই প্রতিদানও যেন মনঃপূত হচ্ছে না।
মিকেল আর্তেতা আর্সেনালে যোগ দিয়েছেন সেই ২০১৯ সালে। উনাই এমেরির বিদায়ের পর সাবেক খেলোয়াড়ের ওপরেই ভরসা রেখেছিল আর্সেনাল। মিকেল আর্তেতা সেই ভরসার প্রতিদান দিয়েছেন ঠিকই। দলকে প্রথম মৌসুমেই জিতিয়েছেন এফএ কাপ। কমিউনিটি শিল্ড জিতেছেন ২০২০ আর ২০২৩ সালে। অর্জন কাগজে–কলমে তাঁর কম নয়। কিন্তু আর্তেতা আটকে যাচ্ছেন একটা জায়গাতেই—ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা। সেই ২০০৪ সালে শেষবারের মতো লিগ শিরোপা জিতেছিল আর্সেনাল। সব রেকর্ড ভেঙে, অপরাজিত থেকে লিগ জিতেছিল আর্সেনাল। রুপালি শিরোপার বদলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল স্বর্ণালি শিরোপা। এর পর থেকে শিরোপার সঙ্গে যেন দা-কুমড়ো সম্পর্ক আর্সেনালের। অনেকবার কাছে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু ছুঁয়ে দেখা হয়নি।
আর্সেনাল অন্য ক্লাবগুলোর মতো শিরোপার জন্য তেমন পাগল নয়। বরং নতুন কোচদের ধীরে–সুস্থে প্রমাণ করার সুযোগ দেয়। আর্সেন ওয়েঙ্গার বহু বছর কোনো সাফল্য ছাড়াই টিকে ছিলেন কোচ হিসেবে। মিকেল আর্তেতাও সাত বছর কাটিয়ে দিয়েছেন এই পতাকার নিচে। যেটুকু সাফল্য পেয়েছেন, তা অন্য কোনো দলে হলে হয়তো অনেক দিন আগেই চাকরি থেকে বরখাস্ত হতেন। কিন্তু দল যেমন ভরসা রেখেছে তার ওপর, তিনিও নিজেকে শাণিত করেছেন। ঘরের ছেলে হয়ে ঘরের মাটিতেই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছেন।
কিন্তু স্বপ্নটা কি স্বপ্ন হয়েই রবে, নাকি সত্যি হবে, সেই প্রশ্নটাই এখন সামনে। কারণ, বরাবরের মতোই স্বপ্নটা ঠিক যত ওপরে দেখেছিল আর্সেনাল, ফসকানোর ঠিক ততটাই কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে তারা। এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২৮ রাউন্ডের ম্যাচ শেষ। যদিও আর্সেনাল ম্যাচ খেলেছে ২৯টি। ২৯ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ৬৪। তার ঠিক পেছনেই রয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। ২৮ ম্যাচে ৫৯ পয়েন্ট নিয়ে। আরেক ম্যাচ খেললে পয়েন্টের ব্যবধান দাঁড়াবে মাত্র ২-এ।
অথচ এক মাস আগেও আর্সেনাল সিটি থেকে এগিয়ে ছিল ৭ পয়েন্টের ব্যবধানে। দলের কন্ডিশন এতটাই ভালো ছিল যে চোখ বন্ধ করে অনেকে আর্সেনালকে শিরোপাপ্রত্যাশী বলে ধরেই নিয়েছিলেন। সিটি আর যাই হোক, এবার পারবে না—সে বিশ্বাস অনেকের মনেই জায়গা করে নিয়েছিল।
কিন্তু এই জায়গায় এসেই আর্সেনাল যেন আটকে গেছে। শেষ ৫ ম্যাচের ফর্ম দেখলেই সেটা স্পষ্ট। শেষ ৭ ম্যাচে আর্সেনাল জিতেছে মাত্র ২ ম্যাচে। ড্র করেছে ৪টি। আর হেরেছে ১টি। সেই হার এসেছে অফ ফর্মে থাকা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। বলতে গেলে ইউনাইটেডকে ফর্মে ফিরিয়েছেই এই আর্সেনাল। ৭ ম্যাচে আর্সেনাল পয়েন্ট হারিয়েছে মোট ১১! মিকেল আর্তেতা গত দুই-তিন মৌসুম ধরে দলকে যেভাবে খেলাচ্ছেন, ঠিক সেভাবে সুবিধা করতে পারছেন না দলের খেলোয়াড়েরা। বরং সময়ে-অসময়ে যেন সেটাই কাল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে সিটি এই সময়টাই কাজে লাগিয়েছে। গত ৭ ম্যাচে তাদের ড্র ২টি, আর হার ১টি। সেটাও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছেই। সিটি এই সময়ে পয়েন্ট হারিয়েছে মাত্র ৭টি।
মূল পার্থক্য দিন শেষে গড়ে দিয়েছে বড়দিনের পরের ফর্ম। বরাবরের মতোই বড়দিনের পর দুর্দান্ত ফর্মে ফিরেছে সিটি। সিটির হয়ে পেপ গার্দিওলার খুব সম্ভবত শেষ মৌসুম এটিই, তাই শেষটা রাঙিয়ে দিতে চান নিজের মতো করে। খেলোয়াড়েরাও তাই কোনো কমতি রাখছেন না। অন্যদিকে টানা তিনবার রানার্সআপ হওয়া আর্সেনাল যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে এত কিছুর মধ্যে। যেখানে লিড বাড়িয়ে নিয়ে উল্লাস করার কথা, সেখানে আর্সেনাল এখন কপাল চাপড়াচ্ছে। কারণ, কাঁধের ওপর নিশ্বাস ফেলছে স্বয়ং ম্যান সিটি। এবারও যদি শিরোপা ফসকে যায়, তবে আবারও হতাশায় ভুগতে হবে আর্সেনালকে।