যেভাবে জন্ম নিল পানেনকা নামের পেনাল্টি কিক
কিছুদিন আগে শেষ হলো আফ্রিকান কাপ অব নেশনস। এবারের টুর্নামেন্টের ফাইনালে নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ দিকে একটা পেনাল্টি কিক পেয়েছিল স্বাগতিক মরক্কো। পানেনকা স্টাইলে পেনাল্টি নিতে গিয়ে ব্রাহিম দিয়াজ সেটি মিস করেন। আর সেনেগালের কাছে হেরে মরক্কো হারায় শিরোপা জয়ের সুযোগ।
প্রশ্ন হচ্ছে, পানেনকা নামের পেনাল্টি কিক কী? কীভাবে হলো এর প্রচলন?
সাধারণত পেনাল্টি কিক নেওয়ার সময় খেলোয়াড়েরা খুব জোরে গোলকিপারে ডানে বা বাঁয়ে শট নেয়। কিন্তু পানেনকা পেনাল্টি কিকে খেলোয়াড়েরা কিক নেন ভিন্ন কৌশলে। মাথা ঠান্ডা রেখে আলতো করে বলটায় কিক করেন। এমনভাবে মারেন, যেন গোলরক্ষক টেরই না পায় তার মাথার ওপর কিংবা পাশ দিয়ে ভাসতে ভাসতে বলটা জালে গিয়ে প্রবেশ করেছে। এই কৌশলের নামই পানেনকা।
পানেনকা নাম কেন
ফলের নাম যদি বৃক্ষের পরিচয় হয়, তাহলে পানেনকা কিকের নামই বলে দিচ্ছে এই বিশেষ ধরনের পেনাল্টি কিক নেওয়ার কৌশল যিনি আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর নামের কোথাও না কোথাও পানেনকা রয়েছে।
পানেনকা একজন ফুটবল খেলোয়াড়। পুরো নাম আন্তোনিও পানেনকা। তবে পানেনকার জন্ম যেখানে, সেখানে প্রথমে এই বিশেষ পেনাল্টি কিকের নাম রাখা হয়েছিল ভ্রাসোভিচকি ডলুবাক। অর্থাৎ ভ্রাসোভিচকি এলাকায় যেভাবে বল ভাসিয়ে গোল দেওয়া হয়। ভ্রাসোভিচকি হচ্ছে পানেনকার জন্মস্থান।
পানেনকার সময় অঞ্চলটি এমন একটি দেশের অংশ ছিল, যা এখন আর পৃথিবীর মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে সময় দেশটির নাম ছিল চেকোস্লোভাকিয়া। বর্তমানে এটি চেক প্রজাতন্ত্রের অংশ।
তবে পানেনকা পেনাল্টি কিকের আরও বেশ কিছু মজার নাম রয়ছে। ইতালিতে এর নাম ইল কুকিআইও। যার মানে চামচ। রসগোল্লা যেমন চামচে করে সহজে মুখে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, ঠিক তেমনি সহজভাবে পেনাল্টি কিকে গোল দেওয়ার নাম হচ্ছে কুকিআইও। ব্রাজিলে এর নাম কাভাডিনহা। কাভাডিনহা মানে অনায়াসে গর্ত করা। মানে সামান্য খুঁড়ে গুপ্তধন পেয়ে যাওয়া আরকি! আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য স্প্যানিশভাষী অঞ্চলে এর নাম পেনাল পিকাডো। মানে গোলকিপারকে উত্ত্যক্ত করে বা বোকা বানিয়ে গোল করা।
যে দেশে যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, সারা বিশ্ব এই পেনাল্টি কিককে ফুটবলপ্রেমীরা একটাই নামে চেনেন—পানেনকা পেনাল্টি কিক, যার আবিষ্কারক আন্তোনিও পানেনকা।
যদিও প্রাগ বা চেকোস্লোভাকিয়ার অনেকেই অনেক আগে পানেনকার পেনাল্টি কিকের সাক্ষী হয়েছিল, কিন্তু বিশ্ব, আরও নির্দিষ্ট করে বললে পশ্চিমা বিশ্ব ও পশ্চিম ইউরোপ প্রথম এই পেনাল্টি কিক দেখে ১৯৭৬ সালে।
সেবার ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসেছিল যুগোস্লাভিয়ায়। এখন যুগোস্লাভিয়া নামের দেশটিও আর নেই, তবে এখন এর একটি অংশ সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের রেড স্টার স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেবার ইউরোর ফাইনালে ওঠে পশ্চিম জার্মানি ও চেকোস্লোভাকিয়া। সে সময় নিয়ম ছিল ফাইনাল খেলা যদি ড্র হয় তাহলে আবার সেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।
