ব্রাহিম ডিয়াজ কি মরক্কোর ‘বাজ্জো’
ফুটবল দুনিয়ায় একটা বাক্য হরহামেশাই শোনা যায়, ‘সক্রেটিস মারা গেছেন হেমলক পানে, নিটশে মতিভ্রমে আর বাজ্জো দাঁড়িয়ে।’ এই ছোট্ট তালিকায় চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে যুক্ত হতে পারে ব্রাহিম ডিয়াজের নাম। যিনি ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের সামনে।
ব্রাহিম ডিয়াজের সামনে মঞ্চটা প্রস্তুত ছিল নায়ক হওয়ার। এই জায়গাতে দাঁড়ানোর জন্য কত কষ্টই না করতে হয়েছে তাঁকে। ডিয়াজ জন্মেছিলেন স্পেনে, বড় হয়েছেন স্পেনে। যুবদল থেকে শুরু করে জাতীয় দলে অভিষেকও স্পেনের জার্সিতে। কিন্তু স্পেনের লাল জার্সিতে আর কখনোই সুযোগ পাওয়া হয়নি তাঁর। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়াতে দল পাল্টেছেন, বাবার সুবাদে পাওয়া মরক্কোর নাগরিকত্ব কাজে লাগিয়ে নাম লিখিয়েছেন জাতীয় দলে। ডিয়াজের ক্যারিয়ারে বাঁক এসেছে সেদিন থেকেই।
ব্রাহিম ডিয়াজ মরক্কোর নায়ক হয়ে উঠেছিলেন সেদিনই, যেদিন স্পেনের চাকচিক্য ছেড়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেলেন মরক্কোর জার্সি। গত বিশ্বকাপে চমক দেখানো মরক্কো দলকে অনন্য করে তুলেছিল ব্রাহিমের দুর্দান্ত ফর্ম। এবারের আফকন যেন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে কোয়ার্টার ফাইনাল, প্রতিটি ম্যাচের স্কোরশিটেই ছিল তাঁর নাম। জন্মভূমি না হয়েও ব্রাহিম তাঁর পারফরম্যান্স দিয়ে মরক্কোবাসীর কাছে হয়ে উঠেছিলেন খুব আপন। সেই রূপকথার পরিণতি এমন হবে, তা হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি কেউ।
ফাইনালে মঞ্চটা প্রস্তুত করা ছিল ব্রাহিম ডিয়াজের জন্যই। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ, চলছে যোগ করা অতিরিক্ত সময়ের খেলা। শেষ বাঁশি বেজে যাবে, এমন একটা সময়ে ডি বক্সের ভেতর পেনাল্টি পেল মরক্কো। কর্নার ক্লিয়ার করতে গিয়ে ব্রাহিম ডিয়াজকে ফেলে দিয়েছিলেন সেনেগালের ডিফেন্ডার মালিক ডিউফ। সেখান থেকে শুরু বাগ্বিতণ্ডা, তারপর কোচের নির্দেশে মাঠ ছেড়ে উঠে গিয়েছিল সেনেগালের পুরো দল। একা দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধু সাদিও মানে। অতঃপর তাঁর কথায় মাঠে ফিরতে রাজি হলো সেনেগাল, ১০ মিনিটের বিরতি শেষে আবারও ফিরল মাঠে। ফিরতে না ফিরতেই পেনাল্টি, মরক্কোর অধিনায়ক এন নেসেইরি সেই পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দিলেন ব্রাহিমকে।
ব্রাহিমের সামনে তখন অনেকগুলো মাইলফলক হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আফকনের এক আসরে ছয়টি ভিন্ন ম্যাচে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ, সঙ্গে পিতৃভূমি মরক্কোকে দীর্ঘ ৫০ বছর পর আফকন জেতানোর সুযোগ। ব্রাহিমের শটটাই হতে পারত মরক্কোবাসীর জীবনে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত। ব্রাহিম জানেন, চাপের মুখে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, তাই তো নিজের স্নায়ুর ওপর একটু বেশিই ভরসা রেখে ফেলেছিলেন তিনি। ঠান্ডা মাথায় ব্রাহিম বেছে নিলেন সবচেয়ে কঠিন পথটা, পানেনকা। যে কাজটা জিদান করেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে, ব্রাহিম সেটাই করতে চাইলেন আফকনের ফাইনালে। কিন্তু পানেনকা যেন এক দুমুখো তলোয়ার, যদি লাগে তো ইতিহাসের চূড়ায় আর যদি না লাগে, তবে এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কিছু নেই। ব্রাহিমের কপালে লেখা ছিল দ্বিতীয়টা। ব্রাহিমের পানেনকা যেমন নিখুঁত ছিল না, তেমনি গোলরক্ষক এদুয়ার্দো মেন্দি আন্দাজ করে ফেলেছিলেন তাঁর কৌশল। ব্রাহিমের শট গোলবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না, এক ধাপ এগিয়ে তা অনায়াসে আগলে নিলেন মেন্দি।
ব্রাহিম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন এক সেকেন্ড। স্তব্ধ হয়ে রইল স্বাগতিক মরক্কোবাসী। যার ওপর ভর করে পুরো দল তাণ্ডব চালাল আফকনে, সেই ব্রাহিম ডিয়াজ মিস করলেন পেনাল্টি, তাও আবার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে! ব্রাহিম ডিয়াজের সেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা যেন একটা দৃশ্যকেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বারবার। আজ থেকে ৩২ বছর আগে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালিয়ান তারকা রবার্তো বাজ্জো বিশ্বকাপ ফাইনালে পেনাল্টি উড়িয়ে মেরেছিলেন গোলবারের ওপর দিয়ে। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি বাজ্জো ভুলতে পারেননি আজও। দর্শকেরা ভুলে যেতে চাইলেও তিনি ভোলেন না। তাঁর ক্যারিয়ারই যেন থেমে আছে যুক্তরাষ্ট্রের রোজ বোল স্টেডিয়ামেই।
ইতিহাস গড়া থেকে এক মুহূর্ত দূরে ছিল মরক্কো, নিজেদের মাটিতে আফকন জেতার আনন্দ, চাবিকাঠি ছিল ব্রাহিমের হাতে। ব্রাহিম পারেননি। পুরো টুর্নামেন্ট দুর্দান্ত খেলে এসে খেই হারিয়েছেন শেষ সেকেন্ডের পেনাল্টিতে। সেনেগালের মিডফিল্ডার পাপা গেই মরক্কোর হাতের মুঠোয় থাকা শিরোপা ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন সেনেগালে। ফিফা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে গোল্ডেন বুট নেওয়ার সময় ব্রাহিম তাকিয়ে ছিলেন দূর শূন্যে। মনে হচ্ছিল কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন। ব্রাহিম হারিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে, এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন রাবাতের সেই প্রিন্স আবদেল্লাহ স্টেডিয়ামে, এক বুক হতাশা নিয়ে। ব্রাহিম জিদান হয়ে উড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু হয়ে গেলেন রবার্তো বাজ্জোর মতো খলনায়ক।