রাশিয়ায় ফরাসি বিপ্লব

২০১৮ বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচনের আগেই বাতিল করা হয় ফিফার ‘বিশ্বকাপ রোটেশন পদ্ধতি’। ফলে সবার জন্যই সুযোগ ছিল আয়োজক দেশ হওয়ার। স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামকে হারিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিড জিতে নেয় রাশিয়া। বিশ্বকাপের ২১তম আসরের জন্য ভেন্যু হয় রাশিয়া।

কিন্তু বিশ্বকাপ যত ঘনিয়ে আসতে থাকে, রাশিয়াকে ঘিরে তৈরি হয় সংকট। ২০১৪ সাল থেকেই ইউক্রেন-রাশিয়ার মতবিরোধ চলতে থাকে। এ অবস্থায় রাজনৈতিকভাবে অস্থির একটি দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপক্ষে ভোট দেয় অনেকে। এমনকি ফিফাও দ্রুতগতিতে বিকল্প আয়োজক দেশকে প্রস্তুত থাকতে বলে। এ ছাড়া রাশিয়ার নামে ভোট চুরির অভিযোগ আনে ইংল্যান্ড। সব মিলিয়ে রাশিয়ার বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলেও বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতে আসতে কেটে যায় সবকিছু।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের পোস্টার।
ছবি: এক্স

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে আনা হয় ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর। রেফারিং নিয়ে যেন কেউ কোনো অভিযোগ তুলতে না পারে, সেটারই চেষ্টা ছিল ফিফার। সফলও হয়েছে অনেকাংশে।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বাছাইপর্ব থেকেই। দুই ইউরোপিয়ান জায়ান্ট ইতালি আর নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপে নাম লেখানোর আগেই বাদ পড়ে বিশ্বকাপ থেকে। অন্যদিকে ‘বিশ্বজয়ের অভিশাপ’ মাথায় নিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই বাড়ির পথ ধরে চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের আসরে এভাবে প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েছিল স্পেন (২০১৪) ও ফ্রান্স (২০০২)। অনেকেই একে ‘বিশ্বকাপের অভিশাপ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

তবে রাশিয়া বিশ্বকাপে সবাইকে অবাক করে বিশ্বকাপের সারপ্রাইজ প্যাকেজ হয়ে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। লুকা মদরিচ, ইভান রাকিতিচ, মারিও মানজুকিচ–ক্রোয়েশিয়া দলে প্রতিভার অভাব ছিল না কখনোই। কিন্তু একসঙ্গে ক্লিক করতে পারছিল না কোনো আসরেই। ২০১৮ বিশ্বকাপটা ক্রোয়েশিয়ার জন্য হয়ে গেল সুবর্ণ সুযোগ। আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া আর ইউরোতে চমকজাগানো আইসল্যান্ড—‘গ্রুপ ডি’ গ্রুপ অব ডেথই ছিল। সেখান থেকে সব ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে চলে গেল ক্রোয়েশিয়া।

প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠলেও ক্রোয়েশিয়াকে ফিরতে হয়েছিল খালি হাতে।
ছবি: এক্স
আরও পড়ুন

গ্রুপ পর্ব ক্রোয়েশিয়ার জন্য যতটা সহজ ছিল, নকআউট পর্ব ছিল ততটাই কঠিন। প্রতিটি ম্যাচের ফলাফলের জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে টাইব্রেকারে। আর সেখানে ক্রোয়েশিয়ার অবিসংবাদিত নায়ক হয়ে উঠেছিলেন ৩৩ বছর বয়সী গোলরক্ষক দানিয়েল সুবাসিচ। পরপর দুই ম্যাচে দলকে টাইব্রেকারে রক্ষা করে শুধু ক্রোয়েশিয়া নয়, পুরো বিশ্বের ফুটবল-ভক্তদের মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। ডেনমার্কের বিপক্ষে তিনটি, রাশিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে দলকে তুলেছিলেন সেমিফাইনালে। সেমিফাইনালেও ম্যাচ গেছে অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে মারিও মানজুকিচের ১১০ মিনিটের গোলে ফাইনাল নিশ্চিত করে ক্রোয়েশিয়া। আর শেষ মিনিটে হ্যারি কেইনের শট থামাতে গিয়ে ডান পায়ের পেশিতে চোট পান সুবাসিচ। আর সেটাই হয়ে রইল ক্রোয়েশিয়ার জন্য কাল। অপর পাশ থেকে ফাইনালে ওঠা ফ্রান্স ঠিক সেটাকেই ব্যবহার করল।

ফ্রান্সের বিশ্বকাপের রাস্তাটা ক্রোয়েশিয়ার মতো ছিল না। বরং তারা পার হয়ে এসেছিল তুলনামূলক এক মসৃণ ড্র। গ্রুপ পর্বে দুই জয়, এক ড্র নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় পর্বে ওঠে ফরাসিরা। এরপর আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে আর বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে। নকআউটের প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিরোধ গড়ে তুললেও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন ১৯ বছর বয়সী কিলিয়ান এমবাপ্পে। গ্রিজমান-এমবাপ্পে জুটি সামনে যাকেই পেয়েছে, তার ওপর দিয়েই চালিয়েছে স্টিমরোলার। ২০১৪ বিশ্বকাপের রানার্সআপ আর্জেন্টিনা কিংবা বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম কেউই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সের সামনে।

আরও পড়ুন
মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান এমবাপ্পে।
ছবি: এক্স

রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালের দুই দলের আপাতদৃষ্টে ছিল না কোনো দুর্বলতা। কিন্তু সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দানিয়েল সুবাসিচের চোট হয়ে দাঁড়ায় ক্রোয়েশিয়ার বড় বাধা। পেইনকিলার নিয়ে খেলতে নামলেও ডান পাশে ঠিকমতো ঝাঁপ দিতে পারছিলেন না তিনি। ফ্রান্স সে সুযোগটাই নিয়েছে পুরো ম্যাচে।

তবে ফ্রান্সকে ফাইনালে এগিয়ে নিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ারই একজন, ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার মারিও মানজুকিচ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে আত্মঘাতী গোল দেখেছিল বিশ্ব। যদিও তার ১০ মিনিটের মাথাতেই পেরিসিচের গোলে সমতায় ফিরেছিল ক্রোয়েশিয়া। ৩৮ মিনিটে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স, সেখানে তাদের এগিয়ে নিয়ে যান গ্রিজমান। ৫৯ মিনিটে পগবা আর ৬৫ মিনিটে এমবাপ্পে ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ-স্বপ্নে শেষ পেরেক ঠুকে দেন। যদিও ৬৯ মিনিটে নিজের গোলের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন মানজুকিচ, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। ম্যাচ শেষ হয় এমবাপ্পে-গ্রিজমানদের হাতে শিরোপা দিয়েই।

১৯৯৮ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতে ফ্রান্স; অন্যদিকে অধিনায়ক ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার বিরল রেকর্ড গড়েন দিদিয়ের দেশম। তাঁর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার ও ব্রাজিলের মারিও জাগালো।

আরও পড়ুন