আরবেলোয়া কি রিয়াল মাদ্রিদে টিকে থাকতে পারবেন?

রিয়াল মাদ্রিদের মৌসুমটা বদলে গেছে ঠিক হুট করেই। ভালোই চলছিল সবকিছু। জাবি আলোনসো কোচ হিসেবে মানিয়ে নিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন দলকে। হুট করেই এক ঘটনা থেকে যে ঘূর্ণিপাক শুরু হলো, রিয়াল মাদ্রিদ হারিয়ে গেল সেই ঘূর্ণিপাকে। এল ক্লাসিকোতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে উঠিয়ে নেওয়ার পর থেকেই যেন যত সমস্যার শুরু। বরখাস্ত হলেন জাবি আলোনসো। তাঁর জায়গায় এসেছেন আলভেরো আরবেলোয়া। কিন্তু আরবেলোয়ার চাকরিটাও কত দিন থাকবে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই। কারণ, পান থেকে চুন খসলেই বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ বরাবরই ছিল রিয়াল মাদ্রিদে।

আলভারো আরবেলোয়ার বড় হওয়া রিয়াল মাদ্রিদেই। রিয়াল মাদ্রিদে বড় হলেও মূল দলে সুযোগ পাওয়ার আগেই যোগ দেন লা করুনায়। সেখান থেকে লিভারপুল ঘুরে আবারও ফেরেন রিয়ালে। রিয়ালে যে খুব বেশি দিন মূল একাদশের খেলোয়াড় ছিলেন, তা নয়। বরং আরবেলোয়ার দেখা মিলত বেঞ্চেই। কিন্তু বেঞ্চে থেকেই মাঠের ভেতরটা চালানোর মতো প্রভাব ছিল তাঁর। তিনি ছিলেন দলের অঘোষিত নেতা। রিয়াল ছেড়ে এক মৌসুম ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট হামে খেলে অবশেষে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন তিনি।

আরও পড়ুন

খেলা ছেড়েই আরবেলোয়া ঝাঁপ দিয়েছিলেন কোচিংয়ে। কারণ, মাঠের ভেতর থেকে মাঠের বাইরের কার্যক্রমই তাঁকে টানত বেশি। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন পর্তুগিজ কোচ জোসে মরিনহো। আরবেলোয়ার খেলোয়াড়ি জীবনেও সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন মরিনহোই। তাই তো প্রিয় কোচের দর্শন মাথায় রেখেই নিজের কোচিং ক্যারিয়ার সাজিয়েছেন আরবেলোয়া। কোচিং লাইন্সেন্স পাওয়ামাত্রই ফিরে এসেছেন স্পেনে। পাঁচ বছর রিয়াল মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দল সামলানোর পর অবশেষে ২০২৫ সালে এসে কোচিং করানোর সুযোগ পান রিয়ালের বি টিম কাস্তিয়ায়। আর সেই চাকরি কাঁধে নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে নিয়ে আসা হলো রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলে। সেটাও আবার একসময়ের সতীর্থ শাবি আলোনসোকে সরিয়ে।

আরবেলোয়ার ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় প্রেরণা মরিনহো।
ছবি: এক্স

আরবেলোয়া রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এমন একটা সময়ে, যখন তাঁর কাছে কৌশল নয়, বরং দলটা সামলানোই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। দলের মধ্যে অন্তঃকোন্দলের শঙ্কা। আরবেলোয়া যে কারণে এসেই নিজের কৌশল বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাননি। বরং তাঁকে ভাবতে হয়েছে দলের সেরা খেলোয়াড়দের কীভাবে খুশি রাখা যায়। আরবেলোয়া যে গেগেনপ্রেসিং (প্রতিপক্ষকে পাল্টা চাপ দেওয়া) দেখিয়ে এসেছেন রিয়াল মাদ্রিদের যুব দলে, সেই গেগেনপ্রেসিং ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগই পাননি মূল দলে। যে কারণে আরবেলোয়ার খেলার ধরন অনেকটাই খেলোয়াড়ভিত্তিক হয়ে পড়েছিল শুরুতেই। সাফল্য আসতেও তাই সময় লাগছিল।

আরও পড়ুন
ভিনিসিয়ুস ফর্মে ফিরেছেন আরবেলোয়ার অধীনে।
ছবি: এক্স

একজন কোচ যখন পাঁচ বছরের বেশি সময় একই পদ্ধতিতে খেলে এসেছেন, নতুন খেলোয়াড়দের সেই পদ্ধতি না বুঝিয়েই যদি ভিন্নভাবে খেলানো শুরু করেন, তাহলে সমস্যা হওয়ারই কথা। হয়েছে সেটাই। বড় ম্যাচে গিয়ে ঠিকই গুবলেট পাকিয়ে ফেলেছে দল। কোপা দেল রেতে নিচু সারির একটি দলের কাছে হারতে হয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে সরাসরি বাছাই নিশ্চিত করতে গিয়ে হারতে হয়েছে বেনফিকার কাছে। বলতে গেলে চাপের মুখে যখনই পড়ছে রিয়াল, তখনই যেন ভেঙে পড়ছে।

রিয়াল মাদ্রিদের বড় বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রাখা। রিয়ালের বড় বড় অনেক জয়ের পেছনে রয়েছে শেষ মুহূর্তের গোল, চাপের মুখে কঠিন মানসিকতা নিয়ে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়া। সেই রিয়াল মাদ্রিদ যখন চাপ সামলাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন ঘুরেফিরে আঙুলটা যাচ্ছে কোচের দিকেই। আরবেলোয়া কি সেই জায়গায় ব্যর্থ হচ্ছেন?

আরও পড়ুন

আরবেলোয়া যতটা না ব্যর্থ হচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করছে তার কৌশলের সঙ্গে বাকিদের মানিয়ে নিতে না পারা। হুট করে দায়িত্ব পাওয়ায় কোচ হিসেবে নিজের আধিপত্য এখনো স্থাপন করতে পারেননি তিনি। যে কারণে প্রতি ম্যাচেই ৯০ মিনিট বরাদ্দ থাকে এমবাপ্পে আর ভিনিসিয়ুসের জন্য। তাঁরা যতই বাজে খেলুন না কেন, মাঠে থাকছেন পুরো সময়। ওসাসুনার বিপক্ষেই যেমন এমবাপ্পেকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি ডি বক্সে। অথচ তিনি বক্সে থাকলেও অন্তত দুটি গোল পেতেনই পেতেন। তবু তাঁকে তুলে আনা হয়নি। অতিরিক্ত স্ট্রাইকার আনতে গিয়ে ভালভার্দেকে তুলে দলের ভারসাম্য নষ্ট করেছেন আরবেলোয়া। ফলাফল? ওসাসুনার বিপক্ষে ২০১১ সালের পর আবারও রিয়ালের হার।

আরবেলোয়ার অধীনে এমবাপ্পে নেই সেই দুর্দান্ত ফর্মে।
ছবি: এক্স

আরবেলোয়ার সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদ এখনো পাকাপাকি চুক্তি করেনি। করেছে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত একটা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি। ফলে আরবেলোয়া নিজেও জানেন, অবিস্মরণীয় কিছু করতে না পারলে বেশি দিন রিয়ালে থাকতে পারবেন না তিনি। তাই হয়তো আরবেলোয়া নিজেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন, কী করা উচিত আর উচিত নয়। এই দ্বিধা থেকে যত দ্রুত বের হতে পারবেন, মাঠে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তত দ্রুত কোচ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন তিনি। তার আগপর্যন্ত এই কোচের চাকরি ঝুলে থাকবে সুতোয়।

আরও পড়ুন