যে মেয়েটি অনিচ্ছায় অভিযাত্রী হয়েছিল

তোমরা যারা টুকটাক গল্পের বই পড়ো, তারা ঠিক জানো কি না জানি না, তবে যেকোনো গল্প লেখকেরই গল্পের নামকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি থাকে। কোনো কোনো লেখক আছেন, যাঁরা গল্প লেখার আগেই গল্পের নাম লিখে ফেলেন। কেউবা নাম দেন লেখা শেষ হওয়ার পর। কেউ আবার গল্প লিখতে লিখতে নামটা বদলে ফেলেন কয়েকবার। কারণ, পূর্বনির্ধারিত নাম গল্পের প্রগতির সাপেক্ষে তাঁদের কাছে আর পরবর্তী সময়ে যৌক্তিক থাকে না! আবার কখনো কখনো বাজারের বর্তমান চাহিদা ঠিক করে যে ঠিক কোন আঙ্গিক অনুসরণ করে নামটা দিলে ভালো হয়। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে প্রকাশনীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক লেখকদের অনেকেই প্রকাশনীর পরামর্শ মোতাবেক নামের প্যাটার্ন ঠিক রেখে তারপর গল্পের নাম দিয়ে থাকেন। অ্যানিমে জগতে চোখ রাখলে তোমরা এ ধরনের অনেক উদাহরণ পাবে। আজকাল বিরাট বিরাট নাম দিয়ে এত এত ই-সেকাই (ভিনজগৎ) ধারার কাহিনিকে বাজারজাত করা হয়। যেমন ‘দ্যাট টাইম আই ওয়াজ রিইনকারনেটেড অ্যাজ আ স্লাইম’, ‘নোবেল রিইনকারনেশন—বর্ন ব্লেসড, সো আই উইল অবটেইন দ্য আল্টিমেট পাওয়ার’, ‘দেয়ার ওয়াজ আ কিউট গার্ল ইন দ্য হিরোজ পার্টি সো আই ট্রাইড টু কনফেসিং টু হার’ ইত্যাদি ইত্যাদি! কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে অ্যানিমে–বাজারে এখন এ–জাতীয় নামের ছড়াছড়ি! এত বড় নাম ঠিক স্মরণেও থাকে না। তাই এসব নিয়ে আলাপ করতে বসলে বড্ড অসুবিধায় পড়তে হয়। যেমন ধরো, আজ যে অ্যানিমে নিয়ে তোমাদের সঙ্গে গল্প করব ঠিক করেছি, তার নামটাও অনেকটা এই ধাঁচের ‘দ্য উইকেস্ট টেমার বিগান আ জার্নি টু পিক আপ ট্র্যাশ’। এর জাপানিজ নামটাও এমনই বিরাট—‘সাইজাকু টেমার ওয়া গোমি হিরোই নো তাবি ও হাজিমেমাশতা’। উফ! বড় বড় নাম বলতে বলতেই বড্ড হাঁপিয়ে গেলাম, তাই চলো শুরুতেই একটা সমঝোতা করে ফেলি, আজকের এই অ্যানিমেটাকে আমরা ‘সাইজাকু টেমার’ নামেই চিনব বাকি লেখায়। আশা করি তোমরা এতে আপত্তি করবে না!

ইদানীং যে আমি প্রচুর ই-সেকাই অ্যানিমে দেখি, তা তো আগেও বহুবার বলেছি। অধিকাংশ গল্পই প্রায় একইভাবে শুরু হয় এই ধারায়। কেউ একজন কোনো এক উপায়ে ভিনজগতে চলে আসে, তারপর ক্রমে তার পাওয়ার-আপ হয়। কিংবা শুরুতেই তার বিরাট ক্ষমতা থাকে। আর সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সে পরোপকার করে, যুদ্ধ জেতে, অথবা নানা রকম সুবিধা লাভ করে। এর ব্যতিক্রমও থাকে। দেখা যায় নায়ক কিংবা নায়িকা ভিনজগতে এসে পড়ে গেছে বিরাট গাড্ডায়! নানা অসুবিধা আর অসংগতির ধাক্কা খেতে খেতে তার জীবন বড় করুণ অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। সেখান থেকে কোনোভাবে খেটেখুটে বুদ্ধি দিয়ে সে জয় করে সব প্রতিকূল পরিস্থিতি। সাইজাকু টেমারকে শুরুতে এই দ্বিতীয় প্রজাতিতে ফেলা গেলেও ক্রমেই তাকে বদলেও যেতে দেখা যায়।

