বরখাস্ত মানেই শেষ নয়, বরং জাবি আলোনসোর শুরু
বার্সেলোনার কাছে হারার পর জাবি আলোনসো প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরবর্তী ম্যাচের। এর মধ্যেই ডাক এল, রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমিতে যেতে হবে। সেখানে গিয়েই শুনলেন, চাকরিটা আর নেই তাঁর। পত্রপাঠে তাঁকে বিদেয় করে দেওয়া হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ মিডিয়ায় খবরটা এখনো এ রকমই। কেউ বলছেন, জাবি আলোনসো নিজে চাকরি ছেড়েছেন, কেউ বলছেন হুট করেই তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিদায়ের চিঠি। তবে ঘটনা যেটাই হোক না কেন, জাবি আলোনসো আর রিয়াল মাদ্রিদে নেই, এটাই সত্য।
রিয়াল মাদ্রিদে জাবি আলোনসো ভিড়েছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। বায়ার লেভারকুসেনকে নিয়ে যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, জাবি আলোনসোকে নিয়ে তাই আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল রিয়াল সমর্থকদের মনে। শুধু রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকেরা নয়, পুরো ফুটবলবাসী মুখিয়ে ছিল, জাবি আলোনসো কীভাবে রিয়াল মাদ্রিদকে সামলান, সেটা দেখার জন্য। কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রা ভঙ্গ হলো মাত্র সাত মাসেই। ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে স্প্যানিশ সুপার কাপ, এখানেই থামতে হলো জাবি আলোনসোর যাত্রা।
রিয়ালে আলোনসোর যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। জাবি জানতেন, তাঁর ওপর দায়িত্ব শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় দল সামলানোর নয়, বরং একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে নামীদামি খেলোয়াড় আর তাঁদের ইগো সামলানোর লড়াইও। প্রচলিত আছে, রিয়াল মাদ্রিদে কোচের দরকার হয় না, কড়া মাস্টার এসে এই দলে টিকতে পারেন না। বরং তাদের দরকার হয় এমন একজনের যিনি বড় ভাইয়ের মতো মাথায় হাত বুলিয়ে পুরো দলকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাখবেন। সেই কাজটা খুব ভালোভাবে করতে পেরেছিলেন জিনেদিন জিদান। যার ফল খেলোয়াড়েরা দিয়েছে মাঠে। কার্লো আনচেলত্তি ঠিক বড় ভাই ছিলেন না, কিন্তু পিতার মতো আগলে রেখেছিলেন প্রতিটি খেলোয়াড়কে। উদ্যাপন করেছেন যেমন একসঙ্গে, তেমনই প্রয়োজন হলে হালকা শাসনও করেছেন। ফলে রিয়াল মাদ্রিদকে ভেতরে থেকে যতটা না ফুটবল দল মনে হতো, তার থেকে বেশি মনে হতো ভাই-বন্ধুরা মিলে মজা করে খেলছে।
জাবি আলোনসো ঠিক সেই ধারার লোক নন। তিনি বেড়ে উঠেছেন রিয়াল সোসিয়েদাদ, লিভারপুলের মতো দলে। যেখানে কড়া শাসনটাই ছিল মুখ্য। হ্যাঁ, রিয়াল মাদ্রিদেও ছিলেন বছর পাঁচেক, কিন্তু এর মধ্যে বড় সময়জুড়ে রিয়ালের অভিভাবক ছিলেন হোসে মোরিনহো। যিনি খেলার মাঠে কড়া মাস্টার হিসেবেই পরিচিত। জাবি রিয়াল ছেড়ে গিয়ে পেয়েছেন পেপ গার্দিওলার সান্নিধ্য। তাঁর ফুটবলীয় সংস্কৃতি গড়েই উঠেছে কড়া মাস্টারদের হাত ধরে। এবং কোচিং জীবনটাও তিনি চালিয়েছেন ঠিক সেভাবেই। ঠিক কড়া না হলেও তাঁর মধ্যে ‘হেডমাস্টার’ হওয়ার সব উপাদানই ছিল।
জাবি আলোনসোর সেই হেডমাস্টার স্বভাব তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে বায়ার লেভারকুসেনে। কারণটা বেশ স্বাভাবিক, দল হিসেবে বায়ার শ্রেষ্ঠত্বের ধারেকাছেও ছিল না, ফলে খেলোয়াড়েরা তাঁর কথা শুনত, বোর্ড থেকে শুরু করে বলবয়, সবাই আস্থা রাখতেন জাবি আলোনসোর ওপর। লেভারকুসেনে পুরোপুরি ম্যানেজার হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। ফলে তাদের নিয়ে জার্মানি জয় করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। কারণ, সবকিছুই ছিল তাঁর হাতে মুঠোয়।
কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে এসেই বুঝতে পেরেছেন, গল্পটা ঠিক রূপকথা নয়। ফুটবল বিশ্বে প্রতিটা দল একভাবে চলে না। ব্যর্থতার পর কেউ তাঁকে দ্বিতীয় সুযোগ দেবে না, কেউ কেউ পান থেকে চুন খসে মাটিতে পড়ার আগেই পদত্যাগপত্র হাতে ধরিয়ে দেয়। কারণ, বিশাল প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার থেকে তাদের কাছে প্রয়োজন জয়, প্রয়োজন শিরোপা। রিয়াল মাদ্রিদ সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিয়েছে জাবি আলোনসোকে। জাবি আলোনসো যে স্বপ্ন নিয়ে দল তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব আর আলোনসোর অনভিজ্ঞতার কাছে। অভিজ্ঞতা যে সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে সহজেই, সেই সমস্যা সামলাতে বেগ পেতে হয়েছে তাঁকে।
কার্লো আনচেলত্তি বা জিনেদিন জিদানের মধ্যে সেই অধিনায়কসুলভ মনোভাব ছিল খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই। সেই অনুযায়ী জাবি আলোনসো ছিলেন শান্ত-শিষ্ট ভদ্রলোক। নেহাতই ঝামেলায় জড়াতেন না। সেই স্বভাবটা কোচিং করতে এসেও স্পষ্ট। এল ক্লাসিকোতে ভিনিসিয়ুসকে তুলে আনার পর যে মনোভাব দেখিয়েছিলেন, সেখান থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। সেই সমস্যার সমাধান টানা ম্যাচ জিতেও করতে পারেননি তিনি। বরং দিনে দিনে স্পষ্ট হয়েছে ফাটল, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন প্রাধান্য। ফলে বছরের প্রথম এল ক্লাসিকোতে হারতেই বরখাস্তের খড়্গ নেমে এল আলোনসোর কাঁধে।
রিয়াল মাদ্রিদে যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন, সেই স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে সাত মাসেই। স্বপ্ন ভাঙা মানেই যে সবটা শেষ, জাবি আলোনসোর ক্ষেত্রে সেটা একেবারেই সত্য নয়। বরং জাবি আলোনসোর সামনে যে নতুন পথ খুলে দিল রিয়াল মাদ্রিদ থেকে বরখাস্ত হওয়া। রিয়াল মাদ্রিদ আজীবনই ট্রফি খোঁজা দল। তাদের কাছে প্রজেক্ট, কোচ এসবের মূল্য খুবই কম। রিয়াল মাদ্রিদে ৯০ পয়েন্ট নিয়ে, চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েও পরের মৌসুমে বরখাস্ত হওয়ার ঘটনা আছে। নামীদামি কোচ যে–ই হন না কেন, রিয়াল মাদ্রিদে টিকে থাকার জন্য ট্রফির বিকল্প নেই। কিন্তু ফুটবল বিশ্ব বদলে যাচ্ছে দ্রুত। দলগুলো এখন শুধু আর ট্রফি দেখে না। বরং তারা খোঁজে প্রজেক্ট। একজন কোচের অধীনে লম্বা সময় ধরে বিশ্বাস রাখা হয়, তাঁদেরকে সময় দেওয়া হয়, বিনিয়োগ করা হয়। ঠিক যেমনটা করেছিল লেভারকুসেন। লম্বা সময়ের জন্য আস্থা রেখেছিল আলোনসোর ওপর। সে রকম চিন্তাভাবনা নিয়ে গড়ে উঠছে বর্তমান সময়ের দলগুলো। কারণ, একবার দল দাঁড়িয়ে গেলে শিরোপা এমনিতেই আসবে। আধুনিক সময়ের ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই ভিত্তিতেই। লম্বা সময় ধরে কোচের দুর্দান্ত প্ল্যানিং তাদের আজ এনে দিচ্ছে সাফল্য। জাবি আলোনসো সেই পথের অনুসারী। তাই তো তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য, তাঁকে কেন্দ্র করে দল সাজানোর জন্য মুখিয়ে আছে ইউরোপের হেভিওয়েট দলগুলো।
রিয়াল মাদ্রিদ আলোনসোর জীবনে একটা উতরাই মাত্র। সেই উতরাই উতরে গেছেন তিনি। যেমন শিখেছেন চাপের মধ্যে কীভাবে দল সামলাতে হয়, তেমনই জেনেছেন ইগো বড় হয়ে গেলে দল কীভাবে নিমেষেই মাটিতে মিশে যায়। রিয়াল তাই জাবি আলোনসোর জন্য একটা শিক্ষাসফর বটে। যে শিক্ষাটা তাঁকে দুই পা পিছিয়ে দিয়েছে বটে, কিন্তু সামনে বড় কিছুর জন্য প্রস্তুতও করেছে। সেই প্রস্তুতি কতটা কাজে লাগাতে পারেন, সেই পরীক্ষা জাবি আলোনসোর সামনে।