খেলোয়াড়েরা কেন বুটের গোড়ালি কেটে মাঠে নামছেন

চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগাল ও স্পেনের ম্যাচের কথা মনে আছে? এই তো কয়েক দিন আগেই হলো, স্পেন ১-০ গোলে জিতেও গেল ম্যাচটা। টান টান উত্তেজনার ওই ম্যাচে পর্তুগিজ তারকা পেদ্রো নেতো মাঠে নেমেছেন ‘ছেঁড়া’ বুট পরে। ছেঁড়া বলার চেয়ে ‘কাটা’ বললে বোধ হয় বেশি মানানসই হবে। ৩০০ পাউন্ড দামের চকচকে আধুনিক বুট, অথচ ঠিক পেছনের দিকে গোড়ালির কাছে কাঁচি দিয়ে গোল করে কাটা! আর সেই ফুটো দিয়ে উঁকি মারছে নেতোর মোজা। এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখে তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, আধুনিক প্রযুক্তিতে মিলিমিটার মেপে তৈরি করা এত দামি একটা বুট কেউ সাধ করে কাঁচি দিয়ে কাটে কেন? এটা কি ড্রেসিংরুমের কোনো অদ্ভুত রসিকতা? নাকি ফুটবলের মাঠে নতুন কোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড?

আসলে এর কোনোটাই নয়। শুধু পেদ্রো নেতো নন, তুমি যদি খেয়াল করো, দেখবে ব্রাজিলের ফিলিপে কুতিনহো, রবার্তো ফিরমিনো কিংবা জার্মানির ম্যাটস হামেলসের মতো তারকারাও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে এমন অদ্ভুত কাটা বুট পায়ে দিয়ে মাঠে নেমেছেন। অদ্ভুত এই কাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পরিচিত একটি যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক সমস্যা, নাম হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটি।

নাম শুনে ভড়কে যেয়ো না, সহজ করে বলছি? হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটি হলো গোড়ালির পেছনের দিকে হাড়ের একধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। আমাদের গোড়ালির ঠিক যেখানে অ্যাকিলিস টেন্ডন যুক্ত থাকে, সেখানে হাড় একটু বেশি বেড়ে গিয়ে একটা উঁচু ঢিবির মতো তৈরি করে। লন্ডনের বিশেষজ্ঞ স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্টদের মতে, গোড়ালিতে এই বাড়তি হাড় থাকলেই যে ব্যথা হবে, তা কিন্তু নয়। অনেকেই সারা জীবন এই উঁচু হাড় নিয়ে দিব্যি পার করে দেন। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় যখন তুমি খুব আঁটসাঁট জুতা বা বুট পরবে।

আরও পড়ুন

গোড়ালির ওই অংশে অ্যাকিলিস টেন্ডনের পাশাপাশি ‘বার্সা’ (বার্সেলোনা ক্লাব থেকে এ নাম আসেনি!) নামের তরলে পূর্ণ ছোট একটি থলি থাকে। এর কাজ হলো আমাদের হাঁটাচলার সময় গোড়ালিতে কুশনের মতো কাজ করা। এখন ভাবো, একজন ফুটবলার যখন শক্ত ও আঁটসাঁট বুট পায়ে দিয়ে দৌড়ান, তখন বুটের পেছনের শক্ত অংশটি ওই উঁচু হাড়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়। হাড় তখন গিয়ে ঘষা খায় টেন্ডন ও বার্সার সঙ্গে। শুরু হয় তীব্র ব্যথা ও প্রদাহ। হাড়ের গুঁতায় টেন্ডন ফুলে যায়, বার্সা ইরিটেটেড হয়; আর যত বেশি দৌড়াবে, এ ব্যথা ততই বাড়তে থাকবে। একপর্যায়ে ক্রমাগত এই ঘর্ষণের কারণে সেখানে নতুন করে আরও হাড়ের সৃষ্টি হয়, যা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে।

এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কেন বুট কাটা হয়! ফুটবলাররা তো আর গোড়ালির সামান্য ব্যথার জন্য বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল বা চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো বড় ম্যাচ খেলা ছেড়ে দিতে পারেন না। তাই ব্যথাটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁরা বুটের পেছনে ওই শক্ত অংশটা কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলেন। এতে গোড়ালির ওই উঁচু হাড়টি আর বুটের সঙ্গে ঘষা খায় না, কিছুটা স্বস্তিতে থাকার জায়গা পায়।