তবে ফাইনালের আগে ম্যাচ অফিশিয়ালরা এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সিদ্ধান্ত হয় ম্যাচ ড্র হলে আর কোনো খেলা হবে না। এর বদলে পেনাল্টি শুট আউটে নির্ধারিত হবে চ্যাম্পিয়ন হবে কে।
সেবার সব দিক দিয়ে টুর্নামেন্টে ফেবারিট ছিল পশ্চিম জার্মানি। তাই তারা দুবার ফাইনাল খেলতে অনিচ্ছুক ছিল। আরও বিশেষ করে এই কারণে যে পশ্চিম জার্মানি নিশ্চিত ছিল যে টাইব্রেকারে তারাই জিতবে। এর কারণ তাদের খেলোয়াড়েরা পেনাল্টি কিকে খুবই দক্ষ, আর তাদের গোলবারের নিচে জার্মান তথা বিশ্বের সেরা গোলকিপার সেপ মেয়ার।
ফাইনাল ম্যাচ শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে অমীমাংসিত থাকে। যখন পেনাল্টি শুট আউট শুরু হয় তখন জার্মানরা নিশ্চয় হেসেছিল। কিন্তু জার্মানির ৪ নম্বর খেলোয়াড় গোলের বদলে গোলপোস্টের বাইরে বল পাঠিয়ে দেন।
চেকোস্লোভাকিয়ার হয়ে শেষ পেনাল্টিটি নিতে আসেন আন্তোনিও পানেনকা। যদি তিনি গোল করেন তাহলে নিশ্চিত হবে চেকোস্লোভাকিয়ার জয়, সেই সঙ্গে শিরোপা। আর যদি তিনি তা করতে না পারেন তাহলে আবার শুরু হবে পেনাল্টি শুট আউট।
অনেক দূর থেকে বলের কাছে এসে পানেনকা এমন ভাব করলেন যেন তিনি খুব জোরে বলটাকে মারবেন, যার ফলে জার্মান গোলরক্ষক ডান দিকে ঝাঁপ দিলেন। আর স্টেডিয়ামের সবাই দেখলেন বলটা খানিকটা আস্তে গোলকিপারের বিপরীত দিক দিয়ে জালে প্রবেশ করছে।
পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ল। পরদিন সাংবাদিকদের কলমে জন্ম নিল এক নতুন ধরনের পেনাল্টি কিকের নাম—পানেনকা।
তবে রাতারাতি বা হঠাৎ করে এই পেনাল্টি কিকের জন্ম হয়নি। পানেনকা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এর জন্য তিনি বছরের পর বছর ধরে চিন্তাভাবনা ও সাধনা করেছিলেন।
পানেনকা পেনাল্টি কিকের জন্ম পানেনকার নিজ দেশ চেকোস্লোভাকিয়ায়। স্বদেশে তিনি যে দলে খেলতেন সেই দলের নাম ছিল বোহেমিয়ান। সে সময় প্র্যাকটিস ম্যাচে পানেনকা প্রায়ই তাঁর দলের গোলরক্ষক জেডনেক হুরুস্কার সঙ্গে একটা বাজি ধরতেন। বাজিটা ছিল পেনাল্টিতে গোল করা নিয়ে। পেনাল্টিতে গোল দিলে পুরস্কার হিসেবে পানেনকা পাবেন একটা বড় আকারের চকলেটে অথবা পানীয়র বোতল, আর না পারলে হুরুস্কা পাবেন একই উপহার। হুরুস্কা ছিলেন খুবই ভালো গোলকিপার। বাজিতে প্রায়ই হেরে যেতেন পানেনকা।
তখন তিনি জোর দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে পেনাল্টি শট নেওয়ার এক উপায় বের করলেন। জোর দিয়ে গোলবারের কোনায় নয়, বরং গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে বলটাকে জালে পাঠিয়ে দেওয়ার চিন্তা করলেন তিনি। প্রথমে তিনি নিজে নিজে বেশ কয়েকবার অনুশীলন করলেন। নিজের এই শট আবিষ্কারের পর বাজির দান পাল্টে গেল। পেনাল্টি শুট আউটে এবার চকলেট কিংবা পানীয়র বোতল সব জিততে থাকলেন পানেনকা।
চেকোস্লোভাকিয়ার লিগে নিয়মিত পেনাল্টি নিতেন পানেনকা। আর সেটা তাঁর সেই নিজস্ব উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে। চেকোস্লোভাকিয়া জানত যে পানেনকার পেনাল্টি শট রুখে দেওয়ার ক্ষমতা গোলকিপারদের নেই। তবে পশ্চিম ইউরোপ বা বাকি বিশ্বে তিনি তেমন একটা পরিচিত ছিলেন না, কারণ চেকোস্লোভাকিয়ার খেলা বাইরে তেমন একটা প্রচারিত হতো না।
১৯৭৬ সালের পর পানেনকা শুধু শিরোপাই জেতেননি, নিজের উদ্ভাবিত পেনাল্টির সঙ্গে জড়িয়ে স্মরণীয় হয়ে উঠল তাঁর নাম।