আরও পড়ুন

গল্পের প্রথমে দেখা যায় ফেমিসিয়াকে। ছোট্ট মেয়ে ফেমিসিয়া; একটা বিশেষ কারণে গ্রামের মানুষেরা তাকে হঠাৎ অপয়া বলে মনে করতে শুরু করে। ঘর থেকে বিতাড়িত হয় সে। খেয়ে না-খেয়ে, ছেঁড়া পোশাকে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে সে। তাতেও শান্তি হয় না গ্রামবাসীর। শুরু হয় তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র। ঘটনার আঁচ পেয়ে মনস্থির করে ফেমিসিয়া। বাঁচতে হলে লাতোমি গ্রাম থেকে পালাতে হবে। তাই সে চলে যায় তার যেটুকু সম্পদ গাছের কোটরে লুকানো আছে, তা উদ্ধার করতে। সম্পদ মানে বেশি কিছু নয়; কয়েকটা জাদুর ব্যাগ, একটা ছুরি, কিছু জাদুতরল, যা ক্ষত সারাতে পারে আর সামান্য টুকিটাকি। এই সব নিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পেতে জঙ্গল হয়ে ছুটে চলে আট বছরের ছোট্ট ফেমিসিয়া।

ওদিকে থেমে নেই গ্রামের মানুষেরা, হাতে আঁকা পোস্টারে ছেয়ে ফেলেছে দূরদূরান্তের গ্রাম-দেশ। সেখানে জোর সমন—পলাতক ফেমিসিয়াকে ধরিয়ে দিতে পারলে জুটবে পুরস্কার। সন্দেহ থেকে বাঁচতে নিজের চুল কেটে ছোট করে ফেলে মেয়েটা, নিজের নাম বদলে রাখে ‘আইভি’। সেই সঙ্গে মেয়েদের পোশাক বদলে ধারণ করে ছেলেদের বেশভূষা।

যাত্রাপথে যেখানেই আইভি দেখতে পায় কোনো গ্রাম বা শহরের মানুষদের ফেলে দেওয়া দ্রব্যাদি, সেখানেই খুঁজে নেয় কাজের জিনিস। কখনো পোশাক, কখনো জাদুতরল, কখনো বা জাদুর ব্যাগ। খাবারের অভাব হলে জংলি ফলেই আস্থা রাখে সে। ফাঁদ পেতে ছোটখাটো প্রাণীও ধরতে পারে। সেগুলোর ছাল ছাড়িয়ে সযত্নে সঞ্চয় করে ভবিষ্যতের জন্য। জাদুব্যাগের ভেতর রাখলে দ্রব্যের ওজন কমে যায়, ওর তেমন অসুবিধা হয় না বহন করতে।

আরও পড়ুন

এই প্রতিকূলতায় মেয়েটির একমাত্র সঙ্গী হয় ছোট্ট একটা স্লাইম। মূলত আইভির রয়েছে বিশেষ প্রাণীদের পোষ মানানোর ক্ষমতা। এ জগতে সবারই কিছু না কিছু ক্ষমতা থাকে। কারও বয়স যখন পাঁচ বছর হয়, সে তখন এই ক্ষমতার আভাস পায়। আর সেই সঙ্গেই পায় ক্ষমতার তীব্রতা কতটা হবে, তার ইঙ্গিত। ধরা যাক, কেউ মাছ ধরার ক্ষমতা পেয়েছে এবং এই ক্ষমতায় তার দক্ষতা হচ্ছে দুই তারা পরিমাণ। আবার আরেকজনের একই ক্ষমতা আছে তিন তারা পরিমাণ। ফলে যার তারা বেশি, সে বেশি দক্ষ। কোনো একটা ক্ষমতার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দক্ষতা ধরা হয় এক তারা পরিমাণকে। আইভির ক্ষেত্রে এই দক্ষতা হচ্ছে শূন্য তারা। ঠিক যে কারণে পুরো লাতোমি গ্রাম তাকে অপয়া মনে করে, হত্যা করতে চায়। আইভির জাদু বড়ই দুর্বল, তাই পোষ মানানোর ক্ষমতা খাতা-কলমে তার থাকলেও বাস্তবিক সে তা ব্যবহার করতে পারে না। একমাত্র এই স্লাইম, যাকে পরবর্তীকালে সে নাম দেয় সোরা (অর্থাৎ আকাশ), তাকেই সে পোষ মানাতে সক্ষম হয়। আর সেই থেকেই ওর নিয়মিত যাত্রাসঙ্গী সোরা। যখন ওরা দুজন ছাড়া আশপাশে কেউ থাকে না, সোরা বাইরে থাকে। কখনো থাকে আইভির কাঁধে, কিংবা পাশাপাশি পথ চলে। আর যখন ও অন্য কারও আশপাশে থাকে, সোরা তখন আশ্রয় নেয় জাদুব্যাগের ভেতর।

মোটামুটি এ–ই হচ্ছে সাইজাকু টেমার গল্পের প্রেক্ষাপট। এ এক অভিযানের গল্প। তেমন গুরুতর পৃথিবী রক্ষাকারী মারকুটে নায়কোচিত অভিযান নয়, বরং ছোট্ট একটা মেয়ের নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার অভিযান। নানা শহরে গিয়ে নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হয় ফেমিসিয়ার, নতুন নতুন প্রাণী তার বন্ধু হয়, তাকে সাহায্য করে। আবার সেও আসে অন্যের উপকারে; ওর সামান্য ক্ষমতায় যেটুকু সাহায্য করা সম্ভব, সেটুকুই করে আপ্রাণ।

সাইজাকু টেমার গল্পটি মূলত লাইট নভেল আঙ্গিকে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘শোওসেৎসকু নি নারো’ ওয়েবসাইটে। এরপর জাপানের টিও বুকস (TO Books) থেকে জাপানিজ ভাষায় এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেভেন সিস এন্টারটেইনমেন্ট সিরিজটিকে ইংরেজিতে প্রকাশ করে। লাইট নভেলের পর বইটির ইংরেজি মাঙ্গাও প্রকাশ করে সেভেন সিস এন্টারটেইনমেন্ট। সিরিজটির কাহিনি চলমান, এখনো নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এই গল্পের লেখক হোনোবোনোরু৫০০ ও আঁকিয়ে নামা—দুজনই বড় আড়ালপ্রিয়। ফলে তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তেমন একটা প্রকাশ্যে নেই। তবে এই গল্প ছাড়াও আরেকটা গল্পে তাঁরা একত্রে কাজ করেছেন; সেই গল্পটিও ই-সেকাই, নামটাও যথারীতি বিশাল—ফ্লাং ইন্টু আ নিউ ওয়ার্ল্ড? টাইম টু লিফট দ্য ২০০-ইয়ার কার্স! কে জানে তাঁরা পরস্পরের বন্ধু বা আত্মীয় কি না? হলেও খুব একটা অবাক হব না। তবে হ্যাঁ, মাঙ্গা সিরিজের ক্ষেত্রে ভিন্ন এক শিল্পী ছবি আঁকার কাজটা করেছেন; তাঁর নাম তৌ ফুকিনো। আর হোনোবোনোরু৫০০–এর লেখা সাইজাকু টেমারের আরেকটা স্পিন অব মাঙ্গায় ছবি এঁকেছেন আঁকিয়ে আমামরি। আর যথারীতি ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনের ভেতর একটা ব্যবধান রাখার তাগিদে তৌ ফুকিনো ও আমামরি উভয়ই পরিচয় গোপন রেখেছেন!

আরও পড়ুন

লেখক আর আঁকিয়েদের পরিচয় ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি নিজেই খানিকটা ঘেঁটে গেছি। লেখালেখি করে এত লুকোছাপা আমাদের দেশে এভাবে দেখা যায় না। এই তো সামনেই বইমেলা আসছে, তোমরা অনলাইনে চোখ রাখলেই দেখবে, লেখকেরা নিজেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত পোস্টের মাধ্যমে নিজেদের নতুন ও পুরোনো বইয়ের কথা তোমাদের ঘন ঘন জানিয়ে দিচ্ছেন।

চলো, গল্পের প্রসঙ্গে ফিরি। এই গল্পে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ফেমিসিয়া ওরফে আইভির যাত্রা। যে ভয়ানক মানসিক দুর্যোগ থেকে ভীষণ সব প্রতিকূলতা সামলে সে নিজেকে আনন্দের পথে আনতে পেরেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই যাত্রায় সে বেশ কিছু সহযোগিতা পায়, ছোট এসব চরিত্রও তোমাদের মন কাড়বে। কাহিনির একেবারে শুরুতেই ভাগ্য বলতে পারার ক্ষমতাধারী ‘লুবা’ চরিত্রটি আমার দারুণ লেগেছে। সোরাও বেশ মজার চরিত্র। তোমরা দেখবে কোনো অভিযাত্রী দল কিংবা নগররক্ষক বাহিনীর সদস্যরাও নানা সময় মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে মন খারাপ করা পরিস্থিতিতেও নিজেকে সামলে রাখতে পেরেছে আইভি।

পুরো সিরিজে করা অ্যানিমেশন কিংবা নানা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আমার ঠিকঠাক লেগেছে। ইদানীং কিছু নামকরা গল্পের সর্বনাশ হতে দেখেছি দায়সারা অ্যানিমেশনের জন্য। সাইজাকু টেমারের অ্যানিমেশন জুজুৎসু কাইসেন কিংবা ডেমন স্লেয়ারের মতো অত আকাশচুম্বী দুর্দান্ত না হলেও গল্পের প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই। তা ছাড়া কণ্ঠশিল্পীরাও বেশ ভালো কাজ করেছেন অ্যানিমেতে। বিশেষ করে আইভি চরিত্রে আইনা সুজুকি দুর্দান্ত ছিলেন। কিংবা ধরো ওগতো চরিত্রে কেনতা মিয়াকে বা ভিলভেরা চরিত্রে কৌস্কে তোরিউমি, এমন অনেকেই অনবদ্য কণ্ঠ দিয়েছেন। আমার মনে হয় জাপানের কণ্ঠশিল্পীরা জগৎসেরা; এরা যেভাবে গল্পে আবেগ আর চাঞ্চল্য নিয়ে আসতে পারেন, এত চমৎকার করে সাধারণত অন্য ভাষার কণ্ঠশিল্পীদের আনতে দেখা যায় না। তাই দেখবে, অ্যানিমে অন্য কোনো ভাষায় ডাবিং করা হলেও মূল জাপানিজের মতো ভালো লাগে না। যদিও এর সামান্য কিছু ব্যতিক্রম আছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই বাস্তব।

আরও পড়ুন

আইনা সুজুকির ‘হাতে নো নাই তাবি’ গান দিয়ে শুরু হয় সাইজাকু টেমার অ্যানিমের প্রতিটি পর্ব। ছোট্ট গানটা আমার পছন্দ হয়েছে। যদিও যথেষ্ট জাপানিজ গান তোমাদের জানা থাকলে দেখবে এ ধরনের সুর ব্যতিক্রম কিছু মনে হবে না। তবে সব সময় ব্যতিক্রম হতে হবে এমন কোনো গুরুশর্তও তো নেই, ভালো লাগাটাই জরুরি। এ ছাড়া পর্ব সমাপ্তির গানটির নাম ‘বিকজ (Because)’ গেয়েছেন জাপানিজ কণ্ঠশিল্পী তেই হিনোতো। গানটা শুরুর দিকে বেশ ধীরগতির আর জাপানিজ আঙ্গিকের ইংরেজিতে হওয়ায় আমার খুব একটা পছন্দ হয়নি। সুর যদিও একটু ভিন্ন, তোমাদের ভালো লাগতেও পারে।

সবশেষে বলব, সিরিজের নাম দেখে ঘাবড়ে যেয়ো না, বিভ্রান্তও হয়ো না। সিরিজের নাম শুনলে মনে হয় যে আইভি কেবল আবর্জনা কুড়াতেই গ্রাম ছেড়ে অভিযানে নেমেছে। তবে ঘটনাটা আসলে এমন নয়। এদিক থেকে বলতে গেলে গল্পের সার্থক নামকরণ হয়নি। কেবল নাম শুনেই হতাশ হয়ে অনেকে হয়তো এই অ্যানিমের প্রতি আগ্রহী হবে না। তাই তোমাদের গল্পটা সম্পর্কে জানানোর তাগিদ বোধ করলাম। হতাশা ও আশার এক চমৎকার মিশেল আছে এই গল্পে; আছে বন্ধুত্ব, সহযাত্রা আর সহযোগিতার নানা আঙ্গিক। তোমরা যারা জনপ্রিয় অ্যানিমের স্রোতে হাবুডুবু খেতে খেতে দু–একটা অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় কাহিনির নৌকায় উঠে বসতে চাও, তারা আশা করি এই অ্যানিমে একটু সময় করে দেখবে। আর ভালো লাগলে অবশ্যই লিখে জানাবে।

আরও পড়ুন