বড় ক্লাবগুলোয় অনেক সময় ফুটবলাররা নিজেরা এ কাজ করেন না। ক্লাবের পেশাদার চিকিৎসকেরা মেপে মেপে ঠিক ওই জায়গাটা কেটে দেন, যাতে বুটের ব্যালান্স নষ্ট না হয়, আবার ব্যথাও না লাগে।

এখন প্রশ্ন করতে পারো, খেলোয়াড়েরা তো অনেক টাকার মালিক হন। তাঁরা কেন চিকিৎসা করেন না? এর কি কোনো চিকিৎসা নেই? ১৯২৭ সালে প্যাট্রিক হ্যাগলান্ড নামের এক সুইডিশ সার্জন প্রথম এ সমস্যা শনাক্ত করেছিলেন বলে তাঁর নামেই রোগটির নামকরণ হয়। চিকিৎসকদের মতে, একবার হাড় বেড়ে গেলে তাকে তো আর জাদুর মতো গায়েব করে দেওয়া যায় না। তাই প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে এর ব্যথা ও প্রদাহ কমানো। ফিজিওথেরাপি, শকওয়েভ থেরাপি বা ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্যথা কমানো হয়। তবে হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটি হলে শক্ত জুতা পরা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের ৮০০ মিটার দৌড়বিদ ডোনোভান ব্রাজিয়ারের কথাই ধরো। ২০১৯ সালে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রেকর্ড গড়ে সোনা জেতা এই তরুণ অ্যাথলেট হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটির কারণে টানা তিন বছর ট্র্যাকে নামতেই পারেননি! বাধ্য হয়ে তাঁকে একাধিকবার অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হয়েছে।

ব্রিটিশ ক্রীড়া সাংবাদিক স্টুয়ার্ট জেমস নিজেও এ সমস্যায় ভুগেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা শুনলে তুমি শিউরে উঠবে। ভালো দিনগুলোয় পায়ে একটা ভোঁতা ব্যথা থাকত তাঁর, আর খারাপ দিনগুলোয় গোড়ালি রীতিমতো দপদপ করে কাঁপত। আঁটসাঁট জুতা পরা তো দূরের কথা, একটু শক্ত জুতা দেখলেই তাঁর ভয় লাগত। খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটার কারণে অনেকেই তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত। শেষমেশ চিকিৎসকের কাছে গেলে এক্স-রে করে দেখা যায়, গোড়ালিতে নতুন হাড় গজিয়ে রীতিমতো প্রদাহ শুরু হয়েছে।

পেলের বিখ্যাত বুট
ছবি: এক্স

অস্ত্রোপচার করে বাড়তি হাড় কেটে ফেলাই এ যন্ত্রণার চূড়ান্ত সমাধান। কিন্তু এই অস্ত্রোপচারের পর সেরে ওঠার সময়টা ভীষণ ধীর ও কষ্টের। জেমসের ভাষায়, মনে হয় যেন কেউ গোড়ালির ওপর করাত চালিয়ে দিয়েছে! অনেক সময় সার্জনরা অ্যাকিলিস টেন্ডন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে, বাড়তি হাড় কেটে ফেলে আবার টেন্ডন জোড়া লাগিয়ে দেন। এই দীর্ঘ পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার চেয়ে বুটের পেছনে ছোট একটা ফুটো করে নেওয়াটাই ফুটবলারদের কাছে বেশি সহজ মনে হয়।

ফুটবলাররা সাধারণত অতিরিক্ত টাইট বুট পরেন এবং অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি করেন বলেই তাঁদের মধ্যে এই হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটির প্রকোপ বেশি দেখা যায়। তাই মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে খেলা তারকা ফুটবলার আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দামি বুটের মাঝখানে এই ছোট্ট একটা ছিদ্রই অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় স্বস্তির কারণ।

ভবিষ্যতে হয়তো তুমি টিভিতে আবারও কোনো ফুটবলারের বুটের পেছনে ফুটো দেখবে। তখন বুঝে নিয়ো, এটা তাঁর কোনো ট্রেন্ড নয়, বরং লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে গোড়ালির ব্যথা সহ্য করে নিজ দলের জন্যই মাঠে নিজের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছেন। তাই তো তুমি এত আনন্দ নিয়ে খেলাটা উপভোগ করতে পারছ!

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন